সাভারের আশুলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও চার শ্রমিক। গতকাল সোমবার দুপুরে আশুলিয়ার টঙ্গাবাড়ি এলাকার ম-ল নিটওয়্যার কারখানার সামনে এ ঘটনা ঘটে।
ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া হামলা ও ভাঙচুরে জড়িত সন্দেহে ঘটনাস্থল থেকে নারীসহ অন্তত ৫১ জনকে আটক করা হয়েছে।
নিহত ওই শ্রমিকের নাম কাউসার আহাম্মেদ (২৬)। তিনি টঙ্গাবাড়ি এলাকার ম্যাংগো টেক্স লিমিটেড কারখানায় সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন।
গুলিবিদ্ধ হয়ে কাউসারের মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এনাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. এনামুল হক মিয়া। তিনি জানান, নিহত শ্রমিক কাউসার আহাম্মেদের তলপেটের বামপাশে গুলি লেগেছে। তাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। আশঙ্কাজনক হওয়ায় বাকিদের মধ্যে একজনকে আইসিইউতে ও একজনকে সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নয়নের বুকের ডানপাশে গুলি লেগে বের হয়ে গেছে এবং রাসেলের বুকে এবং পেটে দুটি গুলি লেগে পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে। ন্যাচারাল ডেনিমসের শ্রমিক হাবীব ও ন্যাচারাল ইন্ডিগো কারখানার শ্রমিক নাজমুল হাসানের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
শ্রমিকরা জানান, সকালে ম-ল গ্রুপের শ্রমিকদের প্রতিনিধির সঙ্গে মালিকপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ত্রিপক্ষীয় বৈঠক চলছিল। এ সময় সমঝোতা না হওয়ায় শ্রমিকরা কারখানার বাইরে অবস্থান নেন। পরে অন্য কারখানার শ্রমিকরা সেখানে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় দায়িত্বরত পুলিশসহ যৌথ বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লাঠিচার্জ শুরু করেন। এরপর র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করেন শ্রমিকরা। হামলায় শিল্প পুলিশের এসপি সারোয়ার আলম গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নারীসহ অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
অন্যদিকে সকাল ১০টার দিকে সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণসহ বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে প্রায় ৫ ঘণ্টা আশুলিয়ায় নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল ও ডিওএইচএস পয়েন্টে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ডংলিয়ন ও বার্ডস গ্রুপের শ্রমিকরা। তারা জানান, গত ২৭ আগস্ট লে-অফ ঘোষণা করে নোটিস দেয় বার্ডস গ্রুপ। এতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কাজ না থাকায় অব্যাহতভাবে আর্থিক লোকসানের মধ্যে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা না করার কথা জানানো হয়। নোটিসে ২৮ আগস্ট থেকে গ্রুপটির আর এন আর ফ্যাশনস লিমিটেড, বার্ডস গার্মেন্টস লিমিটেড, বার্ডস লিমিটেড এবং বার্ডস এ অ্যান্ড জেড লিমিটেডের সব শাখার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিকনেতা বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর শ্রমিকদের নির্ধারিত পাওনাদি পরিশোধের কথা ছিল। এই তারিখ পিছিয়ে আরও তিন মাস সময় চায় কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের বুঝিয়ে এই তিন মাস সময় নিয়ে দিতে শ্রমিক নেতারা ২০ লাখ টাকা দাবি করেন কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে। পরে ১২ লাখ টাকায় রফা হয়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ৪ শ্রমিক নেতা কারখানার আইনজীবী ‘আমেনার’ সঙ্গে মিটিং করার পর বার্ডস গ্রুপের পক্ষ থেকে তিন মাস সময় চেয়ে একটি নোটিস দেওয়া হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন।
এ ছাড়া ডংলিয়ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা জানান, কয়েক দিন পরপর ১৩(১) ধারায় কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এ পর্যন্ত তিনবার কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। গতকাল থেকে আবারও ১৩ (১) ধারায় কারখানা বন্ধের নোটিস দেওয়ায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা।
এর আগে সকালে জিরাবো পুকুরপাড় এলাকার বন্ধ থাকা লুসাকা গ্রুপের বেক নিট লিমিটেড ও তাম্মাম ডিজাইন লিমিটেড কারখানার সামনে গিয়ে দেখা যায় যৌথ বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য বিশমাইল জিরাবো সড়কের উভয় পাশে অবস্থান নিয়েছেন। তবে পাশের অ্যাকটিভ কম্পোজিট মিলস লিমিটেড কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করেছেন শ্রমিকরা।
রাইজিং গ্রুপের অ্যাকটিভ কম্পোজিট মিলস লিমিটেড কারখানার এইচআর এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. তৌহিদুজ্জামান বলেন, ‘সরকার এবং বিজিএমইএর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সব দাবি মেনে নেওয়ায় শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছে। কিন্তু পাশের বন্ধ থাকা লুসাকা গ্রুপের শ্রমিকরাসহ বহিরাগত লোকজন এসে গেটে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালায়। তখন বাধ্য হয়েই কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।’
জিরাবো এলাকার পিএমকে হাসপাতালের অ্যাডমিন ম্যানেজার নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে চারজন শ্রমিককে আহত অবস্থায় আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনের পায়ে গুলি লেগেছে।’
ন্যাচারাল ডেনিম কারখানার এইচআর অ্যাডমিন কর্মকর্তা সবুজ হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের কারখানায় কোনো সমস্যা ছিল না। সকাল থেকেই শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছিলেন। হঠাৎ খবর আসে পাশের ম-ল গার্মেন্টসের শ্রমিক মারা গেছেন। এটা শুনেই সব শ্রমিক একসঙ্গে কারখানা থেকে বেরিয়ে ওই গার্মেন্টসের সামনে চলে যান। পরে ওখানে কী ঘটেছে আমার জানা নেই।’
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম বলেন, ‘সকাল থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তৈরি পোশাক শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছেন। দুপুরের দিকে ম-ল নিটওয়্যার কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করার সময় পার্শ্ববর্তী ম্যাঙ্গোটেক্স ও ন্যাচারাল ডেনিম কারখানার শ্রমিকরা আমাদের ওপর হামলা করে। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জসহ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়। এর বাইরে শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারায় ১১টি কারখানা বন্ধ আছে এবং ৭টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।’ যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শিল্প পুলিশ, এপিবিএনসহ সেনাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি।
আশুলিয়া থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক জানান, আশুলিয়ায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সেনাবাহিনী ও র্যাবের ৯টি গাড়ি ভাঙচুর করেছেন। এ সময় শ্রমিকদের হামলায় শিল্প পুলিশের এসপি সারোয়ার আলম, র্যাবের এএসপি, সেনাবাহিনীর কর্নেল, লে. কর্নেল, মেজর, সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার ও চারজন সৈনিকসহ অন্তত ২০ জনসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া হামলায় জড়িত সন্দেহে ঘটনাস্থল থেকে ৩ নারীসহ ৫১ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা করা হবে বলে জানান তিনি।
শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় বেতন ও হাজিরা বোনাস বৃদ্ধিসহ ১৮ দফা দাবি পূরণের যৌথ ঘোষণা পর শিল্প কারখানায় স্বাভাবিকভাবে কাজ করেছিলেন পোশাকশ্রমিকরা। এর মধ্যে কয়েকটি মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের বনিবনা না হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানাগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানার শ্রমিকরা একজোট হয়ে বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়াসহ দাবি আদায়ে আন্দোলন করে আসছে।
গাজীপুরে কারখানা বন্ধের নোটিস দেখে শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ : গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানা বন্ধের নোটিস দেখে বিক্ষোভ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ ঘটনায় আধাঘণ্টা ওই মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। এতে ওই সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
জানা গেছে, গাজীপুর সর উপজেলার ভবানীপুর এলাকার আর অ্যান্ড জি (বিডি) গার্মেন্টস লিমিটেডের শ্রমিকরা গতকাল কাজে যোগদান করতে এসে কারখানার প্রধান ফটকে বন্ধের নোটিস দেখতে পান। পরে শ্রমিকরা কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে কারখানা সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। একপর্যায়ে পৌনে ৯টার দিকে তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সোয়া ৯টার দিকে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করে নিলে আধা ঘন্টা পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
নারায়ণগঞ্জে কারখানা লে-অফের প্রতিবাদে শ্রমিকদের বিক্ষোভ : নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার জনী টেক্সটাইল নামের কারখানা অবৈধভাবে লেঅফের (বন্ধ ঘোষণা) চেষ্টার প্রতিবাদে গতকাল বিক্ষোভ মিছিল করেছেন কারখানাটির শ্রমিকরা। দুপুরে শহরের চাষাঢ়ায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়ে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফতুল্লার চাঁদমারী এলাকায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে বিকেল পর্যন্ত সেখানে বিক্ষোভ দেখান তারা। এ সময় শ্রমিকরা মালিককে দ্রুত গ্রেপ্তার, লে-অফ প্রত্যাহার এবং বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধের দাবি জানান।
