টানা ১০ ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে আলাদা হলো রিফা-শিফা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:৩০ এএম

টানা ১০ ঘণ্টার সফল অস্ত্রোপচারে আলাদা হলো জোড়া শিশু রিফা-শিফা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের নেতৃত্বে এই অস্ত্রোপচারে অংশ নেন বিভিন্ন হাসপাতালের ৮২ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

বর্তমানে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশু দুটি সুস্থ আছে। রিফা সুস্থ হয়ে উঠেছে। শিফার রক্তের সংক্রমণ থাকায় সেই অনুযায়ী তার চিকিৎসা চলছে।

পেটে থাকা অবস্থায় জোড়া লাগানো এই দুই শিশুর জন্মের পর থেকে অবর্ণনীয় সংগ্রাম করে যাচ্ছেন মা মাহমুদা আক্তার। জন্মের পরও সোয়া এক বছর শিশু দুটি জোড়া লাগানো ছিল। অবশেষে চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢামেক হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা হলো জোড়া শিশু শিফা-রিফা।

গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় ঢামেক হাসপাতালের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এই জোড়া লাগানো শিশুর অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়।

এ সময় এই অস্ত্রোপচার দলের প্রধান ঢামেক হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাহনূর ইসলাম জানান, গত ১৪ জুন বরগুনার বেতাগী এলাকার বাসিন্দা মাহমুদা বুক-পেট জোড়া লাগানো শিশু দুটিকে নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ২১ জুন হাসপাতালে শিশু সার্জারি বিভাগের ৫ নম্বর ইউনিটে তাদের ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক মাস পর আসতে বলা হয়। এক মাস পর এলে আবার ভর্তি করা হয় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে পুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধান দিয়ে আরও এক মাস পর আবার দেখা করতে বলা হয়। এভাবে টানা ছয় মাস চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর অস্ত্রোপচারের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

অধ্যাপক ডা. সাহনূর ইসলাম জানান, অবশেষে গত ৭ সেপ্টেম্বর টানা ১০ ঘণ্টাব্যাপী সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জোড়া লাগানো শিশু দুটিকে আলাদা করা হয়। পরে দুই শিশুকে আইসিইউতে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভেন্টিলেটর যন্ত্র দিয়ে রাখা হয়। পরে ৮ সেপ্টেম্বর প্রথমে রিফাকে ও পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর শিফাকে ভেন্টিলেটর মুক্ত করা হয়।

অস্ত্রোপচার দলের প্রধান এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, আলাদা করার পর রিফা সম্পূর্ণ সুস্থ থাকলেও শিফা অসুস্থ ছিল। তার হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। তাকে হার্ট ফাউন্ডেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে শিফার পিত্তনালির সংযোগ খুলে যাওয়ায় আবার অস্ত্রোপচার করা হয়। শিফা বর্তমানে আইসিইউতে আছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই চিকিৎসার খরচ বহন করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সমাজসেবা দপ্তর, আকিজ গ্রুপ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন কর্র্তৃপক্ষ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বারডেমের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ ও ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগ এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক ও তার বাবা-মা।

অধ্যাপক ডা. সাহনূর ইসলাম বলেন, ‘অর্থায়ন, জন্মগত ত্রুটি শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি অনেক কঠিন ছিল পুরো পরিস্থিতি। এসব ক্ষেত্রে কখনো কখনো এমন অবস্থায় পড়তে হয় দুজনের কাউকে রক্ষা করা যায় না। কখনো একজনকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। কিন্তু সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা দুই শিশুকেই বাঁচাতে সফল হয়েছি।’

এই চিকিৎসক জানান, শিফার সমস্যাগুলো ছিল জন্মগত হৃদরোগ-হৃৎপিণ্ডের পর্দা শেয়ারিং, যকৃৎ শেয়ারিং, সাধারণ যকৃৎ নালি, পোর্টাল শিরা, ডিওডেনাম ও ম্যালরোটেশন। আর রিফার ছিল হৃৎপিণ্ডের পর্দা, কমন যকৃৎ, পোর্টাল শিরা, ডিওডেনাম শেয়ারিং এসব সমস্যা। এমন অবস্থায় অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ফলাফল ভালো ছিল।

সংবাদ সম্মেলনে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। ১৫ জুলাই থেকে যুদ্ধের মধ্যে ছিলাম। এর মধ্যে ডা. সাহনূর এই শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করেছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লম্বা সময় নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এমন একটি সফল অস্ত্রোপচারের জন্য ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকদের ধন্যবাদ।

এ সময় শিশুদের বাবা বাদশা মিয়া বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে চিকিৎসকসহ সবার সহযোগিতা পেয়েছি। সবার কাছ থেকে আর্থিকভাবে সাহায্য পেয়েছি। হাসপাতালের পরিচালক স্যারসহ সব চিকিৎসক স্যারদের কাছে কৃতজ্ঞ।

বাদশা-মাহমুদা দম্পতির বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলায়। গত বছরের ৭ জুন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জোড়া বাচ্চার জন্ম দেন মাহমুদা। তাদের ঘরে ছয় বছরের এক কন্যাসন্তান রয়েছে। রিফা-শিফার বাবা বাদশা মিয়া ঢাকার মিরপুরে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তিনি ঢাকায় থাকেন। স্ত্রী-সন্তান থাকেন বরগুনায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত