৮ সেপ্টেম্বর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্তি হয়েছে। এক মাসে সরকারকে অনেক ঝড় মোকাবিলা করতে হয়েছে। সচিবালয় থেকে উপজেলা পরিষদ বা স্কুল কমিটি থেকে মফস্বলের মসজিদের মুয়াজ্জিন নিয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি সেক্টরে এমনভাবে ফ্যাসিজমের বীজ বপন করা হয়েছে, যা মোকাবিলা ও নির্মূল করা খুব কঠিন কাজ। আজ পর্যন্ত সরকারের যতটুকু অগ্রগতি তা অক্লান্ত পরিশ্রম ও একাগ্রতা না থাকলে সম্ভব না। যারা সরকারে আছেন তারা শহীদদের চেতনা, গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট ও আকাক্সক্ষাকে আমলে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের কাজ করতেই হবে। অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতা তাদের হাতে এই গুরুদায়িত্ব তুলে দিয়েছে। আমরা একটা ইতিহাসের বাঁক বদলে আছি। এই বাঁক বদলে শহীদ হয়েছে ৭০০ জন ছাত্র-শ্রমিক-জনতা। চোখ হারিয়েছে ৪০০ মানুষ, আহত হয়েছে ১৯ হাজারের বেশি, অনেকেই স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করতে যাচ্ছে। আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের দেখি চোখের জল ছাড়া প্রকাশ করার আর কোনো অনুভূতি থাকে না আমাদের।
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা সরকার গঠনের মাসপূর্তিতে ছাত্রদের সঙ্গে মতবিনিময়ে অনুষ্ঠানে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আমাদের আবেগে আপ্লুত করেছে। অভ্যুত্থানে হতাহতদের কেউ ক্রিকেটার হতে চেয়েছিল, কেউ ফুটবলার, কেউ ফিল্যান্সার, কেউ স্বেচ্ছাসেবক, কিন্তু তাদের ঠান্ডা মাথায় পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে বা খুন করা হয়েছে। আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়ে এখনো অনেক ছাত্র-জনতা ঘরে ফেরেনি। আমাদের অনুরোধ, দ্রুত স্বজনদের অন্তত লাশের সন্ধান দেওয়া হোক, আহতদের সুচিকিৎসা ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছে যারা তাদের পুনর্বাসন করা হোক। যে ৪০০ জন চোখ হারিয়েছেন তাদের উন্নত মানের চক্ষু চিকিৎসা নিশ্চিত করা হোক। সার্বিক পরিস্থিতি বুঝাতে কবি হাসান রোবায়েত লিখেছেন, ‘মা কান্দে পুতের খোঁজে, মর্গ থেইকা মর্গতে।’
আমাদের এখন মূল কাজ শহীদদের চেতনা বাস্তবায়ন করা, আগামীর জন্য একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শোষণহীন সমাজব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয়ে রাষ্ট্র সংস্কার করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করা। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যেও বলেছেন, সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের সমীপে কিছু জরুরি আলাপ তুলে ধরতে এই লেখার অবতারণা।
এক. আন্দোলনের অংশীদার শুধু ছাত্র নন
প্রধান উপদেষ্টা সরকারের মাসপূর্তিতে ছাত্রদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, তিনি প্রায়ই আন্দোলনে ছাত্রদের কৃতিত্বের কথা স্বীকার করেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, এই আন্দোলনে শহীদদের বড় অংশ দিনমজুর, শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, গার্মেন্টসকর্মী, ছোট চাকরিজীবী। প্রধান উপদেষ্টার প্রতি অনুরোধ, আপনি তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বসুন, জানতে চান নতুন দেশে তারা কী চায়! তাদের ভাবনা কী! অনেক শহীদের মৃত্যুর আগে দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাস আমি চেক করেছি, তাদের অনেকে আন্দোলনে গুলি চলবে জেনেও মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই আন্দোলনে গেছে। এই অসীম সাহসী মানুষেরা কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিল তা নিয়ে আমাদের আরও ভাবতে হবে।
দুই. মব ভায়োলেন্স বন্ধ করতে হবে
সরকারের মাসপূর্তির পরও আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনো মব ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছে অনেকে। আদালতের মব জাস্টিস বন্ধ হয়েছে বললেও বগুড়ার আদালতে হিরো আলম লাঞ্ছিত হয়েছেন। রাজশাহীতে এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আইন ও শৃঙ্খলা যেন মবের হাতে চলে না যায় তার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সারা দেশে কট্টরপন্থিরা মাজার ভাঙার এক ঘৃণিত অপকর্ম শুরু করেছে। স্বাধীন দেশে মাজার, মন্দির-মসজিদ কিছুই ভাঙা যাবে না। আমরা গড়তে চাই। অনেক চিন্তার সঙ্গে, আদর্শের সঙ্গে একটি হারমনি গড়ার দায়িত্ব এই সরকারের।
তিন. বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররাও কি অস্বীকারের রাজনীতির পথে?
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক/ সহ-সমন্বয়করা জেলা পর্যায়ে সফর শুরু করেছেন। তাদের উচিত হবে জেলা-উপজেলায় আহতদের খোঁজ নেওয়া এবং শহীদদের স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা।
আন্দোলনকারী নেতৃত্বের জেলা সফরকারী টিমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও যোগ দিয়েছেন, এটা ভালো পদক্ষেপ। তবে হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম ছাড়া বাকিরা খুব একটা পরিচিতি পাচ্ছেন না। বাকি সমন্বয়কদেরও নেতৃত্ব, মিডিয়া ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশনে যোগ্য করতে হবে।
হাসনাত আবদুল্লাহ সম্প্রতি চট্টগ্রাম সফর করেছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃদু উত্তেজনা কারও নজর এড়ায়নি। তিনি সেখানে গিয়ে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ দিয়েছেন। হাসনাত বলেছেন, ‘তারেক রহমান খুব পপুলিস্ট বক্তব্য দিচ্ছেন, আমরা যেটা শুনতে চাই সেটাই বলছেন’। তিনি মূলত বিএনপির দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার কথা প্রস্তাবনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। সংস্কারের আলাপ যেহেতু চলছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরবে, সেটাই কাম্য। হাসনাতের বরং উচিত ছিল বিএনপিসহ যেসব দল তাদের আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে, সক্রিয় থেকেছে তাদের ধন্যবাদ জানানো। বিভিন্ন দল ও মতকে অস্বীকার না করে আলোচনা ও সমন্বয়ের রাস্তা তৈরির ভাষাই আশা করি তাদের কাছে।
২০২৩ সালে বিএনপির ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন, সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, পরপর দুই বারের অতিরিক্ত প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তন, মিডিয়া কমিশনসহ নানা প্রস্তাবনা ছিল। দেশের একজন রাজনীতিসচেতন তরুণ হিসেবে হাসনাতের এসব জানার কথা। কিন্তু তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে ডায়ালগের পরিবেশ না তৈরি করে করলেন খারিজ। দলটির রাজনৈতিক কমিটমেন্টকে হেয় করলেন। তিনি সেটা করতে পারেন, যেহেতু দেশের বিগত দিনের রাজনীতির চর্চাটা সে পথেই হয়ে আসছে। কিন্তু তিনি যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের ব্যানারের প্রতিনিধিত্ব করছেন তা তো নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলে। আর এই ব্যানারে অনেকের আবেগ জড়িয়ে আছে। হাসনাতের জানা থাকা উচিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ১১৭ জন বিএনপির নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে হাসনাত বলেছেন, আমরা যারা স্টুডেন্ট ফোর্স আছি তাদের নির্বাচন এলে সবাই শত্রু ভাববে। এই আমরা বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন? বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছিল একটি গণআন্দোলন, এখানে বিশেষ কোনো মতাদর্শ বা দলের লোক অংশ নেয়নি। তিনি যে ‘আমরা’ বলে আমিত্ব প্রকাশ করছেন তা গণআন্দোলনের গণচেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
হাসনাতরা দাবি করছেন তারা সরকারের প্রেশার গ্রুপ। প্রেসার গ্রুপ না বলে তারা সরকারের সহযোগী বা সরকারি দল দাবি করতে পারেন। হাসনাত বা সারজিস আনসার সংকট, মেডিকেল সংকট এসবে দৌড়ে গেছেন কিন্তু অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কেউ তো যায়নি বা স্পেস পায়নি, তার মানে তারা সরকারের সহযোগী ফোর্স। হাসনাত আবদুল্লাহ ভূমি অফিসের কাজের মন্থরগতি নিয়ে কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এই কাজটি সরকারের করা উচিত, হাসনাতের না। হাসনাত যেভাবে চট্টগ্রামে গিয়ে পুলিশ প্রটোকল নিচ্ছেন ও সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত অনুচিত নিয়ে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। সরকারে না থেকে এমন কাজ আমাদের দেশে ২০১৩ সালে করেছিলেন ইমরান এইচ সরকার নামে এক ব্যক্তি। জনগণ তার অনধিকার চর্চাকে ভালোভাবে নেয়নি।
চার. জাতীয় নাগরিক কমিটি
সম্প্রতি একটি ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ গঠন করা হয়েছে যেখানে নানা ধর্ম, জাতিসত্তা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকের সম্মিলন হয়েছে। তাদের অভিনন্দন জানাই। নামে নাগরিক কমিটি হলেও এটি একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম যা তাদের সদস্য সচিব বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন। যদি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে থাকে তবে এটি সর্বদলীয় কি না, সে প্রশ্ন রয়ে যায়! কারণ এখানে নিজ নিজ পূর্বের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রেখেই বিভিন্ন ব্যক্তি যুক্ত হয়েছেন।
সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, গণ-অভ্যুত্থানের ঐক্যের স্বার্থে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দল গঠনের কথা তারা ভাবছেন না। সেক্ষেত্রে সর্বদলীয় একটি ছাত্র ঐক্য করা যেত, যেমনটা ঢাবিতে একটি সর্বদলীয় বৈঠকের খবর এসেছিল ৫ আগস্টের পরপর। এ ছাড়া ছাত্রদল যেভাবে ২০২৪ এর নির্বাচনের আগে একটি সর্বদলীয় সমন্বয়ের চিন্তা করেছিল, সে রকম কিছু বন্দোবস্ত করা যেত। সেক্ষেত্রে গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা রক্ষায় সব দল একসঙ্গে কাজ করতে পারত। কিন্তু যে কমিটি করা হয়েছে তাকে সর্বদলীয় বা নির্দলীয় কোনোটাই বলা যায় না, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার সূচনা বলেই মনে হয়। সেক্ষেত্রে গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া নানা মতাদর্শ ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আপনাদের রাজনৈতিক ‘টাগ ওয়ার’ শুরু হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
নাগরিক কমিটি আমাদের দেশে পশ্চিমা ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এসেছে। সেখানে আমরা সবসময় মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত ও শহুরে সমাজের প্রতিনিধি দেখতে পাই। নতুন ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ তার ব্যতিক্রম মনে হয়নি। কমিটিতে নেই কোনো কৃষক, শ্রমিক, শ্রমজীবী বা ক্ষুদ্র চাকরিজীবীদের প্রতিনিধি। নাগরিক কি শুধু গ্র্যাজুয়েটেড আরবান ক্লাস! সেলিব্রেটি মুখের সমাহার মনে হয়েছে কমিটিকে। গণআন্দোলনের গণচেতনা থেকে সরে যাওয়া আমাদের ভীষণ ভোগাবে।
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক
[email protected]
