অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেশের ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিককে প্রধান করে ছয়টি পৃথক কমিশন গঠন করেছে সরকার। তিনি বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের পর আগামী ১ অক্টোবর থেকে তারা কাজ শুরুর পর পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরি সম্পন্ন হবে বলে ধারণা করছি।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে ড. বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনে সফর রাজ হোসেন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনে বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনে ড. ইফতেখারুজ্জামান, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনে আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে ড. শাহদীন মালিক দায়িত্ব পালন করবেন। পরবর্তীকালে আরও বিভিন্ন বিষয়ে কমিশন গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে গঠিত কমিশনের প্রধানরা আলোচনা করে কমিশনে অন্য সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করবেন বলে জানান ড. ইউনূস।
তিনি বলেন, কমিশনগুলোর আলোচনা ও পরামর্শসভায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ছাত্র, শ্রমিক, জনতা আন্দোলনের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শসভার আয়োজন করবে।
‘চূড়ান্ত পর্যায়ে ছাত্রসমাজ, নাগরিকসমাজ, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সরকারের প্রতিনিধি নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক তিন থেকে সাত দিনব্যাপী একটি পরামর্শসভার ভিত্তিতে সংস্কার ভাবনার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। এতে এই রূপরেখা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার একটি ধারণাও দেওয়া হবে’ বলেন ড. ইউনূস।
অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের ভোটাধিকার ও জনগণের মালিকানায় বিশ্বাস করার কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচনব্যবস্থার উন্নয়ন আমাদের সংস্কার ভাবনায় গুরুত্ব পেয়েছে। আমরা মনে করি নির্বাচনের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার একাধিপত্য ও দুঃশাসন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা এর মাধ্যমে এক ব্যক্তি বা পরিবার বা কোনো গোষ্ঠীর কাছে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, বিচার প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এ চারটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার করা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য।’
‘এর পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্তাকে প্রতিফলিত করার জন্য সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজন আমরা অনুভব করছি’ যোগ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে তার সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উল্লেখ করে ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কেউ সমাজে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করলে আমরা তাকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় নিয়ে আসব। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এমন কোনো কাজ কেউ কোনোভাবেই করবেন না।’
‘ধ্বংস হয়ে পড়া একটা জনপ্রশাসনকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। আবার সব সমস্যা সমাধান করে একটি নতুন জনপ্রশাসন কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছি এটাই আমাদের প্রথম মাসের সবচেয়ে বড় অর্জন’ যোগ করেন তিনি।
দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা সংস্কার চাই। আমাদের একান্ত অনুরোধ, আমাদের ওপর যে সংস্কারের গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন, সেই দায়িত্ব দিয়ে আপনারা দর্শকের গ্যালারিতে চলে যাবেন না। আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকুন। আমরা একসঙ্গে সংস্কার করব। আপনারা নিজ নিজ জগতে সংস্কার আনুন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা গেলে আশা করি আমরা আমাদের গতি অনেক বাড়াতে পারব।’
বক্তব্যের শুরুতে জুলাই-আগস্ট মাসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণ করার পাশাপাশি আহতদের প্রতি সমবেদনা জানান ড. ইউনূস।
গণঅভ্যুত্থানে সব শহীদের পরিবারকে পুনর্বাসন করার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে ড. ইউনূস বলেন, সব আহত শিক্ষার্থী-শ্রমিক-জনতার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে। এ ছাড়া শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে ‘জুলাই গণহত্যা স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ নামে একটি ফাউন্ডেশন তৈরি হয়েছে। এ ফাউন্ডেশনে দান করার জন্য দেশের সবাইকে আহ্বান জানান তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান তার ভাষণে কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট অঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় দুর্গতদের সহায়তায় সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের এগিয়ে আসার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
দাবি আদায়ের জন্য সাধারণের যাতায়াতে ব্যাঘাত না ঘটাতে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেসব ভাইবোন তাদের গত ১৬ বছরের বেদনা জানিয়ে তার প্রতিকার পাওয়ার জন্য আমার অফিস এবং সচিবালয়ের অফিসসমূহের সামনে প্রতিদিন ঘেরাও কর্মসূচি দিয়ে আমাদের কাজকর্ম ব্যাহত করছিলেন, তারা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘেরাও কর্মসূচি থেকে বিরত হয়েছেন। তবে অন্যত্র আবার তারা তাদের কর্মসূচি দিয়ে যাতায়াতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছেন। আমি কথা দিচ্ছি, আমরা যথাসম্ভব সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’
তৈরি পোশাক, ওষুধ শিল্পের কর্মীদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনাদের অভিযোগ জানানোর জন্য ক্রমাগতভাবে এ শিল্পের কার্যক্রম পরিচালনা বন্ধ রাখতে বাধ্য করছেন। এটা আমাদের অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে সেটা মোটেই কাম্য নয়। শ্রমিক ভাইবোনদের অনেক দুঃখ আছে। কিন্তু সেই দুঃখ প্রকাশ করতে গিয়ে আপনাদের মূল জীবিকাই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে সেটা ঠিক হবে না। মালিক-শ্রমিক উভয়পক্ষের সঙ্গে আলাপ করে এসব সমস্যার সমাধান আমরা অবশ্যই বের করব। আপনারা কারখানা খোলা রাখুন। অর্থনীতির চাকা সচল রাখুন। দেশের অর্থনীতিকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দিন।’
তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই অন্তর্র্বর্তী সরকার বিচার বিভাগের বড় সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে। যোগ্যতম ব্যক্তিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ায় মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়োগ, অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগসহ অনেক অতি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ এবং অন্যান্য নিয়োগ সবকটাই সম্পন্ন হয়েছে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সন্ত্রাস দমন আইন ও ডিজিটাল/সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়েরকৃত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ বাংলাদেশে বিদ্যমান সব কালো আইনের তালিকা করা হয়েছে। অতিসত্বর এসব কালো আইন বাতিল ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশোধন করা হবে। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ বহুল আলোচিত পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ও দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির জন্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বর্তমানের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বই সংশোধন এবং পরিমার্জনের কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। এ সংস্কারের কাজ অব্যাহত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চ প্রশাসনিক পদগুলো পূরণ করে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা বোর্ডে দখলদারিত্বের রাজনীতি বন্ধ করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
ড. ইউনূস বলেন, ‘সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা সবাইকে বলে দিয়েছি, আপনারা মন খুলে আমাদের সমালোচনা করেন। মিডিয়া যাতে কোনোরকম বাধাবিপত্তি ছাড়া নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে পারে সেজন্য একটি মিডিয়া কমিশন গঠন করা সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন।’
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চলমান এবং প্রস্তাবিত সব উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর যাচাই-বাছাই করার কাজ ইতিমধ্যে আমরা শুরু করেছি। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায় বিবেচনা করে বাকি কাজে ব্যয়ের সাশ্রয় এমনকি প্রয়োজনবোধে তা বাতিল করার কথা বিবেচনা করা হবে।’
লুটপাট ও পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটা ব্যাংকিং কমিশনও গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতে এই এক মাসে বিরাট পরিবর্তন এসেছে।
ড. ইউনূস বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার লুটপাট করার জন্য নতুন করে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার কারণে মুদ্রাস্ফীতির শিকার হয়েছে দেশের মানুষ। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পলিসি সুদের হার বৃদ্ধি করে ৯ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।
সার আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ, প্রকৃত চাষিদের কৃষিঋণ নিশ্চিত করার উদ্যোগের পাশাপাশি কৃষিঋণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে বাজেট সাপোর্ট চাওয়ার কথা জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্বব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, জাইকা থেকে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানের অনুরোধ করা হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রিম অর্থ পরিশোধ এবং বকেয়া পাওনা নিয়ে রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আলোচনা চলছে।
তিনি আরও বলেন, পাইপলাইনে থাকা ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেগা প্রকল্পের নামে লুটপাট বন্ধের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ী, শিল্প-মালিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনের অধীন চলমান সব ধরনের নেগোসিয়েশন, প্রকল্প বাছাই এবং ক্রয় প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম আপাতত স্থগিত করার কথা জানান প্রধান উপদেষ্টা। এ খাতে অধিকতর সক্ষমতা, গতিশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
