চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে গেড়ে বসা ‘অসাধু’ কিছু কর্মচারীর দুর্নীতি ও দাপটের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন বেশ কিছু কর্মচারী। এদের বদলি পদোন্নতি হলেও নানা অজুহাতে বছরের পর বছর থেকে যাচ্ছেন নিজেদের পছন্দের দপ্তরে। কোনো কোনো কর্মচারী ১৫-১৬ বছর ধরে একই শাখায় একই পদে বহাল আছেন। পদোন্নতি কিংবা বদলিতেও নড়েন না তারা।
এর ফলে জেলা প্রশাসনের বেশ কিছু কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যে এবং হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে সম্প্রতি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বুধবার বিকেলে একাধিকবার মোবাইলে কল করলেও রিসিভ করেননি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। তবে বৈষম্যের শিকার কর্মচারীদের দেওয়া অভিযোগটি জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে বলে সেখানকার একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী কর্মচারীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে অভিযুক্তরা একই পদ আঁকড়ে ধরে সেবার বদলে তদবির বাণিজ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জেলা প্রশাসন সেবা কেন্দ্রের বদৌলতে ঘুষ-বাণিজ্যের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করে বিদেশে অর্থ-পাচার, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং প্রতিবেশী দেশে একাধিক বাড়ি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তিন বছরের অধিক হলে বদলির আদেশ থাকলেও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে একেকজন ১৬-১৭ বছর ধরে একই শাখায় একই পদে বহাল আছেন। এদের মধ্যে আরএম শাখার এক কর্মচারী বিধি লঙ্ঘন করে আইন পেশাও চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বপন দাশ নামের ওই কর্মচারী সেবাগ্রহীতাদের আইনি সহায়তা দেওয়ার নামে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলার রায় গোপন করে সরকারের পক্ষে আপিল দায়ের না করে নানা অজুহাতে কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলেছেন। উক্ত শাখায় বিদেশে বসবাসরত ব্যক্তিদের দেওয়া ক্ষমতাপত্রের কাগজ নিয়ে করছেন রমরমা বাণিজ্য।
ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় চলছে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ নিয়ে কমিশন বাণিজ্য। সরকারি জায়গা লীজ, নিলাম ও খাজনা আদায় নিয়েও চলছে কমিশন বাণিজ্য। বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে একদিকে সেবাপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আর্থিকভাবে অন্যদিকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব আয় থেকে। ডিসি যায়, এডিসি যায় কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বহাল তবিয়তে থাকেন সুবিধাবাদী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এলএ শাখায় এমন কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন উপরি আয়ের জন্য বদলি করা হলে বদলি হননা। তাদের পদোন্নতি দিলেও গ্রহণ করেন না তারা। তাদের একজন ওই শাখার প্রধান সহকারী আলী আজম। এছাড়া একই শাখা আছেন অফিস সহকারী মো. আলী ও মোজাফফর হোসেন।
এলএ শাখায় দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে আলী আজম বলেন, ‘কারা, কি অভিযোগ দিয়েছেন আমি জানি না। আমার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষের তদন্তে বেরিয়ে আসবে।’
বছর খানেক আগে নেজারত শাখায় দ্বিতীয় শ্রেণির পদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পেলেও দীর্ঘদিন ধরে রেকর্ড রুম শাখা প্রধানের পদ আঁকড়ে ধরে আছেন মহিউদ্দিন আহমেদ। অভিযোগ, তিনি বেতন নেন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু তিনি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন রেকর্ড রুম শাখায়। জমি-জমার খতিয়ানের নকল সরবরাহসহ নানা কাজে তার দপ্তরে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়।
দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে বেতন পেয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে রেকর্ড রুম শাখায় কাজ করার কথা স্বীকার করে মহিউদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নেজারত শাখায় আমার পোস্টিং হলেও কর্তৃপক্ষের ইচ্ছায় আমি রেকর্ড শাখায় কাজ করছি। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সঠিক নয়।’
এদিকে আরএম শাখায় ১৭ বছর ধরে একই পদে কর্মরত আছেন স্বপন দাশ। সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করে নিজেকে আইন পেশায় নিয়োজিত রেখে সেবাগ্রহীতাদের আইনি ফাঁদে ফেলছেন বলে অভিযোগ এই কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, প্রবাসীদের দেওয়া ক্ষমতাপত্র নিয়ে রমরমা বাণিজ্যে লিপ্ত তিনি। নানা অসঙ্গতির অজুহাত তুলে প্রবাসীর স্বজনদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
এই কাজে তার সহযোগী হিসেবে আছেন জাবেদ নামের এক দালাল। সরকারি কর্মচারী না হয়েও এই জাবেদকে চেয়ার-টেবিল ও কম্পিউটার নিয়ে আরএম শাখায় বসার সুযোগ করে দিয়েছেন স্বপন দাশ। দুর্নীতির টাকায় ভারতে বাড়িও করেছেন স্বপন দাশ। অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে মঙ্গলবার ৪টা ৩৮ মিনিটে কল করলে মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি স্বপন দাশ।
বদলি হলেও এসএ শাখা থেকে সরেন না নাজিম উদ্দিন চৌধুরী। অভিযোগ, তহসিলদার ও সহকারী তহসিলদার বদলি বাণিজ্য করেন তিনি। একইভাবে একাধিকবার বদলির আদেশ পাওয়া সত্ত্বেও সংস্থাপন শাখায় একই পদে বহাল আছেন কানু বিকাশ নন্দী। তদবির বাণিজ্যে লিপ্ত জে এম শাখার প্রদীপ চৌধুরী এবং ব্যবসা-বাণিজ্য শাখার কমল কুমার আচার্য ও মাহিনুর বেগম।
অভিযোগ প্রসঙ্গে কানু বিকাশ নন্দী মঙ্গলবার বিকালে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেওয়া অভিযোগ তদন্ত করছেন জেলা প্রশাসক। কারা আমাদের দ্বারা বৈষম্যের শিকার, কেন তারা অভিযোগ দিয়েছেন তা আমাদের জানা নেই।’
অফিস সহকারী হয়েও সিনিয়রদের বাদ দিয়ে জেলা নাজিরের পদ বাগিয়ে নেন জামাল উদ্দিন। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হলেও সাবেক দুই জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছের মানুষ ছিলেন এই জামাল উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ডিসিদের প্রভাব খাটিয়ে তদবির, নিয়োগ, বদলি-বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মে জড়িত তিনি।
নগরের কোতোয়ালি থানার কোর্ট রোডে ‘কেসি দে গ্র্যান্ড ক্যাসেল’ নামে একটি বিলাসবহুল ভবনের চতুর্থতলায় ফোর-সি ও ফোর-ডি নামে দেড় কোটি টাকা দামের দুটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবার নিয়ে থাকেন জামাল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ৮৭ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকায় তিনি ওই অ্যাপার্টমেন্ট দুটি (২ হাজার ৬৫ বর্গফুট) আবাসন প্রতিষ্ঠান ডি-ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের কাছ থেকে শ্বশুরের নামে ওই দুটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেন জামাল।
এছাড়া নগরের কেসি দে রোডে সোসাইটি টাওয়ারে রয়েছে আবাসিক হোটেলের ব্যবসা। খুলশী এলাকায় বিটিভি ভবনের ভেতরে ‘লা মেনসা’ নামের একটি বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে স্ত্রীর নামে ব্যবসায় বিনিয়োগেরও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অস্বীকার করে জামাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপ্রচার ও ষড়যন্ত্র করছে। আমি দুর্নীতিতে জড়িত নই।’
তবে ২০২৩ সালে জামাল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১-এর উপপরিচালক মো. নাজমুচ্ছায়াদাত।
