ডলার সংকটসহ বিভিন্ন কারণে দেশে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে পণ্য আমদানিতে এলসি বা ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির হার কমেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে জ্বালানি (পেট্রোলিয়াম) আমদানির এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে এলসি খোলা কমেছে ৩৬ শতাংশেরও বেশি। এ সময়ে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ কমেছে ২০ শতাংশ।
তবে এলসি খোলা কম হলেও দেশে জ্বালানি ঘাটতি হওয়ার কোনো শঙ্কা দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ডলার সংকট ছাড়াও দেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এলসি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গত জুলাই মাস জুড়ে ছাত্র আন্দোলনের কারণে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকা এবং ব্যাংকে সাধারণ ছুটি এ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করেছে। এরপর গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মালিকানায় ব্যাপক পরিবর্তনসহ সার্বিক ব্যাংক খাতে অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে পরিস্থিতির দ্রুতই উন্নতি হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশের ব্যাংকগুলোতে ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলারের এলসি খুলেছেন আমদানিকারকরা; যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১৫১ কোটি ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে এলসি খোলা কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে শিল্পের কাঁচামাল ছাড়া সব খাতের এলসি খোলার অঙ্ক কমেছে। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জুলাই-আগস্ট মাসে জ্বালানি খাতে এলসি খোলা কমেছে ৩৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এ ছাড়া ভোগ্যপণ্য আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আমদানি কমার মধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতি ৪৩ দশমিক ৭১ শতাংশ, ইন্টারমিডিয়েট গুডস বা মধ্যবর্তী পণ্য ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্য কমেছে ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ। তবে কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে ১ দশমিক ৫০ শতাংশ।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানির দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, রূপালী ও জনতা ব্যাংক ছাড়াও বেসরকারি ইসলামী, ওয়ান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে থাকে সংস্থাটি। এর মধ্যে বেশিরভাগ কার্যক্রম হয়ে থাকে সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে। আমদানি ছাড়াও তেল পরিশোধন ও সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর তদারকি সংস্থাটি বলছে, ব্যাংকগুলো আগের মতো জ্বালানি তেল আমদানির এলসি খুলছে না।
ব্যাংকাররা বলছেন, ডলার সংকটে আমদানি ব্যয় কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত দেড় বছর ধরে আমদানির এলসি খোলায় শতভাগ মার্জিন রাখা, বিলাসদ্রব্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করাসহ অনেক পদক্ষেপই নিয়েছে। এতে আমদানি কমে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের ট্রেড ও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সের উন্নতি হলেও সরকারি ও বেসরকারি ঋণ পরিশোধের চাপ ও ট্রেড ক্রেডিট বাড়ায় ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের ঘাটতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
তবে এলসি খোলা কম হলেও দেশে জ্বালানি ঘাটতি হওয়ার কথা নয় বলে মনে করছেন বিপিসি চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে আমদানি করা হচ্ছে। গত মাসে আমাদের চাহিদা কম থাকার কারণে হয়তো এলসি কম খোলা হয়েছে। একটা জাহাজ ইচ্ছা করেই ডেফার্ড (বিলম্বিত) করা হয়েছিল। আমাদের জ্বালানি স্টকে (মজুদ) ছিল এবং সেটা না নেওয়ার ফলে এক্সট্রা (অতিরিক্ত) ২০ মিলিয়ন ডলার (২ কোটি ডলার) আমাকে দিতে হয়নি। আমাদের ওভারডিউস অনেক হয়ে গেছিল। সেখানে আমরা বেশি কিছু পরিশোধ করেছি। এখন আমাদের যে পরিমাণ জ্বালানি স্টকে আছে আশা করছি সংকট পড়বে না।’
এদিকে দেশে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশই আসে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মাধ্যমে। কিন্তু এলএনজি সরবরাহের জন্য দুটি টার্মিনালের একটি দুর্ঘটনার কারণে বন্ধ ছিল সাড়ে তিন মাস। এ সময় দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়ে দেখা দেয়। বর্তমানে দুটি টার্মিনাল সচল থাকলেও এখনই পূর্ণ সক্ষমতায় এলএনজি দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি করতে পারছে না পেট্রোবাংলা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ আইন স্থগিত করায় দ্রুততার সঙ্গে কোনো একটি কোম্পানিকে দিয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির সুযোগ এখন আর নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুলাই-আগস্ট মাসে আমদানি এলসির নিষ্পত্তি কমেছে ১৩ শতাংশ। এ সময়ে ব্যাংকগুলো আমদানি এলসির পেমেন্ট করেছে ১০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩৪ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে পেমেন্ট করেছিল ১১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১৮৯ কোটি ডলার।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সব খাতের পণ্যের আমদানি নিষ্পত্তি কমেছে। এর মধ্যে জ্বালানি খাতে কমেছে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ, ভোগ্যপণ্য কমেছে ৩২ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতি ৩৩ দশমিক ১৭ শতাংশ, ইন্টারমিডিয়েট গুডস ২১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্য আমদানি দায় নিষ্পত্তি কমেছে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট মাসে জ্বালানি খাতে এলসি খোলা হয়েছে ১২৪ কোটি ডলার; যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯৫ কোটি ডলার। সে হিসাবে এলসি খোলা কমেছে ৭১ কোটি ডলার বা ৩৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এ ছাড়া জুলাই-আগস্ট মাসে এলসি নিষ্পত্তি করা হয়েছে ১৩২ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময় ছিল ১৬৬ কোটি ডলার। সে হিসাবে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ কমেছে ৩৪ কোটি ডলার বা ২০ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডলার সংকটের মধ্যেও ৬ হাজার ৮১৯ কোটি ডলারের ঋণপত্র খুলেছেন দেশের আমদানিকারকরা। এ হিসাব আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ডলার। তবে এর আগের বছর এলসির পরিমাণ আরও বেশি ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯ হাজার ৪২৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানির এলসি খোলা হয়েছিল।
সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৬ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের আমদানি এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ৭২ দশমিক ৯১ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ২৯১ কোটি ডলার। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এলসি নিষ্পত্তি কমেছিল ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
