ছাত্র-জনতা আন্দোলনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিব) কোনো সদস্যের গুলিতে কেউ নিহত হয়েছেন এমন প্রমাণ হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। তিনি বলেছেন, ‘গত ৫ আগস্টের পর অনেকেই বলছেন বিজিবির গুলিতে তার সন্তান বা ভাই মারা গেছে। কিন্তু আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ওই এলাকায় বিজিবি মোতায়েনই করা হয়নি।’
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিজিবি সদর দপ্তরের কনফারেন্স হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ‘আমরা ওইসব পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানিয়েছেন, তারা শুনেছেন যে বিজিবির গুলিতে মারা গেছে। কিন্তু আসলে সেটা হয়নি। আমরা তাদের নিশ্চিত করেছি যে, বিজিবির গুলিতে তাদের কোনো স্বজন মারা যায়নি এবং তাদের আমরা অনুদানও দিয়েছি। আমি জানি না, এসব ঘটনার সঙ্গে কেউ বিজিবিকে জড়াতে চাচ্ছে কি না। এখন পর্যন্ত যেসব কমিশন গঠন হয়েছে, তাদের আমরা জানিয়েছি যে যদি প্রমাণ হয় বিজিবির হাতে কেউ মারা গেছেন, তাহলে তার সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘এরপরও দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। একজন অফিসার এইম করে গুলি ছুড়ছে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। তাকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। পুরো বিজিবির জনবল প্রায় ৫৭ হাজার। ছাত্র আন্দোলনে আমাদের এই বিজিবি সদস্যের মাত্র ৬ শতাংশ গ্রাউন্ডে কাজ করেছে। কেন এত কম বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, সেটার জন্য আমাকে বারবার তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কাছে জবাবদিহি করতে হয়েছে। পুলিশ যে দায়িত্ব পালন করেছিল, সেই দায়িত্ব বিজিবির সদস্যরা পালন করছিলেন কি না, সেটা নিয়েও আমাকে দোষারোপ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর চেয়ে বিজিবির কাছে ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী মারণাস্ত্র রয়েছে। বিজিবিকে এমনভাবেই তৈরি করা হয়েছে। কারণ সীমান্তে কখনো যদি যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাহলে প্রতিরক্ষা বাহিনীর আওতাধীন থেকে সবার আগে বিজিবিকেই প্রতিরোধ করতে হবে। বিজিবির কাছে লাইট মেশিনগান রয়েছে, মর্টার, গ্রেনেডসহ আরও অনেক ধরনের অস্ত্র রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোনোটাই ইচ্ছাকৃতভাবে আন্দোলনের সময় মোতায়েন করা হয়নি। বিজিবির কোনো পিকআপে কোনো এলএমজি ছিল না। বিজিবির গুলিতে যেন একটি প্রাণও না যায়, সেই চিন্তা ছিল। বরং নিউমার্কেট এলাকায় যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে আমরা আন্দোলনকারীদের পানি দিয়েছি, নাশতা দিয়েছি। জুলাই মাসের শেষ দিকে যখন গণগ্রেপ্তার শুরু হলো, তখন বিজিবিকেও বলা হয়েছিল গণগ্রেপ্তার করতে। কিন্তু বিজিবি কাউকেই গ্রেপ্তার করেনি। র্যাবের মতো হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে বলেছিল, কিন্তু বিজিবি সেটি করেনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আন্দোলনে দায়িত্ব পালনকালে আমাদের একজন বিজিবি সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আমাদের দুজন সদস্য ডেপুটেশনে র্যাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তারাও নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আমাদের ১০৩ জন সদস্য আহত হয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশ কিছু সদস্য আহত হয়েছেন পুলিশের এলোপাতাড়ি ছররা গুলিতে। চার-পাঁচজন ছাড়া গুরুতর আহত কেউ হননি। আমাদের কোনো বিজিবি সদস্য পালিয়ে নেই, কোনো অস্ত্র মিসিং নেই। শুধু আমাদের কয়েকটি গাড়ি পুড়ে গেছে।’
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, ‘সরকারি আদেশ পালনের পরিস্থিতি সামনে রেখে অনেক কিছু আমরা ভেতরে ভেতরে করেছি। একটা বাহিনীর প্রধান হয়ে সরাসরি ঊর্ধ্বতনের আদেশ অমান্য করা বা ডিনাই করা দুষ্কর। পরিস্থিতি আপনারা জানেন। আমি যদি তখন সরকারের অর্ডার ডিনাই বা অমান্য করি, তাহলে কি আমি আমার কর্মস্থলে ফেরত আসতে পারব? তার গ্যারান্টি কি আপনি বা আমি কেউ দিতে পারতাম? তবে অনেক ক্ষেত্রে আমরা ডিনাই করেছি। আবারও বলছি, পরিস্থিতি পরিবর্তিত না হলে আমি এখানে (বিজিবি) থাকতে পারতাম কি না, তার নিশ্চয়তা দিতে পারলাম না।’
জুলাই থেকে সারা দেশে কী পরিমাণ বিজিবি মোতায়েন ছিল? এখন কত পরিমাণ মোতায়েন আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ‘৫ আগস্ট পর্যন্ত গড়ে দুই হাজার মোতায়েন ছিল। সব সময় আমরা চিন্তা করেছি, যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে বিজিবি মোতায়েন করিনি। আন্দোলনের সময় শহীদ মিনারে সবচেয়ে বেশি জমায়েত হয়েছিল। নির্দেশনা সত্ত্বেও আমরা সেখানে যাইনি। কারণ এত ভিড়ের মধ্যে কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলে নিজের কাছেও জবাবদিহি করতে হতো। আমার মেয়ে ও জামাই, ভাগ্নে আন্দোলনে গিয়েছিলেন। আমি বাধা দিইনি। কারণ আন্দোলন তো হচ্ছিল অধিকারের জন্য। শাহবাগে যখন বেশি জমায়েত হচ্ছিল, তখনো বিজিবি মাঠে ছিল। আমি নিজে নির্দেশ দিয়েছি জাদুঘরের ভেতরে ঢোকার জন্য। আমি বলেছি, বাইরে নয়, জাদুঘরের নিরাপত্তা দাও।’
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কীভাবে দেশ ছাড়লেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি আমার কাছেও একটি প্রশ্ন। তবে এর দায় শুধু বিজিবির নয়, এ ঘটনার অবশ্যই তদন্ত হবে এবং তদন্ত হচ্ছে। কোন বিওপির আওতাভুক্ত সীমান্ত এলাকা দিয়ে তারা পালিয়েছেন, তা তদন্ত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তালিকাভুক্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনবিরোধী ২২ অ্যাকটিভিস্টকে গ্রেপ্তার করেছে বিজিবি।’
