বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় ফ্রান্স থেকে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাংলাদেশে এসেছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম। তিনি জানান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আহত চক্ষু রোগীদের সুচিকিৎসায় সেবা ফাউন্ডেশন ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উদ্যোগে নেপাল থেকে তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এসেছেন। গতকাল সোমবার এসেছেন ফ্রান্সের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে অর্থোপেডিক চিকিৎসক দেশে আসবেন বলে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন।
গতকাল বিকেলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এসব তথ্য জানান।
এ সময় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম বলেন, আন্দোলনে যারা আহত হয়েছেন, বিশেষ করে চোখে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন, দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, পায়ে আঘাত পেয়েছেন, অঙ্গহানি হয়েছে তাদের চিকিৎসার জন্য চীন, নেপাল, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মেডিকেল টিম আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে চীনের অ্যাডভান্স মেডিকেল টিম বাংলাদেশে এসেছেন। তারা হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে চিকিৎসায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় পরে আর কী ধরনের সেবা বা সহযোগিতা লাগবে, সে বিষয়েও অবহিত করবেন তারা। এ ছাড়া আহতদের চিকিৎসায় বিভিন্ন দেশ ও বহুজাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, নেপালের চিকিৎসকরা জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ১৯২ জন চক্ষু রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে এবং চারজন জটিল রোগীর অস্ত্রোপচার করেছে। রেটিনা আহত রোগীদের রেটিনা অস্ত্রোপচারের ছয় মাস পর কর্নিয়া অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কর্নিয়া সরবরাহে সেবা ফাউন্ডেশন সহায়তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
তিনি জানান, বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা রোগীদের যে চিকিৎসা দিয়েছেন, তা ছিল সঠিক। এ ধরনের রোগীদের নেপালেও একইভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চোখের ভেতরের গুলি যে পদ্ধতিতে অপারেশনের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ সঠিক।
নিহত ৭৩৭, আহত ২২ হাজার ৯০৭ : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশে গত ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ৭৩৭ জন শহীদ ও ২২ হাজার ৯০৭ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশের বিভিন্ন স্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও শহীদ পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নীতিমালা প্রণয়ন এবং শহীদ, আহত ব্যক্তিদের পরিচিতিসহ একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটি ইতিমধ্যে একটি খসড়া নীতিমালা এবং আহত-নিহতদের একটা প্রাথমিক তালিকা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছে। প্রস্তুতকৃত তালিকা সর্বসাধারণের যাচাইয়ের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে ডেটাবেজ তৈরির সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।
সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার : ডেঙ্গু বিষয়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং অন্যান্য সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, ল্যাবরেটরিতে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় ও অন্যান্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘ডেঙ্গুর দুটি দিক আছে। একটি প্রতিরোধ, আরেকটি চিকিৎসা। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে সচেতন করতে পারি, তাহলে ডেঙ্গুর প্রতিকার করা সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, দেশের সব সরকারি হাসপাতালে (জেলাপর্যায় পর্যন্ত) ডেঙ্গু বিষয়ে ‘ফোকাল পারসন’ নির্ধারণ করা হয়েছে, যাদের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে সারা দেশের ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ডেঙ্গু টেস্ট কিট, আইভি ফ্লুইড (স্যালাইন) এবং অন্যান্য লজিস্টিক স্টক ও চাহিদা সংগ্রহ করা হচ্ছে। সারা দেশে সব সরকারি হাসপাতালের স্ট্যাটিশটিসিয়ান ও ল্যাব টেকনিশিয়ানকে ডেঙ্গু অ্যাপ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস শাখা ডেঙ্গু ট্রাকার অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে ল্যাবে পরীক্ষাকৃত ডেঙ্গু রোগীর পরীক্ষার ফলাফল সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব ডা. মো. সারোয়ার বারী, স্বাস্থ্য-শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ টি এম সাইফুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
