চট্টগ্রাম নগরের জেএমসেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপের স্টেজে ইসলামি গান পরিবেশন বিতর্কের ঘটনায় দুই মাদ্রাসা শিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) রাতে তাদের আটক করা হয়। শুক্রবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সিএমপির উপকমিশনার (ক্রাইম) রইছ উদ্দিন।
সংবাদ সম্মেলনে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ‘এই ঘটনায় এখনো মামলা দায়ের হয়নি। মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইতোমধ্যে দুজনকে আটক করেছি। তারা দুজনই স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক। প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারি সজল দত্তের আমন্ত্রণে তারা সেখানে সংগীত পরিবেশন করেছেন। সজলের অনুরোধে তারা ছয়জন মঞ্চে উঠে সংগীত পরিবেশন করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সজল দত্তের খোঁজ করছি। এখনো তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তা জানতে আমরা কাজ করছি।’
এদিকে এ ঘটনায় পূজা উদযাপন কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সজল দত্তকে গতকাল রাতেই বরখাস্তের ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি লায়ন আশীষ কুমার ভট্টাচার্য। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নগরের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে পূজা কমিটির অনুমতি নিয়ে চট্টগ্রাম কালচারাল একাডেমি নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের ছয় সদস্য মঞ্চে বাদ্যযন্ত্র ছাড়া দুটি গান পরিবেশন করেন। যা পরে বিতর্কের জন্ম দেয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কালচারাল একাডেমির সভাপতি সেলিম জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘পূজা উদযাপন পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক সজল দত্তের আমন্ত্রণেই সেখানে সংগীত পরিবেশন করতে গেছেন তারা। সেখানে দুটো গান পরিবেশন করা হয়েছে, দুটোই সম্প্রীতির সংগীত। কেউ কেউ ভিডিও এডিট করে ভিন্ন গান বাজিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও যাচাই করে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার তাদের ফেসবুক পেজে জানিয়েছে, পূজামণ্ডপে গানের ভিডিওটি আসল, এডিটেড নয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ওই দুটি গানের মধ্যে একটি গান ছিল ‘গ্রামের নওজুয়ান হিন্দু-মুসলমান’ অপরটি হচ্ছে ‘শুধু মুসলমানের লাগি আসেনিকো ইসলাম’। গান দুটি পরিবেশনের এর কিছুক্ষণের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ভিডিওটি। ছড়িয়ে পড়া তিন মিনিটের একটি ভিডিওটিতে দেখা যায়, মণ্ডপের অনুষ্ঠানের মঞ্চে গান পরিবেশন করছেন ছয়জন তরুণ।
পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্র বলছে, সন্ধ্যায় মঞ্চে নাচের অনুষ্ঠান হচ্ছিল। এ সময় কয়েকজন তরুণ সেখানে উপস্থিত হয়ে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করবেন বলে মঞ্চে ওঠেন। পরে তারা দুটি গান পরিবেশন করেন। এরপর তারা ‘ধন্যবাদ’ দিয়ে নেমে চলে যান।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের অর্থ সম্পাদক সুকান্ত মহাজন বলেন, ‘ওই তরুণেরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক সজল দত্তকে বলেছেন, তারা মঞ্চে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করবেন। পরে তারা উঠে গান শুরু করেন এবং দুটি গান পরিবেশন শেষে তারা চলে যান।’
এদিকে পূজামণ্ডপে ইসলামি সংগীত পরিবেশনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হবে।’
এই ঘটনায় ছাত্রশিবিরকে জড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। একইসঙ্গে এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) রাতে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এক পোস্টের মাধ্যমে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অবস্থান তুলে ধরে এ দাবি জানান তিনি। ওই পোস্টে জাহিদুল ইসলাম লিখেন, ‘এই ঘটনার সঙ্গে অনেকেই ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখছেন। আমি দায় নিয়ে বলছি, এর সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। শিবির কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন কাজ কখনোই সমর্থন করে না। তাই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে স্পষ্ট দাবি জানাচ্ছি, একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সবার সামনে উঠে আসুক। কেউ দোষী হলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তি দেওয়া হোক।’
সত্যতা যাচাই না করেই বিভিন্ন সময় শিবিরকে জড়িয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয় জানিয়ে ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন, ‘সত্যতা যাচাই না করেই যারা শিবিরকে জড়িয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালায়, তারা একটা সময় গিয়ে নিজেদের বিবেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হবেন। এ ধরনের কাজ থেকে ভবিষ্যতে বিরত থাকার অনুরোধ করছি।’
