মহসিনের খোঁজ না পেয়ে পাগলপাড়া পরিবার

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৪, ০২:৩৫ পিএম

হুট করে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া তার ক্ষেত্রে ঘটেছে বহুবার। তবে এবারের মতো হয়নি কখনো। গত ২৫ আগস্ট উদোম শরীরে মালিবাগের বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা গোলকিপারের স্বীকৃতি পাওয়া মোহাম্মদ মহসিন। এরপর থেকেই মিলছে না কোনো খোঁজ। সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও পাওয়া যায়নি তাকে।

রাজধানীর দুটি থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে, হাসপাতাল, বাস, ট্রেন স্টেশনে হণ্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে ৬১ বছর বয়সী মহসিনকে, এলাকায় এলাকায় করা হচ্ছে মাইকিং, দেয়ালে টাঙানো হয়েছে ছব সম্মিলিত নিখোঁজ সংবাদ। তারপরও বাসায় ফিরেননি জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়ক। ছেলের খোঁজ না পেয়ে অসহায় মায়ের সময় কাটছে চোখের জল ফেলে। ভাই-বোনরাও দিশেহারা। আর ফুটবলঙ্গনের মানুষরাও আছেন ভীষণ উৎকণ্ঠায়।

আশি-নব্বই দশকে তুমুল জনপ্রিয় এই গোলকিপার দীর্ঘদিন ধরেই নানারকম শারীরিক ও মানসিক রোগে আক্রান্ত। ১৯৯৫ সালে খেলা ছাড়ার পর পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর কানাডায়। বিয়ে করে চেয়েছিলেন স্থায়ী হতে। তবে সেই বিয়ে টিকেনি। প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি। ২০১৪ সালে অনেকটা নিঃস্ব, বিপর্যস্ত অবস্থায় দেশে ফিরে এসেছিলেন। জীবন যুদ্ধে হারের হতাশা মুড়ষে পড়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর অবহেলায় শরীরেও বাসা বাঁধে নানা রোগ-বালাই। তবে জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে একেবারে ভুলে যায়নি। তার অসুস্থতার বিষয়টি চাউড় হওয়ার পর সমাজের অনেকেই তাকে চিকিৎসা সহায়তা দিতে হাত বাড়ান।

-----

এক বছরের বেশি সময় আগে সতীর্থ, শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু-বান্ধবের কল্যাণে তার চিকিৎসা শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাবেক ক্রীড়া মন্ত্রী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান নিয়েছিলেন সকল চিকিৎসার দায়িত্ব। তার তৎপরতায় বোর্ড বসিয়ে মহসিনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এরপর কিছুটা সুস্থ হলে তাকে মা-ভাইয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বাসাতেই চলছিল তার চিকিৎসা। তবে এর মধ্যেই বার দুয়েক নিখোঁজ হন মহসিন। তবে দুই-তিনদিন পর ফিরে আসেন নিজের মতো করেই। তবে মাস পেড়িয়ে গেলেও এবার সেরকমটা না হওয়ায় ভিষণ শঙ্কায় পড়েছে তার পরিবার। ছোট ভাই পিন্টু ইসলামের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজেও কোথাও পাচ্ছি না। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেছি। এরকমটা আগে কখনো হয়নি। এর আগেও ভাই বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন। তবে সর্বোচ্চ তিনদিনের বেশি বাইরে ছিলেন না। এবার যে কোথায় গেলেন উনি। বের হওয়ার সময় তার শরীরে কোন শার্ট ছিল না। কাজের মেয়ে দেখতে পেয়ে দৌঁড়ে গিয়ে জামা দিতে চেয়েছিল। সেটাও পড়ার আগ্রহ ছিল না। এদিকে ভাইয়ের চিন্তায় মা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে ফেলেছেন। আমি সারারাত সবখানে খুঁজে বেড়াই আর ভোরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করি। জানি না ভাই কী অবস্থায় আছেন।’

কমলাপুর ও রমনা থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে মহসিনের পরিবারের পক্ষ থেকে। পুলিশও চেষ্টা করছেন সাবেক এই ফুটবলারকে খুঁজে বের করার। এদিকে মহসিনের খোঁজ না পেয়ে উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন তার দীর্ঘদিনের সতীর্থরাও। মোহামেডান, আবাহনী, মুক্তিযোদ্ধা, ব্রাদার্সসহ দেশের বড় সব ক্লাবে খেলা ও অধিনায়কত্ব করা মহসিনের দীর্ঘদিনের সতীর্থ, জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার আবদুল গাফফার উৎকণ্ঠা নিয়ে বলেন, ‘আমরা জোড় চেষ্টা করছি ওকে খুঁজে বের করতে। ওর পরিবারের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক। মহসিনের চিকিৎসা থেকে শুরু করে সবকিছুই তো আমার তত্ত্বাবধানে হচ্ছিল। গতকালও আমার ব্যক্তিগত গাড়ি ওর পরিবারের সদস্যদের দিয়েছি খোঁজ করার জন্য। ও রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খেলোয়াড়। ওকে খুঁজে বের করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত