গাজীপুরে ঝুট (পরিত্যক্ত মালামাল) ব্যবসা নিয়ে বেপরোয়া ও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। অভিযুক্ত এসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিএনপি বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিলেও থামছে ঝুট ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব। কেউ ব্যবসা দখল নিয়ে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছে কারখানা ফটকে। আবার এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের ওপর হামলা করছে। গত মঙ্গলবার গাজীপুরের কোনাবাড়ি জরুন এলাকায় ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিতে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী জরুন এলাকায় এসট্রো নিট ওয়্যার লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝুট ব্যবসা করে আসছিল। ৫ আগস্টের পর কোনাবাড়ী এলাকার এসট্রো নিট ওয়্যার লিমিটেড কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করে আসছিল গাজীপুর মহানগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি মো. সালাউদ্দিন ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি বিপ্লব খান। তাদের নেতেৃত্বে লোকজন মঙ্গলবার সকালে ওই কারখানা থেকে ঝুট বের করতে যায়। এ সময়ে একই ওয়ার্ডের সাবেক বিএনপির নেতা জহিরুল ইসলাম ও বাবুল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির কর্মী আলম খন্দকার, বাদল খন্দকার, শামীম খন্দকারসহ ১০-১৫ জন তাদের ঝুট মাল বের করতে বাধা সৃষ্টি করে। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে বাগবিত-ার ও ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অন্য পক্ষের ওপর হামলা চালায়। সংঘর্ষে আলম খন্দকার, বাদল খন্দকার, শামীম খন্দকার, জহিরুল খন্দকার ও বাবুল হোসেন মারাত্মক জখম হয়। হামলার পরে তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় মহড়া দেয়। দুপক্ষের ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনার সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের ব্যবসায়ীরা দোকানপাঠা বন্ধ করে দেয়। সংঘর্ষের পর স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। গত ২৫ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে মাওনা চৌরাস্তাসংলগ্ন বেড়াইদেরচালা এলাকায় অবস্থিত এসকিউ সেলসিয়াস লিমিটেড কারখানার ঝুট (পরিত্যক্ত কাপড়) বের করাকে কেন্দ্র করে যুবদল, কৃষকদল, শ্রমিকদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ৫০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় যুবদল, কৃষকদল, শ্রমিক দল ও ছাত্রদলের চার নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের। প্রায় ৪০ বছর ধরে সফিপুর বাজারে সরকারি দোকান (চান্দিনা ভিটি) লিজ নিয়ে ব্যবসা করে আসছেন। গত ৫ আগস্টের পর তার দীর্ঘদিনের সেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি দখল করে নেয় পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সাইজুদ্দিন আহাম্মেদ।
বিএনপির নেতা সাইজুদ্দিনের বিরুদ্ধে একই বাজারের আরও চার ব্যবসায়ীর দোকান দখল করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তার অনুসারীরা বা কর্মীরা পূর্ব চান্দারা, বোর্ডমিল ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় বনের জমি দখল করছেন। এসব এলাকার বাজারগুলো থেকে ওঠাচ্ছে চাঁদা। কালিয়াকৈর উপজেলার আড়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের জানান, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও আমি দীর্ঘদিন ধরেই সফিপুর বাজারে দোকান দিয়ে সার ও পোল্ট্রি খাদ্য বিক্রি করে আসছিলাম। উপজেলা প্রশাসনের কাজ থেকে চান্দিনা ভিটি হিসাবে একশ বছরের লীজ নেওয়া ছিল। গত এক-দেড় বছর আগে নিজে ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে দোকানটি ভাড়া দেই। সরকার পতনের পর সন্ত্রাসী ও বিএনপি নেতা সাইজুদ্দিন তার লোকজন নিয়ে এসে দোকানটি দখল করে নেয়। গত ১৯ আগস্ট গাজীপুরের সালনা এলাকায় ইউটা গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া, হামলা, ভাঙচুর ও মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। গত ৩০ আগস্ট রাতে জেলা শহরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষে মো. ফাহিম নামে এক কলেজছাত্র নিহত এবং আরও পাঁচজন আহত হয়। ৯ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার পিরুজালী এলাকায় একটি কারখানা ট্রাক থামিয়ে বিএনপি স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতারা দেড় লাখ টাকা চাঁদা নেয়। এ ঘটনায়ও বিএনপির চার নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।
অন্য এক নেতা বলেন, সত্যিকার অর্থে গাজীপুর মহানগর ও জেলা পর্যায়ে দলের সুবিধাভোগী কয়েকজন শীর্ষ নেতার আস্কারায় ঝুট ব্যবসা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এদের ব্যাপারে দলীয় কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। দলীয় কারণে প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেন না অনেক ত্যাগী নেতা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুল হান্নান বলেন, বিএনপির নামে কেউ কোনো ধরনের দখল বাণিজ্য করে থাকলে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দল তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার বলেন, দলের কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে। কেউ কোনো ধরনের দখল বা অপরাধে জড়ালে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।
