দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আবদ্ধ হয়ে আছে। ক্ষমতায় যাওয়া ও টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশকে ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয়করণ ছিল সবচেয়ে বেশি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে শিক্ষার্থীসহ নিরীহ লোকজন মারা গেছে। আন্দোলনের সময় পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ফলে পুলিশের সংস্কার করতে কমিশন গঠন করেছে। কমিশন কাজও শুরু করে দিয়েছে। পুলিশ সংস্কারের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কমিশনের কাছে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে। ওই প্রস্তাবনায় ব্রিটিশ আমলে আইনের সংশোধন করাসহ ৩৯টির বিষয়ে প্রস্তাবনা দিয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। তাছাড়া কমিশন সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও মতামত নিচ্ছে।
এ বিষয়ে পুলিশের সংস্কার কমিশনের প্রধান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব সফর রাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশনের কাজ শুরু হয়েছে। জনবান্ধব পুলিশ গঠন করতে যা যা করা দরকার সেই সুপারিশ করা হবে। আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করব। সবার মতামত নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা তৈরি করে তিন মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তর একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে। পুলিশও চাচ্ছে জনবান্ধব পুলিশ গঠন করতে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নেতিবাচক হওয়ায় পুলিশের অন্য সদস্যরাও বিব্রত।’ তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে নিজেরা ইনফরমাল আলোচনা করেছি। আমি কীভাবে কী করব সেটা নিয়ে পরিকল্পনা করেছি। পুলিশের বিষয়ে প্রচুর পরিমাণে আইনের বই এবং নীতিমালা আমরা সংগ্রহ করেছি। আমাদের সঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞও রয়েছেন। এখন আমরা সবাই বসে একটা কর্মপরিকল্পনা করব। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুলিশ তাদের কার্যপরিকল্পনা করে, আমরাও তেমন একটি সুপারিশ করব। যেসব ধারা পরিবর্তন বা সংশোধন লাগবে সেসব বিষয় নিয়ে সুপারিশ
থাকবে। আমরা একটি ওয়েবসাইট করারও চিন্তা করেছি। সময় আমাদের অল্প। তারপরও আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে পারব।’ সফর রাজ বলেন, ‘ব্রিটিশ আমলের আইনের কিছু ধ্যান-ধারণা বাদ দিয়ে কীভাবে জনবান্ধব পুলিশ হতে পারে, সেদিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। জুলাই-আগস্টে পুলিশের যে ভূমিকা দেখা গেছে, ভবিষ্যতে যাতে সেরকম আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করা লক্ষ্যে কাজ চলছে। চেষ্টা করছি, সংস্কারের মাধ্যমে যাতে জনকল্যাণমুখী হয় পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনসহ পুলিশ সংস্কারের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (এইচআর) কাজী জিয়া উদ্দিন স্বাক্ষরিত একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর প্রস্তাবনাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রস্তাবনায় মোট ৩৯টি বিষয়ে মতামত দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের গঠনের পরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রশাসন-১ শাখা থেকে জরুরি ভিত্তিতে নির্ধারিত ছকে আইজিপিকে তথ্য পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশ সংস্কার পরিকল্পনা একটি চলমান কার্যক্রম এবং এ-সংক্রান্তে ভবিষ্যতে অধিকতর আলোচনা পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। পুলিশ সংস্কারের লক্ষ্যে জনপ্রত্যাশা ও পুলিশ সংস্কার, ‘পরিবর্তনের পথনকশা’ শীর্ষক পরিকল্পনায় আইনি কাঠামোসংক্রান্ত বিষয়ে প্রস্তাবনার কথা বলা হয়েছে। সংস্কার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা, পুলিশ অ্যাক্ট ১৮৬১ ও পুলিশে রেগুলেশন অব বেঙ্গলের (পিআরবি) প্রয়োজনীয় সংশোধন, বিশেষায়িত ইউনিটের বিধিবিধান প্রয়োজনীয়তার নিরিখে সংশোধন করা, জনপ্রত্যাশা পূরণে যুগোপযোগী ও নতুন আইনি বিধি প্রণয়ন করা। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে যে ফল পাওয়া যাবে, তা হচ্ছে পুলিশের অধিকতরও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে ও মানবাধিকার সুরক্ষিত হবে। দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দেশের জনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
তাছাড়া মানবাধিকার সুরক্ষা, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা বাড়ানো, সংস্কারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুসরণীয় নীতি (বেস্ট পলিসি) গ্রহণ করা হবে। অপরাধ তদন্তে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে হবে। ট্যুরিস্ট, নৌ, অ্যান্টি টেররিজম, রেলওয়ে, হাইওয়ে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল, সিআইডি, পিবিআইসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি কিছু আইন আছে তা সংশোধন করা উচিত। পুলিশের কর্মসময় আট ঘণ্টা নির্ধারণ করা দরকার।
সর্বোপরি ২০০৭ সালের প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের আলোকে পুলিশের সংস্কার করা উচিত বলে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, পুলিশে জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ বিষয়ে বলা হয়েছে, পুলিশ সদস্যদের সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সে অনুযায়ী পুলিশের কার্যক্রম যথাযথ তদারকির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব শান্তিরক্ষায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা, কমিউনিটি ও বিট পুলিশিং-সংক্রান্ত কার্যক্রম অধিকতর গতিশীল করা, পুলিশ সংস্কার কার্যক্রমে অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা, ট্রান্সন্যাশনাল ও অর্গানাইজড ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে (বিশেষ করে কাউন্টার টেররিজম, মাদক, মানব পাচার ও আর্থিক অপরাধ) কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সাইবার ক্রাইম ও অন্যান্য টেক-বেজড অপরাধ দমেন লজিস্টিকস সুবিধাদি বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণ জোরদার করা, তথ্য বিভ্রান্তি ও গুজব নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং এ-সংক্রান্ত দেশীয় ও বৈশ্বিক অন্যান্য বেস্ট পলিসি অনুসরণ করার ব্যবস্থা নিলে পুলিশের উপকার হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বৈষম্যহীনভাবে সততা, দক্ষতা, যোগ্যতা প্রাধান্য দিয়ে প্রশাসনিক ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে (নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি ও প্রণোদনা ইত্যাদি) স্বচ্ছ এবং আধুনিক যুগোপযোগী করা, বৈষম্য নিরসনে সরকারের অনুমোদনের মাধ্যমে পুলিশের (পুলিশ ও নন-পুলিশ কর্মচারী) অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গাইড লাইন, পলিসি, ডকুমেন্টস প্রস্তুত বা সংশোধন (নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন, প্রশিক্ষণ, জনবল বৃদ্ধি, পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ ইত্যাদি) করা। পুলিশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ইউনিটের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা (মানবসম্পদ ও লজিস্টিক) বৃদ্ধি করা। বিভাগীয় ও ক্ষেত্রবিশেষে জেলা পর্যায়ে ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা দরকার।
সর্বশেষে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে একটি সুপ্রশিক্ষিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশ দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি জনবান্ধব পুলিশ হিসেবে সমসাময়িক বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড রোধের মাধ্যমে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জনমনে স্বস্তি আনতে সক্ষম হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্র্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দায়িত্ব পালন ও নিয়মমাফিক ছুটি প্রাপ্তির বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। পুলিশে কর্মরত সদস্যদের শারীরিক মানসিক সুরক্ষার নিমিত্তে কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ে পুলিশ হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার। বদলিজনিত কারণে পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের পড়াশোনা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য কেন্দ্রীয়ভাবে বেসরকারি স্কুলে পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের ভর্তি বা পড়াশোনা অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বদলি ও পদোন্নতি সমানভাবে করতে হবে। রাজনৈতিক নেতা ও দল পুলিশকে ব্যবহার করতে পারবে না।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ১৮৬১ সালের ৫ নম্বর আইনে পুলিশ পরিচলিত হচ্ছে। তাছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮ সালের ৫ নম্বর আইন), সাক্ষ্য আইন (১৮৭২ সালের ১ নম্বর আইন), পুলিশ প্রবিধানমালা বেঙ্গলসহ (১৯৪৩) অন্যান্য আইনে কার্যসম্পাদন করে থাকে পুলিশ। সবকটি আইনই ব্রিটিশ আমলের। এসব আইন পরিবর্তন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো কমিশন গঠন করলে অর্থ লেনদেন হবে না। রাজনৈতিকভাবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশের কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। তাহলেই দেখা যাবে পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে, তা আর থাকবে না। হবে জনবান্ধব পুলিশ।
