টানা ৩২ বছর ধরে ইরান সমর্থিত লেবানন ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব দিয়েছেন হাসান নাসরাল্লাহ। হিজবুল্লাহকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তার।
দখলকৃত লেবাননি ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনাদের তাড়াতে প্রথমে একটি মিলিশিয়া দল হিসেবে গড়ে উঠেছিল হিজবুল্লাহ। পরে এ দলকেই লেবাননের সেনাবাহিনীর চেয়ে শক্তিশালী এক বাহিনীতে রূপ দেন নাসরাল্লাহ।
তবে গত শুক্রবার লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন তিনি। তাকে লক্ষ্য করেই বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।
নাসরাল্লাহর মৃত্যুতে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে হিজবুল্লাহ তাই নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দীর্ঘদিনের নেতৃত্বদানকারীকে হারিয়ে কি তবে দুর্বল হয়ে পড়বে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দলটি? খবর আল জাজিরা।
প্রয়াত হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ ৩২ বছরে অনেক সম্প্রসারণ করেছেন সংগঠনটিকে, একত্রিত করে রেখেছিলেন তার দলটিকে। হিজবুল্লাহর সামরিক দিক থেকেও শক্তিশালী হওয়ার পেছনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য।
হিজবুল্লাহকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনীতে পরিণত করার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তার। নাসরুল্লাহর নেতৃত্বে হিজবুল্লাহ ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের যোদ্ধাদের পাশাপাশি ইরাক ও ইয়েমেনের মিলিশিয়াদের প্রশিক্ষণগত সহায়তা দিয়েছে। তার নেতৃত্বে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহারের লক্ষ্যে ইরানের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেটের এক সমৃদ্ধ ভান্ডার রয়েছে হিজবুল্লাহর।
১৯৯২ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে হিজবুল্লাহর প্রধান হন নাসরুল্লাহ। তার পূর্বসুরী মুসাবি হত্যার পর হিজবুল্লাহ প্রধানের আসনে আসীন হন তিনি। আর তাই শুরু থেকে হাসান নাসরাল্লাহও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন।
দুর্বল হয়ে পড়বে হিজবুল্লাহ?
নাসরুল্লাহর মৃত্যুতে হিজবুল্লাহর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। এটুকু নিশ্চিত যে নাসরাল্লাহর মৃত্যুতে কঠোরভাবে আঘাত পেয়েছে সংগঠনটি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, হিজবুল্লাহ আঘাত পেলেও এটা স্বল্পমেয়াদী, কারণ এসব সংগঠনে একজন নেতা অন্য নেতার সাথে যেকোন সময় প্রতিস্থাপিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে এবং সংগঠনটি তার বিশাল সামরিক অস্ত্রাগার এবং শক্তি বজায় রাখে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মারান্দি বলেন, বৈরুতকে হিজবুল্লাহর "দুর্বলতম পয়েন্ট" হিসাবে বিবেচনা করা হয় কারণ এখানে পশ্চিমা দূতাবাস এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে হিজবুল্লাহকে সামরিকভাবে পরাজিত করার সামর্থ্য ইসরায়েলের নেই।
কার্নেগি মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ সিনিয়র ফেলো ইয়েজিদ সায়িগ বলেন, “হিজবুল্লাহ অদৃশ্য হয়ে যাবে না। ইরান তাদের রক্ষা না করতে পারলেও তাৎক্ষণিক কোন সিদ্ধান্ত নেবে না তাঁরা। তাঁরা (হিজবুল্লাহ) এখন সময় নেবে, ধৈর্য ধরবে এবং কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।“
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে হিজবুল্লাহ কিছু কিছু ভুল করেছে, যার কারণে সংগঠনটি ইসরায়েলের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে।
হামাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটির পাবলিক পলিসির সিনিয়র অধ্যাপক সুলতান বারাকাত বলেন, "হিজবুল্লাহ বড় ভুল করেছে তা হল ইরানীদের প্রক্সি হিসাবে তাদের ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া। হিজবুল্লাহ খুব কার্যকর ছিল যখন তারা লেবাননের ভূমির মুক্তি এবং তাদের নিজস্ব জনগণের জন্য লড়াই করেছিল।"
এদিকে বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে বেশ কয়েকটি রকেট ছুড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে লেবাননি সংগঠনটি বার্তা দিয়েছে যে, হামলা অব্যাহত রাখা হবে।
