বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের অন্যতম প্রধান কাজ ক্লাস-পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকা। তবে এ কাজটিই সবচেয়ে কম করেন তিনি। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি কিংবা খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও থাকেন অনুপস্থিত। তার নেই উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণাকর্মও। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া। ঢাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ শিক্ষকের সব ব্যস্ততা যেন রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। ‘ক্লাস না নেওয়া বড় শিক্ষক নেতা’ হিসেবেই তিনি ক্যাম্পাসে পরিচিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েই বারবার ঢাবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছেন নিজামুল হক ভূঁইয়া। তিনি আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘নীল দল’র প্রভাবশালী নেতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটসহ প্রায় সব ফোরামেই দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষক রাজনীতির পাশাপাশি তিনি একজন ব্যবসায়ীও। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ায় অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে তার অব্যাহতি দাবি করেছেন পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা।
পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, বছরে দুই ক্রেডিটে প্রায় ৩০টি এবং চার ক্রেডিটে প্রায় ৬০টি ক্লাস নিয়ে থাকেন ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরা। তবে অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া ক্লাস নেন ২-৫টি, সর্বোচ্চ ৮-১০টি। কোনো কোনো ব্যাচে শুধু একটি ক্লাস নেওয়ারও নজির রয়েছে তার। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি, খাতা দেখা কিংবা ল্যাব ক্লাসের ক্ষেত্রে তিনি জুনিয়র শিক্ষকদের সহযোগিতা নেন। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে অনুপস্থিত থাকলেও তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস রাখেন না ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষকরা বলছেন, নিজামুল হক ভূঁইয়া ঢাবির তৎকালীন মৃত্তিকাবিজ্ঞান (বর্তমানে মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ) বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন। এ দুই পরীক্ষার ফলে তিনি দ্বিতীয় বিভাগ ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। এরপর ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সের (আইএনএফএস) ডিপ্লোমা কোর্স ও এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। ফলে ইনস্টিটিউটে ক্লাস নেওয়ার মতো সেভাবে প্রস্তুতি না থাকায় এ ব্যাপারে বরাবরই অনাগ্রহী তিনি।
জানা গেছে, ঢাবির এ অধ্যাপক ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাও নির্বাচিত হয়েছেন। পুরান ঢাকার বিসমিল্লাহ টাওয়ার ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া ঢাকা ক্লাব ও বোট ক্লাবসহ রাজধানীর প্রায় সব অভিজাত ক্লাবের সদস্য তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক পদে যোগদানের যোগ্যতা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন নিজামুল হক ভূঁইয়া। পরে পরিচয় ও সম্পর্কের প্রভাব খাটিয়ে অ্যাডহক ভিত্তিতে শিক্ষক পদে যোগ দেন তিনি। একই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক পদে চাকরি নিয়মিতকরণ হয় তার। নিজামুল হকের অ্যাকাডেমিক ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাজীবনে তিনি কোনো পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ বা শ্রেণি নিয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। স্নাতক-স্নাতকোত্তরের ফলে নিজ ব্যাচের মধ্যে তার অবস্থান ছিল পেছনের সারিতে। প্রধান লেখক (ফার্স্ট অথর) হিসেবে লিখেছেন তার এমন কোনো গবেষণা প্রবন্ধের খোঁজ পাওয়াও কঠিন। এমনকি তার পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। একাধিক গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিভাগের শিক্ষকরাও এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
একাধিক শিক্ষক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন যে উপাচার্য আসেন তার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন নিজামুল হক। কোনো ভবনের ফিতা কাটা থেকে শুরু করে সব কার্যক্রমে সামনের সারিতে থাকেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক। বিশেষ করে সাবেক পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীমের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। বেশিরভাগ সময় তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ‘ক্লাস না নেওয়া বড় শিক্ষক নেতা’ হিসেবেই তিনি ক্যাম্পাসে পরিচিত।
ঢাবির শিক্ষক ও নিজামুলের সহকর্মীরা জানান, ঢাকা, বোট এবং গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত ক্লাবের সদস্য তিনি। এর মধ্যে তিনি বোট ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটিতেও ছিলেন। তিনি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিকও বলে জানা গেছে।
ঢাবির পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ২১তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স, যে কয়টা ক্লাস পেয়েছি সেখানে তিন থেকে পাঁচটার বেশি ক্লাস তিনি (অধ্যাপক নিজামুল) নিতেন না। উনি যেসব জুনিয়র শিক্ষককে নিয়োগ দিতেন, তাদের দিয়েই প্রশ্ন তৈরি এবং খাতা দেখার কাজ করাতেন।’
২২তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পুরো চার বছরে উনার (নিজামুল হক ভূঁইয়া) আমরা মাত্র একটা ক্লাস পেয়েছি। তিনি চতুর্থ বর্ষে আমাদের একটা মাত্র ক্লাস নিয়েছেন। প্রথম ক্লাসে এসে পরিচয় পর্ব এবং কোর্স সম্পর্কে টুকটাক কথা বলে তিনি চলে গেছেন। এরপর জুনিয়র শিক্ষকদের দায়িত্ব দিয়ে দেন। তিনি কোনো ধরনের অ্যাকাডেমিক কাজেই অংশ নেন না। কোনো ল্যাব ক্লাসও নেন না। তার অধীনে যারা থিসিস করে সেটাও জুনিয়র শিক্ষকদের দিয়ে করান। নামেমাত্র সুপারভাইজার থাকেন তিনি। তিনি মূলত নামমাত্র শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান ও সংঘটিত ন্যক্কারজনক গণহত্যাকে উপেক্ষা করে হত্যাকারীদের সঙ্গে আপস ও এ বিষয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদানের জন্য আমরা এ অধ্যাপককে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দাবি করেছি।’
বিভাগের একজন শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধ্যাপক নিজামুল শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেন না। ক্লাস নিতে ইচ্ছুক না বিধায় উনাকে ক্লাসও দেওয়া হয় না তেমন। সত্যি বলতে ক্লাস নেওয়ার মতো তার তেমন যোগ্যতা নেই। ক্ষমতাসীন হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলেন না। কেউ বললেও তার বিরুদ্ধে লেগে থাকতেন তিনি। শিক্ষকদের মানসিক টর্চার করেন। উনি ক্লাস না নিয়ে রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন আর উপাচার্য এবং আওয়ামী নেতাদের খুশি রাখতেন। উপাচার্যের সঙ্গে কোনো প্রোগ্রাম তিনি মিস দেন না। বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে চলেন তিনি। জুনিয়র শিক্ষকদের তটস্থ করে রাখতেন, ফলে বাধ্য হয়ে তারা তার ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষাসংক্রান্ত কাজ করে দিতেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী একজন শিক্ষক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জানি তিনি (অধ্যাপক নিজামুল) কোনো ক্লাসই নেন না। যখন যে উপাচার্য আসেন তার আস্থাভাজন হয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয় যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে নীল দল থেকে মনোনয়ন নিয়ে তিনি একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নির্বাচিত হয়েছেন।’
ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি এমনটা হয় যে তিনি (নিজামুল হক ভূঁইয়া) ক্লাসই নেন না, এটা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। একজন শিক্ষকের প্রধান কাজই ক্লাস, পরীক্ষাসহ অ্যাকাডেমিক কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা। তিনি সেটা না করে থাকলে সম্পূর্ণ অনৈতিক।’
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়ার সঙ্গে একাধিকবার টেলিফোনে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ইনস্টিটিউটে তার নির্ধারিত অফিস এবং শিক্ষক ক্লাবে সমিতির সভাপতির নির্ধারিত কক্ষেও তাকে পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর সেভাবে আর কোথাও দেখা যায় না এ শিক্ষক নেতাকে। শিক্ষকদের একটি পক্ষ অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়ার নেতৃত্বাধীন বর্তমান শিক্ষক সমিতির কমিটিকেও প্রত্যাখ্যান করেছে।
