‘ভাষায় বা লেখনীতে যত আক্ষেপের সুর আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে করুণ হলো হতে পারত!’ ১৮৫৬ সালে জন গ্রিনলিফ হুইটিয়ারের ‘মড মুলার’ কবিতায় লেখা এই বিখ্যাত লাইনটাই যেন বর্তমান ইংল্যান্ড ফুটবল দলের ড্রেসিংরুমের চিত্র। শিরোপা জয়ের প্রবল আকাক্সক্ষা নিয়ে উত্তর আমেরিকায় আসা দলটি শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জ পদক নিয়েই বাড়ি ফিরছে। অথচ মায়ামির স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের জালে ছয় গোল দেওয়ার পর ফুটবল বিশ্বের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন, যে দলটা ফ্রান্সকে মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে, সেই ইংল্যান্ড কেন সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রক্ষণাত্মক খোলসে নিজেকে বন্দি রেখেছিল? ‘কী হতে পারত?’ এই আক্ষেপই এখন ইংল্যান্ডের প্রতিটি সমর্থক আর খেলোয়াড়দের নীরব সঙ্গী।
অন্যদিকে, ফুটবল যেন একই সঙ্গে সাফল্য আর বিষাদের রঙ্গমঞ্চ। মাঠজুড়ে গোল আর আনন্দের মাতামাতির মধ্যেও কিলিয়ান এমবাপ্পের চোখেমুখে ছিল এক গভীর শূন্যতা। জোড়া গোল করে লিওনেল মেসিকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসার পর এমবাপ্পে কোনো জয়ধ্বনি দিলেন না, বরং ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া আমার কাছে এখন বড় কোনো অর্জনের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এর চেয়ে অনেক ভালো লাগত যদি আমি আগামীকাল (রবিবার) ফাইনালটা খেলতে পারতাম।’ এমন কিছুর বর্ণনা দিতে ফুটবলের কোনো দার্শনিক বোধহয় এমনটাই ভাবতেন, আমরা সব সময় সেই সব তারকাদেরই খুঁজি, যাদের উজ্জ্বলতায় আকাশ আলোকিত হয়; কিন্তু ভুলে যাই, সেই তারকারা কখন জ্বলে উঠল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা কেন ঠিক সময়ে জ্বলে উঠতে পারল না। এমবাপ্পের এই স্বীকারোক্তি যেন মাঠের বাতাসে এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে পড়ল, যেখানে রেকর্ড আর ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠল সেই অধরা ফাইনালের হাহাকার।
মায়ামির ম্যাচটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের এক অদ্ভুত বিস্ময়। ৪-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিরতিতে যাওয়া ইংল্যান্ড প্রথমার্ধে খেলেছে যেন রূপকথার মতো। অথচ এই একই দল কয়েক দিন আগে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে রক্ষণাত্মক খোলসে নিজেকে বন্দি রেখেছিল। বুকায়ো সাকা, যিনি সেমিফাইনালে সাইডবেঞ্চে বসেই সময় পার করেছিলেন, তিনি এই ম্যাচে উপহার দিলেন এক অনবদ্য হ্যাটট্রিক। প্রথমার্ধের ইংল্যান্ডকে দেখে মনে হচ্ছিল, এরা কেবল ম্যাচ জিতছে না, বরং বিশ্বকে দেখাচ্ছে তাদের আসল সক্ষমতা।
ম্যাচের শুরু থেকেই ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ ছিল বিধ্বংসী। তৃতীয় মিনিটেই ডেকলান রাইসের গোল ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেয়। এরপর এজরি কনসার হেডে ব্যবধান দ্বিগুণ হয়। প্রথমার্ধের পুরো সময়জুড়ে সাকা ও মার্কাস রাশফোর্ডের গতির কাছে দিশেহারা ছিল ফরাসি রক্ষণ। প্রথমার্ধে সাকা একাই জোড়া গোল করে দলকে ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন।
তবে বিরতির পর চিত্রটা পুরোপুরি বদলে যায়। ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম চারজন খেলোয়াড় বদল করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। অলির অলিভিয়েরের পাস থেকে এমবাপ্পে প্রথম গোলটি শোধ করেন। এরপর ব্র্যাডলি বারকোলা এবং এমবাপ্পের নিজের দ্বিতীয় গোলে স্কোরলাইন দাঁড়িয়ে যায় ৪-৩। হঠাৎ করেই ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ খেই হারিয়ে ফেলে, যা সেমিফাইনালের সেই রক্ষণাত্মক ভুলের স্মৃতিই মনে করিয়ে দিচ্ছিল। তবে ইংল্যান্ডের ত্রাণকর্তা হয়ে আসেন সাকা। পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। শেষ দিকে উসমান দেম্বেলে ফ্রান্সের হয়ে আরেকটি গোল করলে স্কোর হয় ৫-৪। তবে ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামা জুড বেলিংহাম অসাধারণ এক একক নৈপুণ্যে গোল করে ৬-৪ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের জয় নিশ্চিত করেন।
কিন্তু সবার মনে বড় প্রশ্ন জেগেছে সেখানেই, কেন এই আক্রমণাত্মক ফুটবল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দেখা গেল না? টমাস টুখেলের কৌশল নিয়ে তাই এখন আরও একবার সমালোচনার ঝড়। টুখেল অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে বারবার নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিটি ম্যাচের চাহিদা ভিন্ন। তবে ফুটবলপ্রেমীরা সহজে এমন কিছু মানতে নারাজ। সেমিফাইনালের সেই রক্ষণাত্মক কৌশলের ভুল, যেখানে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার কাছে ম্যাচ হারতে হয়েছিল, সেটিই এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ইংলিশদের।
ম্যাচ শেষে টুখেল স্বীকার করেছেন, ‘আমরা অনেক বড় স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেমিফাইনালের সেই ব্যথাটা সহজে যাওয়ার নয়।’ তবে ব্রোঞ্জ জয়কে তিনি দেখছেন ভবিষ্যতের একটি ধাপ হিসেবে। ৬০ বছরের মধ্যে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ হিসেবে এই ব্রোঞ্জকে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করলেও, ড্রেসিংরুমের সেই হতাশা ঢাকা পড়ছে না। অধিনায়ক রাইস অবশ্য দলকে ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়ে বলেন, ‘এটি অনেক দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সেরা ইংল্যান্ড দল। আমরা খুব কাছাকাছি ছিলাম, ক্ষুদ্র কিছু ভুলই ব্যবধান গড়ে দিয়েছে।’
এদিকে ফ্রান্সের জন্য এই ম্যাচটি ছিল একটি যুগের অবসান। কোচ দেশমের ১৪ বছরের সফল অধ্যায়ের ইতি ঘটল এমন এক গোলবন্যায়। ৪-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা ফ্রান্স দ্বিতীয়ার্ধে যখন ঘুরে দাঁড়াল, তখন এমবাপ্পের বিধ্বংসী রূপ দেখে মনে হচ্ছিল ম্যাচটি হয়তো ড্র হতে যাচ্ছে। এমবাপ্পে যেন মাঠে নেমেছিলেন রেকর্ড ভাঙার পণ নিয়েই। ১০ গোল করে বর্তমান বিশ্বকাপের শীর্ষ স্কোরার এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পর তাকে ঘিরে যখন ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলছে, তখন তার চোখের কোণে সেই ফাইনাল না খেলার বেদনা। ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলগত সাফল্যের যে তৃষ্ণা একজন চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়ের থাকে, এমবাপ্পে সেটাই স্মরণ করিয়ে দিলেন বারবার।
এই ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে ঠিকই, কিন্তু এটাও চিরকাল মনে করিয়ে দেবে যে, ফুটবলে সঠিক সময়ে সাহসী সিদ্ধান্তই জয় ও পরাজয়ের মধ্যে ব্যবধান গড়ে দেয়। ইংল্যান্ডের এই ছয় গোলের উৎসব যেন আসলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য; যেখানে তারা বিশ্বজয়ের সব বারুদ মজুদ রেখেও শিরোপার লড়াই থেকে ছিটকে পড়েছে। এই জয় তাদের ক্যাবিনেটে একটি ব্রোঞ্জ পদক যুক্ত করলেও, সমর্থকদের মনে সেই আক্ষেপটিই তাজা করে তুলল; যা পাওয়ার যোগ্য তারা ছিল, তা এখন শুধুই এক অতীত। ফাইনালের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পৃথিবী যখন মেসি আর ইয়ামালের লড়াইয়ে নতুন ইতিহাস রচনার অপেক্ষায়, তখন ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ইংল্যান্ডের এই আক্ষেপ আর এমবাপ্পের সেই বিষাদগাথা এক ভিন্নমাত্রার দলিল হয়ে রইল।