দিন বেড়ে হবে ২৫ ঘণ্টা

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৪:১৪ পিএম

২৪ ঘণ্টার বদলে দিনের দৈর্ঘ্য হয়ে যাবে ২৫ ঘণ্টার। একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে চাঁদ। গবেষণায় দেখা  গেছে, প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আমাদের উপগ্রহ থেকে। আর চাঁদের এই দূরে চলে যাওয়ার কারণেই বেড়ে যাবে দিনের দৈর্ঘ্য। স্পেসডটকমের তথ্য নিয়ে লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

দিনের দৈর্ঘ্য ২৪ ঘণ্টা। কিন্তু এটা বেড়ে হয়ে যাবে ২৫ ঘণ্টা।  কারণ একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে চাঁদ। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন ধরনের তথ্য তুলে এনেছেন উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল। প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে চাঁদ। আর চাঁদের এই দূরে চলে যাওয়ার কারণেই আস্তে আস্তে বেড়ে যাচ্ছে দিনের দৈর্ঘ্য। তবে পুরো এক ঘণ্টা পেছাতে সময় লাগতে পারে ২০ কোটি বছর। পৃথিবীর সময়ে বিবেচনা করলে হয়তো সময়টা অনেকটাই বেশি। কিন্তু মহাজাগতিক সময়ের নিরিখে, ২০ কোটি বছর কোনো সময়ই নয়। বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন, প্রাচীনকালে পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য অনেকটাই কম ছিল। ১৪০ কোটি বছর আগে মাত্র ১৮ ঘণ্টাতেই দিন হতো এমনটাই গবেষণায় উঠে এসেছে।

এখন পৃথিবী থেকে চাঁদের দৈর্ঘ্য ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার। চাঁদ যে পৃথিবী থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, তা অবশ্য কয়েক দশক আগেই জানতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি, উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল, ঐতিহাসিক এবং ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে এই বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান চালিয়েছেন। ৯ কোটি বছরের পুরনো পাথুরে ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন তারা। আর তাতেই দেখা গিয়েছে, পৃথিবী থেকে চাঁদের ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে পৃথিবীর ওপর। বিশেষ করে আমাদের গ্রহের দিনের দৈর্ঘ্যরে ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে এই ঘটনার। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাথমিকভাবে এর জন্য পৃথিবী এবং চাঁদের মধ্যে মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়াই দায়ী।

উইসকনসিন-ম্যাডিসন ইউনিভার্সিটির ভূ-বিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিফেন মায়ার্স বলেছেন, ‘ঘূর্ণায়মান ফিগার স্কেটাররা যেমন তাদের দুই হাত প্রসারিত করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের গতি কমে আসে, সেই রকমই চাঁদ সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি কমছে এবং দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, অ্যাস্ট্রোক্রোনোলজি ব্যবহার করে সুদূর অতীতের সময় সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন তারা। অতি প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক সময়ের একটা পরিমাপ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। আধুনিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে যাতে কয়েকশ কোটি বছরের পুরনো শিলাগুলো নিয়ে গবেষণা করা যায়, এমন জায়গায় পৌঁছতে চেয়েছিলেন।

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আজ থেকে প্রায় ১৪০ কোটি বছর আগে চাঁদ পৃথিবীর আরও কাছাকাছি ছিল। তখন পৃথিবীতে ১৮ ঘণ্টায় একদিন হতো। চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাওয়াই পৃথিবী ঘূগণন তির ওপর প্রভাব পড়ছে। পৃথিবীর চারদিকে যখন চাঁদ প্রদক্ষিণ করে তখন এর মধ্যে ঘর্ষণ শক্তির প্রভাবে সমুদ্রের পানির ওপরে টান তৈরি করে। যেটি পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। সেই সঙ্গে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয় এই কারণে। তাই পৃথিবী থেকে চাঁদ যত দূরে সরে যাবে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি তত কমতে থাকবে এবং দিনরাত্রি সময় বৃদ্ধি পেয়ে থাকবে।

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে ২৫ ঘণ্টায় দিনরাত্রি সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে আরও বলেন, চাঁদ ছাড়াও পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেও ঘূর্ণন গতি দিন দিন কমে যাচ্ছে। পৃথিবী জুড়ে তাপমাত্রার বৃদ্ধি পাওয়ায় মেরু অঞ্চলের বরফগুলো আগের চেয়ে দ্রুত গলে যাচ্ছে। যার কারণে মহাসাগরের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই গলে যাওয়া পানিগুলো পৃথিবীর মেরু থেকে ধীরে ধীরে বিষুব রেখার দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

আর বিষুব অঞ্চলে পানির সঙ্গে চাঁদের আকর্ষণ শক্তি সব চেয়ে বেশি। যার কারণে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি আরও দীর্ঘ হতে হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াগুলো কোটি কোটি বছর ধরে চলতে থাকলে পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্যে যোগ হবে বাড়তি ১ ঘণ্টা অর্থাৎ ২৫ ঘণ্টায় এক দিন হবে। আর এটা করতে গিয়েই চাঁদের দূরে সরে যাওয়ার সঙ্গে পৃথিবীর সময়ের এই সম্পর্ক জানতে পেরেছেন তারা। প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং পলির স্তরগুলো পরীক্ষা করে, গবেষকরা কয়েকশ বছর ধরে পৃথিবী ও চাঁদের সম্পর্কের ইতিহাস খুঁজে পেয়েছেন। গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, বর্তমানে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হারেই পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে চাঁদ। তবে পৃথিবীর এই দূরে সরে যাওয়ার হার নির্ভর করে পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি এবং মহাদেশীয় প্রবাহসহ বিভিন্ন কারণের ওপর। তাই কখনো বেশি গতিতে চাঁদ সরেছে পৃথিবী থেকে। আবার কখনো ধীরগতিতে।।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত