১৮ দাবি মানলেন মালিকরা

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:১৭ এএম

পোশাক শ্রমিকদের হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বাড়ছে। একই সঙ্গে টিফিন ও রাত্রিকালীন ভাতা বাড়ানো ও বকেয়া মজুরি পরিশোধের বিষয়েও একমত হয়েছেন পোশাক কারখানা মালিকরা। শ্রমিকদের ১৮টি দাবির সবই মেনে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান মন্ত্রণালয়ের সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান। এ সময় অন্তর্র্বর্তী সরকারের চার উপদেষ্টা, ইউনিয়ন নেতা এবং বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে গাজীপুরে বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানায় গতকাল কাজ চলেছে। আর সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষের জেরে গতকালও ৫৫টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

এ সময় শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ায় বুধবার (আজ) থেকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এক মাস ধরে আলোচনা, দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে যে মূল দাবি ১৮টা, আমরা আইডেন্টিফাই করেছি। সেই ১৮ দাবির বিষয়ে মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকপক্ষ মিলে একটা সমাধানে পৌঁছানো গেছে। আমরা বিশ্বাস করি, এ দাবিগুলো সমাধানের দিকে আমরা এগোব।’

তিনি হুঁশিয়ার উচ্চারণ করে বলেন, ‘এরপর কেউ বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করলে সরকার তা বরদাশত করবে না। সেটা যদি কোনো মালিকপক্ষ বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ প্রকাশ করে এবং সদিচ্ছার অভাব থাকে এবং শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যদি বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেটার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা একটা সমঝোতায় পৌঁছেছি। এখন এই সমঝোতা স্মারকে আমার মালিকপক্ষ স্বাক্ষর করেছে, আমার শ্রমিক ভাইবোন স্বাক্ষর করেছে। এখন এই যে সমঝোতা চুক্তিটা হয়েছে, এটা আমরা সবাই মেনে চলব। এটা আমাদের সবাইকে অঙ্গীকার করতে হবে এবং এ সমঝোতা চুক্তি থেকে আমাদের কিন্তু পিছু হটার কোনো কারণ নেই।’

সচিব সফিকুজ্জামান বলেন, ‘শ্রমিকপক্ষের ৩৫ জন প্রতিনিধি ছিল, মালিকপক্ষ ছিল। তাদের ১৮টি দাবিতে একমত পোষণ করেছি। কাল (আজ বুধবার) থেকে সব ইন্ডাস্ট্রি নির্বিঘ্নে চলবে।’

এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।

গাজীপুরে কাজে যোগ দিয়েছেন শিল্প-কারখানার শ্রমিকরা : গাজীপুরে বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানায় গতকাল মঙ্গলবার কাজ চলেছে। শান্তিপূর্ণভাবে সকাল থেকে দলে দলে কারখানায় যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা। তবে শ্রমিক আন্দোলনের মুখে সোমবার বন্ধ ঘোষণা করা ১৩টি কারখানা গতকালও বন্ধ ছিল।

অন্যান্য দিন গাজীপুরের টঙ্গী, বাঘেরবাজার ও মৌচাক এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলেও গতকাল কোথাও শ্রমিক বিক্ষোভের সংবাদ পাওয়া যায়নি। সকালে যথারীতি কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা। কারখানা এলাকায় নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন ছাড়াও রয়েছে সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল। বিকেল পর্যন্ত থেকে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা শ্রমিক বিক্ষোভ ও অবরোধের খবর পাওয়া যায়নি।

শিল্পমালিক, শ্রমিক সূত্রে জানা গেছে, টানা কয়েক দিন শ্রমিক অসন্তোষ চলছে গাজীপুরে। বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, কারখানা ভাঙচুরের ঘটনায় অশান্ত হয়ে পড়ে গাজীপুর শিল্পাঞ্চল। ছুটি ঘোষণা করা হয় ১৩টি কারখানায়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তবে গতকাল সকাল থেকে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে বেশিরভাগ কারখানা খোলা ছিল। শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন নারী-পুরুষ শ্রমিকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী। কারখানা নিরাপত্তায় নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মী ছাড়াও অতিরিক্ত পুলিশ কাজ করছে। এ ছাড়া বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।

পোশাক শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর নানা দাবি নিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। এর মধ্যে কিছু কিছু শ্রমিক বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করেন।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর টঙ্গী জোনের সহকারী পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন বলেন, সকাল থেকেই গাজীপুরে বেশিরভাগ কারখানা খোলা ছিল। কোনো শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। কারখানা নিরাপত্তায় শিল্পপুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ কাজ করছে। বিজিবি ও সেনাবাহিনী টহল জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া বন্ধ ঘোষণা করা ১৩টি কারখানার কোনোটিই কার্যক্রমে ফেরেনি। মঙ্গলবারও ১৩টি কারখানা বন্ধ রয়েছে।

আশুলিয়ায় ৪৬ কারখানা বন্ধ, ৯টিতে সাধারণ ছুটি : এদিকে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষের জেরে গতকালও ৫৫টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৩ (১) ধারায় ৪৬টি এবং ৯টি কারখানায় সাধারণ ছুটি রয়েছে। এর বাইরে ডিইপিজেডসহ শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য কারখানায় স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে শিল্পাঞ্চলের কোথাও কোনো সড়ক অবরোধ কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়নি।

শিল্পপুলিশ জানায়, উৎপাদন বন্ধ থাকা কারখানাগুলো মূলত আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের দুই পাশে অবস্থিত। সকালে অনেক কারখানার শ্রমিকরা কাজ করার কারখানাগুলোর সামনে এলেও কারখানা বন্ধ পেয়ে তারা বাড়ি ফিরে গেছেন। এ ছাড়া যেসব কারখানা খোলা রয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ করেছেন। ৫৫টি কারখানা বন্ধ থাকলেও এর সব কারখানায় সমস্যা রয়েছে ব্যাপারটি এমন নয়। মূলত হাতেগোনা কিছু কারখানা থেকে শ্রমিক অসন্তোষের সূত্রপাত হচ্ছে যার প্রভাব আশপাশের কারখানাগুলোতেও পড়ছে।

সরেজিমনে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের উভয়পাশে অবস্থিত বেশিরভাগ কারখানার প্রধান ফটকে অনির্দিষ্টকালের বন্ধের নোটিস দেখা গেছে। এ সময় কারখানাগুলোর সামনে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা গেছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার বিষয়ে স্পষ্টভাবে কোনো নোটিস বা বক্তব্য দেয়নি মালিকপক্ষ। এ ছাড়া শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের সমন্বয়হীনতা রয়েছে অনেক কারখানায়। সরকারের উচিত এসব বিষয় খতিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আশুলিয়া শিল্পপুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম বলেন, তৈরি পোশাক শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধি, ইনক্রিমেন্টসহ অন্যান্য দাবিতে আন্দোলন করার কারণে মঙ্গলবার ৪৬টি কারখানা শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া আরও ৯টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল ১৩/১ ধারায় মোট ৪৩টি কারখানা বন্ধ ছিল।

এদিকে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানার সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনসহ শিল্পাঞ্চলে টহল কার্যক্রম অব্যাহত আছে বলেও জানান পুলিশ সুপার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত