ইসলাম প্রচার-প্রসারে পীর-মাশায়েখদের অবদান

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:১৬ এএম

আমাদের দেশে শতকরা নব্বইজনই আজ মুসলমান। তবে হাজার বছর আগে এ অঞ্চলে মুসলমানের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। বারোশ খ্রিস্টাব্দের শুরুতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের অনেক আগে থেকেই এখানে পীর-আউলিয়াদের আগমন ঘটেছিল এবং ইসলামের দাওয়াতি কাজ শুরু হয়েছিল। তবে বঙ্গবিজয় এতে এনে দেয় চূড়ান্ত সফলতা। যা প্রমাণ করে, বখতিয়ারের তলোয়ার নয়, বরং পীর-আউলিয়াদের দাওয়াতি কার্যক্রমই ইসলামের অন্তর্নিহিত সামাজিক সাম্য, উদারতা ও শান্তির বাণী স্থানীয় বৌদ্ধ-হিন্দু ও অন্যান্য অমুসলিমদের ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল।

ইসলামের অপ্রতিরোধ্য শক্তির ধারক-বাহক আউলিয়ায়ে কেরামের নেতৃত্বের ধারাবাহিক সফলতা ও বিজয়ের সংবাদে আগে থেকেই আতঙ্কিত ছিল জালেম শাসক লক্ষ্মণ সেন। এর আগেই দুর্ভেদ্য আজমীর দখল হয়ে যায় মুসলমানদের। ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন শাসকের শ্রেণি-বর্ণের সামাজিক বিভাজন ও জুলুমে নিষ্পেষিত ছিল হিন্দু জনগণ। যেহেতু এ অঞ্চলে পীর-আউলিয়ারা আরও কয়েকশ বছর ধরে ইসলামের বাণী প্রচার করে আসছিল, তাই স্থানীয় মজলুম হিন্দু এবং বৌদ্ধরা স্বধর্মের চেয়েও ইসলামকে সর্বজনীন গতিশীল সাম্য-মৈত্রীর ধর্ম হিসেবে ইতিমধ্যেই গ্রহণ করে একটি বিপ্লব ঘটানোর অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল। আর তাদের অপেক্ষার রাত পোহায় ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির আগমনের সংবাদে। মোট কথা, মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়ের অনেক আগেই ওলামায়ে কেরামের প্রভাবে চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেকাংশেই ইসলামের সামাজিক বিজয় সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। 

এ দেশে হাজার বছর ধরে ইতিপূর্বে যারা শাসন করেছে এবং যেসব ধর্ম-জাতির প্রভাব-প্রতিপত্তি বিরাজিত ছিল তাতেও পরধর্মসহিষ্ণুতা বা বিজাতীয়দের সহ্য করে নেওয়ার মতো মানসিকতা বা আচরণ কখনো দেখা যেত না। আর্যরা এসে দ্রাবিড়দের অস্তিত্ব বিপন্ন করে দিয়েছিল। হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকের সময়ে বৌদ্ধদের দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল, যা লক্ষ্মণ সেনের সময়ে ছিল আরও বেশি তীব্রতর। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেদের ছাড়া বাকি সব মানুষকে নিম্ন জাত দাবি করে ঘৃণা করত এবং অমানবিক নির্যাতন চালাত। তারা এ দেশের স্থানীয় বাঙালিদের অসভ্য বলত এবং শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে নিজেদের জাত্যাভিমানের প্রকাশ ঘটাত। ঠিক এমনই নাজুক পরিস্থিতিতেই পীর-মাশায়েখ ও ওলামায়ে কেরাম এ অঞ্চলে এসে ইসলামের সুমহান দাওয়াত প্রদান শুরু করেন। মানুষ তাদের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মূলত এভাবেই এই অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল।

তেরোশ খ্রিস্টাব্দের শুরুতে হজরত শাহজালাল ইয়েমেনি (রহ.) ৩৬০ সফরসঙ্গী নিয়ে সিলেট আগমন করেন। তাদের মাধ্যমে সারা দেশে আরও ব্যাপকভাবে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে। মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ শুরু করে। সুতরাং এই অঞ্চলে ইসলামের প্রসারে ৩৬০ আউলিয়ার ভূমিকা অপরিসীম। আর এই ৩৬০ জন আউলিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন হজরত শাহজালাল (রহ.)।

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে প্রাপ্ত ফলকলিপি সুহেলি ইয়ামেনি অনুসারে, তিনি ৩২ বছর বয়সে ৭০৩ হিজরি মোতাবেক ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট আগমন করেন। ১২৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মুহাম্মদ বা মাহমুদ। তার দাদার নাম ইব্রাহিম। তার জন্মভূমি ছিল প্রাচীন আরবে আজমের হেজাজ ভূমির তৎকালীন প্রদেশ ইয়েমেন দেশের কুনিয়া নামক শহরে। তিনি যখন তিন মাসের শিশু, তখনই তার মা ইন্তেকাল করেন। শিশুকালেই মাতৃহীন হন এবং পাঁচ বছর বয়সে পিতাকে হারান। মামা আহমদ কবির তাকে দত্তক নেন। আহমদ কবির আরবি ভাষায় কোরআন-হাদিস শিক্ষা দেওয়াসহ ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক বিষয়ে অভ্যস্ততার গুরুত্ব প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে আহমদ কবির তাকে ইয়েমেন থেকে মক্কায় নিয়ে যান। যেখানে তিনি ইসলামি শরিয়তের জ্ঞানে পাণ্ডিত্ব লাভ করেন।

হজরত শাহজালাল (রহ.)-কে সুফি মতবাদে দীক্ষিত করাই মামা আহমদ কবিরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বলে জানা যায়। যে কারণে আহমদ কবির তাকে নিয়ে মক্কায় আসেন। মক্কা শহরে সোহরাওয়ার্দী তরিকার প্রবর্তক সিহাবুদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত খানকায় (মরমি স্কুল) তৎকালে আহমদ কবির ছিলেন প্রধান তত্ত্বাবধায়ক। আহমদ কবির শাহজালাল (রহ.)-কে ইসলামের শরিয়ত ও মারেফত উভয় ধারায় শিক্ষাদানে দীক্ষিত করেন। এছাড়া তিনি দরবেশ পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন। জানা যায়, তার পিতা ছিলেন একজন দরবেশ এবং ধর্মানুরাগী মুজাহিদ।

একদা হজরত শাহজালাল (রহ.) ভারতবর্ষে ধর্ম প্রচারের স্বপ্ন দেখার পর মামা আহমদ কবিরের কাছে তা ব্যক্ত করেন। আহমদ কবির এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.)-কে ভারতবর্ষে যাওয়ার পরামর্শ দেন। মামার দোয়া নিয়ে তিনি ধর্মপ্রচারের জন্য আরবের মক্কা হতে হিন্দুস্তানের দিকে যাত্রা শুরু করেন। দিল্লিতে আসার পর হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ পান। তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিদায়কালে প্রীতির নিদর্শনস্বরূপ নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) তাকে একজোড়া সুরমা রঙের কবুতর উপহার দেন। মাজারসংলগ্ন এলাকায় সুরমা রঙের যে কবুতর দেখা যায় তা ওই কবুতরের বংশধর। যা জালালি কবুতর নামেও খ্যাত। অতঃপর পর্যায়ক্রমে তিনি ৩৬০ জন সঙ্গী নিয়ে সিলেটে আসেন। ৩৬০ জনের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন তার ভাগ্নে হজরত শাহ পরান (রহ.)।

বর্তমান মৌলভীবাজার জেলাসহ হবিগঞ্জ জেলার কিয়দংশ নিয়ে গৌড় রাজ্যের দক্ষিণ সীমাভূমি নবীগঞ্জের দিনারপুর পরগনার পাশে গৌড় রাজা গোবিন্দের চৌকি ছিল। হজরত শাহজালাল তার সঙ্গীদের নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে প্রথমত সেখানে অবস্থান করেন। এখানে গৌড়ের সীমান্তরক্ষীরা অগ্নিবাণ প্রয়োগ করে তাদের প্রতিহত করতে চায়। সেখান থেকে বর্তমান সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর নামক স্থানে আসেন। সন্দেহ নেই, আমাদের এই অঞ্চলে হজরত শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর মতো পীর-দরবেশ ও আউলিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমেই ইসলাম প্রবেশ করেছে।

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত