বিচার বিভাগকে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক এবং স্বাধীন করা সবচেয়ে জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘শাসকের আইন নয়, বরং আইনের শাসন করাই বিচার বিভাগের মূল দায়িত্ব।’ গতকাল শনিবার অধস্তন আদালতের বিচারকদের উদ্দেশে দেওয়া অভিভাষণে এসব কথা বলেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের ইনার গার্ডেনে সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠানে সারা দেশের প্রায় দুই হাজার বিচারক অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আইন ও বিচার উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আজিজ আহমদ ভূঞা। এ ছাড়া বিচারকদের প্রতিনিধি হিসেবে অধস্তন আদালতের বিচারকদের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরে বক্তব্য দেন খুলনার জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খাতুন এবং নওগাঁর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিশ^নাথ ম-ল।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে, বিদ্যমান সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রধান সমস্যা হচ্ছে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ কার্যকররূপে পৃথক না হওয়া। এর কুফল আমরা সবাই ভোগ করেছিলাম দেড় দশক ধরে। এ ছাড়া আছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। মামলা অনুপাতে বিচারকের থেকে পৃথক করা সবচেয়ে জরুরি নিদারুণ স্বল্পতা, বার ও বেঞ্চের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাবের ঘাটতি, আদালতগুলোর অবকাঠামোগত সংকট, অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি-পদোন্নতির ক্ষেত্রে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য নীতিমালা না থাকা, উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ ও স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে কোনো আইন না থাকা এবং প্রথাগত জ্যেষ্ঠতার নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ইত্যাদি বিষয়গুলো, যা আমাদের বারবার পিছিয়ে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘একটি ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থার কাজ হলো নিরপেক্ষভাবে, স্বল্প সময় ও খরচে বিরোধের মীমাংসা নিশ্চিত করে জনগণ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেওয়া। এজন্য বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা থেকে পৃথক এবং স্বাধীন করা সবচেয়ে জরুরি। কেননা শাসকের আইন নয়, বরং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই বিচার বিভাগের মূল দায়িত্ব।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের স্বার্থে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন একান্ত আবশ্যক। বিচারকদের প্রকৃত স্বাধীনতা ততদিন পর্যন্ত নিশ্চিত হবে না, যতদিন না বিচার বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা, অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ এখতিয়ার সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এটি (পৃথক সচিবালয়) হবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রথম ধাপ।’ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মতো বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তাব শিগগির আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে বিচার বিভাগের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। ন্যায়বিচারের মূল্যবোধকে বিনষ্ট ও বিকৃত করা হয়েছে। শঠতা, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে বিচার বিভাগকে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে। এতে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অথচ বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হচ্ছে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস। তাই নতুন এই বাংলাদেশে আমরা এমন একটি বিচার বিভাগ গড়তে চাই, যেটি বিচার এবং সততা ও অধিকারবোধের নিশ্চয়তার একটি নিরাপদ দুর্গে পরিণত হবে।’ বিচারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং বিচার বিভাগে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর অবস্থান উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আজ আমি এই মঞ্চ থেকে বিচার বিভাগে যেকোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করছি।’ বক্তব্যে অধস্তন আদালতের অবকাঠামো ও এজলাস সংকট, বিচারকদের আবাসন, নিরাপত্তাসহ নানা সমস্যা ও সংকট নিরসনে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধান বিচারপতি।
আমরা প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই: অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতকে নিয়ন্ত্রণ ও অভিভাবকত্ব করবে, সেই উচ্চ আদালতে আরও বেশি যোগ্য, সৎ এবং ডেডিকেটেড বিচারকের প্রয়োজন আছে। আমরা চেষ্টা করব, বাংলাদেশের উচ্চ আদালতসহ সব ক্ষেত্রে সংস্কার আনার।’ হাইকোর্টের বিচারকদের বিব্রতবোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিব্রতবোধ করবেন তো আপনার ভাইবোন আপনার কাছে এলে, বিচারপ্রার্থী মানুষ আপনার কাছে এসেছে, আপনি কীভাবে বিব্রতবোধ করেন? বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের মামলা গ্রহণ করতে বিব্রতবোধ করেছিলেন। কেন করেছিলেন? আপনার এটা দায়িত্ব না! আপনার এটা সাংবিধানিক দায়িত্ব না! আপনি শুনে রিজেক্ট করে দেন। সমস্যা নেই। আপনি শুনবেনই না। এগুলো আর করবেন না। মানুষ বোকা না।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার গায়েবি ও ঢালাও মামলা করেছে। আমরা এটা থেকে বের হতে চাই। মানুষের মনে অনেক ক্ষোভ ও অসন্তোষ আছে। এসব গায়েবি মামলার সংস্কৃতি দেখার অভ্যস্ততা আছে। অনেকের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা হয়ে যাচ্ছে। আপনারা (বিচারক) যারা নিম্ন আদালতে আছেন, বিচারিক আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে মানুষকে যতটা পারা যায় হয়রানি থেকে মুক্তি দেবেন।’ আদালতে কোনো বিচারপ্রার্থী যাতে হয়রানি ও হামলার শিকার না হোন, সে বিষয়ে বিচারকদের সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা ঢালাও মামলা, বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে মানুষকে হয়রানি করা, মানুষের জীবন-জীবিকা নিশ্চিহ্ন করা আমরা দেখতে চাই না। আমরা এমন একটি বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করব, যেখানে প্রকৃত ন্যায়বিচার হয়।’
দেড় দশকে বিচার বিভাগ ন্যায়বিচারের ঝান্ডা তুলতে ব্যর্থ: অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিগত দেড় দশকের বেশি সময়ে খুন, গুম, মামলা, হামলা, দমন-পীড়ন ও লুটপাটের মাধ্যমে নাগরিকদের ন্যূনতম অধিকার ও ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কথা বলার স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার হরণের মাধ্যমে বিরোধী মত দমনের নিকৃষ্ট ইতিহাস রচিত হয়েছিল। সেই দুঃসময়ে আমাদের বিচার বিভাগ ন্যায়বিচারের ঝান্ডা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। হয় দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, নয়তো নতজানু অবস্থান নিয়েছিল বলে জনমনে ধারণা আছে।’ তিনি বলেন, ‘বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের অনেক বড় সুযোগ আমরা হাতে পেয়েছি। আসুন আমরা জাতির স্বপ্ন পূরণের এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে সম্ভাবনার পথ ধরে এগিয়ে যাই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, বিগত সময়ের যেসব বিচারক ফ্যাসিজমের দোসর হিসেবে মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের ভূমিকা পালন করেছেন, তারা এখন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বা গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংয়ে রয়েছেন। এ বিষয়টি চলমান থাকলে জাতির কাছে ভুল বার্তা যাবে।’
