১৮ জুলাই দুপুর ১২টা। রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকায় কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। আবাসিক ভবনগুলোতে যারা রয়েছেন, তারা সবাই গৃহবন্দি। ইন্টারনেট বন্ধ, বুঝতে পারছেন না বাইরে কী হচ্ছে। পরিস্থিতি দেখতে কেউ কেউ বারান্দা, ছাদ কিংবা গ্যারেজে এসে উঁকিঝুঁকি মারছিলেন।
পুলিশের ছুড়ে মারা মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল, রাবার বুলেটে রক্তাক্ত আন্দোলনকারীরা। আহত শরীর নিয়ে দিগি¦দিক ছুটছেন শিক্ষার্থীরা। কেউ গলিতে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ আবার আশ্রয়ের জন্য ভবনগুলোর গেট খুলে দিতে আকুতি জানাচ্ছিলেন।
এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে বিবেকের তাড়নায় ঘরে বসে থাকতে পারেননি ওই এলাকায় বসবাস করা দুই চিকিৎসক অর্থী জুখরীফ ও হৃতিশা আক্তার মিথেন। সেদিন ওই দুই চিকিৎসকের উদ্যোগে ধানমন্ডি ৯/এ সড়কের ১৩৫ নম্বর বাড়িটির গ্যারেজ হয়ে ওঠে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাকেন্দ্র।
সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে ডা. অর্থী জুখরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের এমন অবস্থা দেখে আমরা ঘরে থাকতে পারিনি। আমার কোনো ভাই নেই, আমার ভাইয়েরও তো এমন হতে পারত বা আমার পরিবারের কারও তো এমন হতে পারত। আমি একজন চিকিৎসক, আমি রাজপথে গিয়ে সেøাগান না দিতে পারি কিন্তু সংকটে পড়া মানুষগুলোকে তো প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারি। সেই চিন্তা থেকে আমাদের ভবনের সবার উদ্যোগে আমরা গাড়ির গ্যারেজ খুলে দিই এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে থাকি।’
তিনি জানান, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা পর্যাপ্ত পরিমাণে তাদের দুজনের কাছে ছিল না। পরে ভবনের অন্য বাসিন্দারা তাদের বাসায় থাকা ফার্স্টএইড বক্স দিয়ে সাহায্য করেন। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আহত ছাত্র-জনতার সংখ্যা বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে চিকিৎসা সরঞ্জামও কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে ভবনের কয়েকজন বাসিন্দা গিয়ে একটি ফার্মেসি খুলিয়ে ওষুধ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে আসেন।
চিকিৎসক হৃতিশা আক্তার মিথেন বলেন, ‘ওই বীভৎসতা যা মুখে বর্ণনা করে বোঝানো যাবে না। কারও পুরো পিঠ জুড়ে বিদ্ধ হয়েছে রাবার বুলেট। কারও চোখে গুলি ঢুকে গেছে। যে চোখ আর কোনোদিন ঠিক হবে না। কারও শরীরে এমনভাবে গুলি ঢুকেছে, যা বের করা যাবে না। আমাদের কাছে গুলি বের করার তেমন কোনো সরঞ্জাম ছিল না। হাত দিয়ে যতটা সম্ভব বের করেছি। রক্ত বন্ধ করে ব্যান্ডেজ করেছি, ব্যথানাশক (পেইনকিলার) ওষুধ খাইয়েছি। অর্থাৎ প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা শরীরে গুলি নিয়ে যখন আসছিল তারা বেশ আতঙ্কিত ছিল। বারবার বলছিল, সে বাঁচবে তো? তবে যখন রাবার বুলেট বের করে জানাই তারা শঙ্কামুক্ত তখন তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত তেজ দেখেছি। তারা আবার রাজপথে গিয়ে আন্দোলনে তাদের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই করতে চায়। এটা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’
পরদিন ১৯ জুলাই একই স্থানে পুলিশের সঙ্গে আবারও সংঘর্ষ হয় আন্দোলনকারীদের। সেদিনও বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী আহত হয়। দ্বিতীয় দিনের মতো চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন অর্থী জুখরীফ ও হৃতিশা আক্তার মিথেন। সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে অর্থী বলেন, ‘দ্বিতীয় দিনের আন্দোলনে শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, কারও কারও অভিভাবকও এসেছেন তার সন্তানকে নিয়ে। অনেক বাবা আহতও হয়েছেন।’
একজন আহত বাবার কথা উল্লেখ করে এই চিকিৎসক বলেন, ‘তার শরীরে অসংখ্য গুলি (রাবার বুলেট) নিয়ে আমাদের গ্যারেজে আসেন। আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, এটা তো ছাত্রদের আন্দোলন, আপনি কেন এসেছেন? তখন তিনি বলেন, আমার একটাই সন্তান, একটাই কলিজা। ও পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে আর আমি ঘরে থাকব, এটা কি হয়?’
একটি শিশু আহত হওয়ার ঘটনা বলতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন ডা. অর্থী। তিনি বলেন, ‘একটি ৯-১০ বছরের শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিতে আসে আমাদের এখানে। সে আন্দোলনের কী বোঝে! কিন্তু সবার সঙ্গে এসেছে। আমরা তাকে চিকিৎসা দিই। তার মধ্যে কোনো ভয় দেখিনি। সে চিকিৎসা নিয়ে আবার আন্দোলনে যায়। পরে জানতে পারি গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে। আমি এখনো ঘুমের মধ্যে ওই ছেলের চেহারা দেখে ঘুম থেকে জেগে যাই।’
দুদিনে ১০০ জনেরও বেশি আহত শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন এ দুই চিকিৎসক। এ কাজ করায় তাদের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। ১৩৫ নম্বর বাসার নিচে আন্দোলনকারীরা আছে এমন খবর পেয়ে পুলিশ এসে ভবনের ভেতরে তাদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে একটি গ্রুপ এসে চিকিৎসক অর্থী ও মিথেনের খোঁজ করে এবং হুমকি দিয়ে যায়। তারপরও এ দুই চিকিৎসককে থামানো যায়নি। ১৯ জুলাই কারফিউতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেদিনও তারা তাদের এ সেবা অব্যাহত রাখেন।
সরকার পতনের অনুভূতি প্রকাশ করে ডা. অর্থী বলেন, ‘সেই দিনটি ছিল মুক্তির। বুকের ওপর একটা চাপা পাথর ছিল। মনে হলো হঠাৎ করে নেমে গেল। যে দুর্বিষহ দিন পার করছিলাম, মনে হলো মুক্ত হয়ে পাখির মতো আকাশে উড়ছি।’
আন্দোলনের রাজপথে নেমে মিছিলে শামিল হয়ে সেøাগানে কণ্ঠ মেলাতে না পারার আক্ষেপ হচ্ছিল অর্থী ও মিথেনের। তবে নিজেদের জায়গা থেকে এ প্রজন্মের যোদ্ধাদের পাশে থাকতে পেরে এই আক্ষেপ অনেকখানি ঘুচেছে। দুজনই বললেন, ‘জীবনে এমন সময় আর না আসুক। বাংলাদেশ ভালো থাকুক।’
