পাইপ লাইনে তেল খালাসের (এসপিএম সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) ব্যর্থতার বলি হচ্ছে ৩৭ বছরের পুরনো দুই জাহাজ। এসব জাহাজ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তেল পরিবহনের যোগ্য না হলেও নিজস্ব জলসীমায় বিশেষ অনুমোদন নিয়ে তেল পরিবহন করে আসছে। পুরনো এ দুই জাহাজে শুধু মেইনটেন্যান্স খাতে খরচ হয় বছরে ৩০ কোটি টাকা। সে হিসেবে গত সাত বছরে এ দুই জাহাজের পেছনে ২১০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এই টাকায় একটি নতুন জাহাজ কিনতে পারত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন।
গত সোমবার কর্ণফুলী নদীতে ডলফিন জেটিতে (ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল খালাসের জেটি) নোঙর করা অবস্থায় ১১ হাজার ৭০০ টন নিয়ে ‘বাংলার জ্যোতি’ প্রথমে বিস্ফোরণ ও পরে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়। আর বিস্ফোরণে একজন ক্যাডেট ও অন্য দুজন মেরিন ওয়ার্কস কর্মীর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তেলের ট্যাংকে বিস্ফোরণ না হয়ে জাহাজের ওপরের অংশে বিস্ফোরণ হওয়ায় বড় বিপদ থেকে রক্ষা হয়েছে। কিন্তু এত বছরের পুরনো জাহাজ দিয়ে কেন তেল পরিবহন করছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)? মেরিন, জ্বালানি সেক্টরসহ অনেকের কাছে এই প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রশ্নের উত্তর জানতে গতকাল দুপুরে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেকের কার্যালয়ে কথা হয় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে পাইপ লাইনে তেল খালাস (এসপিএম সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) কার্যক্রমটি শুরুর আগ থেকেই বলা হচ্ছিল তাদের জ্বালানি তেল বহির্নোঙর থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে লাইটার করে নিয়ে আসার জন্য। আর এ কাজে বিপিসিকে সাপোর্ট দিয়ে আসছিল বিএসসির দুই জাহাজ (বাংলার জ্যোতি ও বাংলার সৌরভ)। তবে এই জাহাজকে না চালানোর জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও নৌবাণিজ্য অধিদপ্তর থেকে দফায় দফায় বলাও হচ্ছে।’
তাহলে এই জাহাজ চালাচ্ছেন কেন? এর উত্তরে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘বিপিসি যদি অল্প সময়ের মধ্যে এসপিএম চালু করে, তাহলে এই দুই জাহাজকে মেইনটেন্যান্স করে আমরা চালাতে পারি। এসপিএম চালু হয়ে গেলে আর এই জাহাজের কোনো কাজ লাগবে না। তাই এখন কিনলে পরে তো এগুলো অকেজো হয়ে যাবে।’
তবে এই অল্প সময় আর শেষ হয় না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও ১৯৯০-৯১ সালে বাংলার জ্যোতি জাহাজের ক্যাপ্টেনের দায়িত্বে থাকা আনাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এই তো এসপিএম শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর কিছুদিন। এই আর কিছুদিন করতে করতে পুরনো এ দুই জাহাজ দিয়ে তেল খালাস করছে বিএসসি। এভাবে তো ঝুঁকি নিয়ে তেল পরিবহন করা যায় না। আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থার (আইএমও) আইন অনুযায়ী ২০১৫ সাল থেকে এ দুই জাহাজে “ডাবল হাল ট্যাংকার” নেই বলে সমুদ্রে চলাচলের অনুপযোগী। শুধু নিজ দেশের সরকারের অধীনে সেই দেশের সমুদ্রসীমার ১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে চলাচল করতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত সোমবারের দুর্ঘটনাটি যদি অয়েল ট্যাংকারে হতো, তাহলে পুরো এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যেত। নদীতে ভাসতে থাকা একটার পর একটা জাহাজ শুধু বিস্ফোরিত হতে থাকত। ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার অয়েল ট্যাংকগুলো বিস্ফোরিত হয়ে মারাত্মক ক্ষতি হতো।’
তাহলে এসব জাহাজ চলাচল করার অনুমোদন কি রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বাংলাদেশ নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, ‘যেহেতু সরকারের বিশেষ প্রয়োজনে তেল পরিবহনের জন্য এ দুই জাহাজ প্রয়োজন। তাই তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ব্যবস্থায় চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে নিরাপত্তার সূচকগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। আর সেই দুর্বলতা থেকেই ঘটছে দুর্ঘটনা।’
বাংলার জ্যোতি ও বাংলার সৌরভ দুই জাহাজ সিঙ্গেল হাল ট্যাংকের। যে প্রকল্পের (এসপিএম) কারণে ৩৭ বছরের পুরনো এ দুই জাহাজ এখনো বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে তেল নিয়ে এসে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে রাখছে, সেই এসপিএম কবে নাগাদ চালু হবে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক (অপারেশন) অনুপম বড়ুয়া বলেন, ‘গত বছর এসপিএম কমিশনিং হওয়ার পর একবার পাইপ লাইনে গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে মহেশখালী হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল আনা হয়েছিল। কিন্তু নিয়মিতভাবে মাদার ভেসেল থেকে এসপিএমে (কুতুবদিয়ায় সাগরে একটি পয়েন্ট পাইপ রয়েছে। সেখান থেকে তলদেশ দিয়ে পাইপ মহেশখালীতে এসেছে) তেল খালাসে দক্ষ ব্যবস্থাপনা দরকার। আমরা এজন্য ঠিকাদার নিয়োগ করব। সেই ঠিকাদারের কাছ থেকে আমাদের লোকজন ধীরে ধীরে খালাস প্রক্রিয়াটি শিখবে।’
কবে নাগাদ ঠিকাদার নিয়োগ হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আরও ছয় মাস লাগতে পারে।’
এই ছয় মাস কি বিএসসির ঝুঁকিপূর্ণ দুই জাহাজ দিয়ে তেল পরিবহন করবেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএসসি না পারলে আমরা বাইরে থেকে জাহাজ চার্টার্ড করব। তেল তো পরিবহন করতে হবে।’
এসপিএম প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৫ সালে। ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও তিন দফায় মেয়াদ বাড়ায় ব্যয় বেড়ে ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকায় ঠেকেছে। গত বছরের ৩ জুলাই ‘এমটি হোরে’ নামক জাহাজ থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে মহেশখালীর কালারমারছড়ায় স্থাপিত ট্যাংকে তেল পরিবহনের পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হলেও গত মার্চে পাইপ লাইনে তেল পরিবহন শুরু হয় নিয়মিতভাবে। পাঁচ দিন খালাসের পর তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর তা চালু করা যায়নি। মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নে উপকূল থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্থাপন করা হয়েছিল। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যসের দুটি আলাদা পাইপ লাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আসবে। কালারমারছড়া থেকে তা উপকূল ঘেঁষে পাইপ লাইন দিয়ে চলে আসবে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। দুটি পাইপ লাইনের একটি দিয়ে ক্রুড অয়েল এবং অন্যটি দিয়ে ডিজেল পরিবহন হওয়ার কথা।
