মধ্যপ্রাচ্যের তেলে সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৪, ০২:১০ এএম

ইসরায়েলের ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে সৃষ্ট সাম্প্রতিক উত্তেজনায় কপালের ভাঁজ বাড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর। এ হামলার জবাব ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার তালিকায় আছে দেশটির তেল ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। তাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। যার প্রভাব পড়বে বিশ্বের তেলের বাজারে। তাই ইরানের তেল স্থাপনায় সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের শঙ্কা, ইরানের তেল স্থাপনা ক্ষতির শিকার হলে তাদের নিজস্ব তেল স্থাপনাগুলোও পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

ইরান বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। ওপেকের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এর অবস্থান তৃতীয়। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চলতি বছর তেল রপ্তানি দৈনিক সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেলের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। তেল পরিশোধনকারী চীনা কোম্পানিগুলো ইরানের অধিকাংশ সরবরাহ কিনে নেয়।

উপসাগরীয় তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ইসরায়েলের যেকোনো হামলায় সহায়তা করলে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলকে ইরানে হামলায় তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিচ্ছে না সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও অবহিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও চায় না ইরানের তেল বা পারমাণবিক স্থাপনা হামলার লক্ষ্যবস্তু হোক। এতে সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টিসহ তাতে ওয়াশিংটনেরও সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে চায় জো বাইডেন প্রশাসন।

ইরানি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইসরায়েলকে সহায়তা করলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো নিরাপদ থাকবে না বলে সৌদি আরবকে সতর্ক করেছে তেহরান। গত বুধবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে বৈঠক হয়েছে। রাজপরিবার ঘনিষ্ঠ সৌদি বিশ্লেষক আলি শিহাবি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ইসরায়েলের জন্য আকাশসীমা খুলে দিলে তা হবে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। সে ক্ষেত্রে ইরানের মিত্ররা, বিশেষত ইরাক-ইয়েমেনের গোষ্ঠীগুলো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের কাছে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইসরায়েলের সম্ভাব্য আক্রমণের ব্যাপকতা নিয়ন্ত্রণের তাগিদ দিয়েছে তারা।

সৌদি আরবের অতিরিক্ত তেল সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও, ইরানের তেল স্থাপনাগুলো ধ্বংস হলে এর প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়বে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো তেলক্ষেত্রে হামলা হয়েছিল। এতে করে বিশ্ববাজারে ৫ শতাংশ তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হামলায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার কথা শোনা গেলেও, তা অস্বীকার করেছে দেশটি। তবে ওই ঘটনা থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো শঙ্কিত। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য-সম্পর্কিত সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন পানিকফ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি থাকলেও তেহরান পারমাণবিক অস্ত্রভা-ার গড়ে তুলবে না বলে বিশ্বাস ওয়াশিংটনের। দেশটির ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের মুখপাত্র বলেন, ‘২০০৩ সালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি কর্মসূচি বাতিল করার পর তা ফের চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়নি ইরান। অন্যদিকে, ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি অক্ষত আছেন। তবে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের তদন্তে তাকে জিজ্ঞাসাবাদেরর জন্য কড়া নিরাপত্তায় রেখেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। হিজবুল্লাহ ও রেভ্যুলুশনারি গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দশটি সূত্রের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল-ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে। ৪ অক্টোবর হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ এক ঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলায় নাসরাল্লাহর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হাশেম সাফিউদ্দিনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর থেকেই ইরানের জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। নাসরাল্লাহর মৃত্যুর দুদিন পর রেভ্যুলুশনারি গার্ডের কয়েকজন কমান্ডারের সঙ্গে বৈরুতে আসেন কানি। তারা সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এসেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। তবে সাফিউদ্দিনের ওপর হামলার পর থেকে তার সঙ্গে দুদিনের জন্য সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালে কাশেম সোলায়মানি নিহত হওয়ার পর কুদস ফোর্সের দায়িত্ব নেন ইসমাইল কানি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত