মাসদার হোসেন যেভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতীক

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ১০:২৪ এএম

বিচারকরা সাধারণত আড়ালেই থাকেন। ব্যতিক্রমী ঘটনার সূত্রে তারা সামনে আসেন, হোক সেটা কর্মজীবনে কিংবা অবসরে। দেশের বিচার বিভাগ নিয়ে ওয়াকিবহাল প্রতিটি মানুষের কাছে ‘মাসদার হোসেন মামলা’ ভিন্ন একটি অনুভবের বিষয়। বিচার বিভাগের ইতিহাসে এ মামলা এবং মাসদার হোসেন সমার্থক। বিচারকজীবনে বিচার বিভাগের মর্যাদা, স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার জন্য মামলাটি করেছিলেন তিনি, ২৯ বছর আগে। অবসরে গিয়েও তিনি আলোচ্য বিষয় হয়েই রয়েছেন। তাকে নিয়ে এ আলোচনা ভবিষ্যতেও থাকবে।

সম্প্রতি রাজধানীর মণিপুরীপাড়ায় মাসদার হোসেনের ব্যক্তিগত চেম্বারে তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। সে কথাই তুলে ধরা হলো পাঠকের উদ্দেশে।

১৯৮৩ সালের ২০ এপ্রিল মাসদার হোসেন মুনসেফ হিসেবে বিচার বিভাগে যোগ দেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে পদোন্নতি পেয়ে জেলা ও দায়রা জজ হন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান। মাসদার হোসেন মামলার প্রেক্ষাপট নিয়ে জানতে চাওয়া হয় তার কাছে।

তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সালে জয়পুরহাটে সিনিয়র মুনসেফ হিসেবে যোগ দিই। ওই বছরের একটি ঘটনা এখনো মনে দাগ কেটে আছে। নওগাঁ জেলা ও দায়রা জজ আসাদুজ্জামান আল ফারুক (্এখন প্রয়াত) ফাঁসির রায় দিয়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। তাকে দেখতে গেলাম আমি ও কয়েকজন বিচারক। এ ঘটনায় প্রচন্ড হতাশ হই। একজন বিচারকের কোনো নিরাপত্তা নেই, গাড়ি নেই। ভালো বেতন-ভাতা নেই। বসার জায়গা নেই। উপরন্তু আছে রাজনৈতিক চাপ, হুমকি। নানা প্রতিবন্ধকতা। সিদ্ধান্ত নিই, বিচারকজীবনে আর থাকব না, অধ্যাপনা করব। পরে বিশ^বিদ্যালয়ে আমার এক শিক্ষকের পরামর্শে আবার বিচারকের আসনে বসি।’ মাসদার হোসেন বলতে থাকেন, ‘১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড একধাপ নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়। তখন আমি সাব-জজ পদে কর্মরত এবং বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব। ১ হাজার ১০০ টাকার বেতন স্কেলে বিচার বিভাগে সার্ভিস দিচ্ছি। এর মধ্যে গ্রেড কমে গেল। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হলো। অনেকের কাছে গেলাম সমাধানের জন্য। কিন্তু কেউ বিষয়টি কানে তোলেনি। তিক্ততা তো ছিলই। এরপর প্রথম ধাপে আমিসহ ২১৮ জন বিচারক হাইকোর্টে রিট করি। এরপর আরও অনেক বিচারক রিট মামলার পক্ষভুক্ত হন। তখন বিচার বিভাগে বিচারকের সংখ্যা ৪৪১।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের রিটের আরজির দৃশ্যমান কারণ ছিল বেতন গ্রেড নামিয়ে দেওয়ার বিষয়টি। আসল আরজি ছিল বিচারকদের প্রশাসনের আওতাভুক্ত বিসিএস ক্যাডার হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি অবৈধ ঘোষণা করা। সংবিধানের ১০২ ধারার আওতায় এটা বাতিল চেয়েছিলাম। এটা বাতিল হলেই আমাদের পরিচয়, চরিত্র, স্বাধীনতা, পৃথক হওয়া সব হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট বেতন গ্রেড নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করে বিচারকদের বিসিএস ক্যাডারভুক্ত করার বৈধতার প্রশ্নে রুল দেয়। পরে ১৯৯৭ সালের ৭ মে হাইকোর্টের রায়ে রুল মঞ্জুর হয় এবং জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস করার আদেশ হয়। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করে। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ আদালত জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস ঘোষণা করার আদেশ দেয়। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করার নির্দেশও দেয় আপিল বিভাগ। আর বিচার বিভাগের মর্যাদা ও স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা রক্ষায় ১২ দফা নির্দেশনা দেয় সর্বোচ্চ আদালত।

ওই মামলার পর প্রায় তিন দশক পর এখনকার পরিস্থিতি কেমন দেখছেন এমন প্রশ্নে মাসদার হোসেন বলেন, ‘বিচার বিভাগের এখনকার যে পরিস্থিতি তা আমাকে মারাত্মকভাবে পীড়া দেয়। শুধু আমি নই, বিচার বিভাগীয় সদস্য, সচেতন মানুষ এবং যারা জনকল্যাণে রাজনীতি করেন তাদের সবাইকে পীড়া দেয়। জনকল্যাণের জন্যই রাষ্ট্র। বিচার বিভাগের পৃথক হওয়া জনকল্যাণের জন্যই প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘কাগজে-কলমে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হলেও স্বাধীন ও স্বকীয় বিচারব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। আপিল বিভাগের বেশ কিছু নির্দেশনা এখনো কার্যকর করা হয়নি। ৮ নম্বর নির্দেশনাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগকে জাতীয় সংসদ এবং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা কী, তা সবার জানা। আমার উপলব্ধি হলো, বিচারকরা স্বাধীনভাবে বিচার করতে না পারার কারণে জনগণের এ দুর্দশা।’

স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও এ ক্ষেত্রে হতাশা দূর হয়নি কেন এ প্রশ্নে সাবেক বিচারক বলেন, ‘যে দেশে আইনের শাসন নেই সে দেশে গণতন্ত্র নেই। পৃথিবীর যারা স্বৈরশাসক, একনায়ক তারা জনকল্যাণে আগ্রহী নয়। গোটা বিশ্বে কয়েকটা দেশ বাদে মধ্যপ্রাচ্যসহ অধিকাংশ দেশে স্বৈরশাসক কিংবা স্বৈরশাসকের ছায়া আছে। তারা জনকল্যাণে রাষ্ট্রকাঠামোকে ব্যবহার করে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য।’

তিনি বলেন, ‘এ দেশে কোনো রাজনৈতিক নেতা চায়নি বিচার বিভাগ তার স্বকীয়তা, সাহস, সততা, নিরপেক্ষতা এবং পৃথক পরিচয় নিয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও বিচারকাজ করুক। তাদের বিপদ, নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ দিক। নেতাদের দলীয়, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ এটি হতে দেয়নি। তারা সবসময় বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে, স্বকীয়তাকে অবজ্ঞা করেছে, পাশ কাটিয়ে গেছে। কেন এ ধরনের আচরণ তাও পরিষ্কার। স্বাধীনতার পর ৫৩ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক শাসক বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেছে তাদের স্বার্থে। কেউ কম, কেউ বেশি। বিচারক হিসেবে আমিও তার সাক্ষী।’

আলাপকালে সাবেক এ বিচারক সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টানেন। বলেন, এ অনুচ্ছেদে যেখানে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ আছে, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে সেখানে প্রধান বিচারপতি উল্লেখ ছিল। ১৯৭৪ সালে চতুর্থ সংশোধনীতে সেখানে রাষ্ট্রপতি প্রতিস্থাপিত হলো। এখন রাষ্ট্রপতির কী ক্ষমতা ও কার্যাবলি এ দেশের মানুষ তা জানে। রাষ্ট্রপতি প্রশাসক বা বিচারক কাউকে সরাসরি নিয়োগ দেন না। কিন্তু তার নাম ব্যবহার করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে যেসব প্রজ্ঞাপন হয়, সেখানে বলা হয়, ‘সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে।’ কিন্তু পরামর্শ নেওয়া হয় কি না, সেটি কখনো প্রকাশিত হয় না। নির্বাহী বিভাগ অর্থাৎ আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় যেভাবে চায় রাষ্ট্রপতি সেভাবেই অনুমোদন দেন। এখানে সুপ্রিম কোর্ট তথা প্রধান বিচারপতির ভূমিকা নেই।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথককরণ বিষয়ে একটা ফাঁকি আছে বলে মনে করেন মাসদার হোসেন। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বলা আছে, রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পৃথককরণ নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। মাসদার হোসেন মামলার রায়ে কাগজে-কলমে বিচার বিভাগ পৃথক হয়েছে; রাষ্ট্র এখন আর কি নিশ্চিত করবে? সংবিধানের এ অনুচ্ছেদটি ৫৩ বছর ধরে আমরা বহন করছি। আসল কথা হলো, ১১৬ অনুচ্ছেদে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি কথাটি প্রতিস্থাপিত না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বিচার বিভাগ পৃথক ও স্বাধীন হয়েছে বলা যাবে না। ২২ অনুচ্ছেদও সেভাবেই থেকে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক যে, বিচার বিভাগকে আলাদা করতে হলে এর আলাদা সচিবালয় লাগবে। বিচারকদের জন্য কী বিধিমালা হবে তা নির্ধারণ করবেন প্রধান বিচারপতি। তখন আর্থিক বাজেটসহ নানা বিষয় সুপ্রিম কোর্ট নির্ধারণ করতে পারবে। আলাদা সচিবালয় করতে হলে অবশ্যই সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন আছে। পৃথক সচিবালয় হলে তা হবে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। জাতি এর সুফল পাবে।’

বিচারকরা নিভৃতে যন্ত্রণা ভোগ করেন জানিয়ে মাসদার হোসেন বলেন, ‘সব ক্যাডারে আর্থিক ভাতা বাড়ানো হচ্ছে বছরের পর বছর। বিচারকদের বেতন সুবিধা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই আছে। এখনো নিম্নপদস্থ বিচারকদের আবাসন, নিরাপত্তা, গাড়ি সুবিধা নেই। অফিস স্টাফ নেই। আর্থিক দৈন্যে থেকে বিচারকরা কীভাবে চাপমুক্ত হয়ে বিচারকাজ করবেন? ইংল্যান্ড, ভারত ও পাকিস্তানে একজন বিচারককে যে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়, তা আমাদের দেশের বিচারকদের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। বৈষম্য ও অর্থনৈতিক নিষ্পেষণে থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে না।’

সাবেক এ বিচারক বলেন, ‘আশার কথা হচ্ছে বর্তমান প্রধান বিচারপতি, আইন উপদেষ্টা ও অ্যাটর্নি জেনারেল এসব বিষয়ে আশাব্যঞ্জক কথা বলছেন। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ তার জীবনের আনন্দময় ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি আমার প্রতি যে সম্মান দেখিয়েছেন সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। আমি আশাবাদী, বিচার বিভাগের স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নেবেন।’

মাসদার হোসেন বলেন, ‘মাসদার হোসেন মামলার রায়ের বাস্তবায়ন হলে আমাকে এত কথা বলতে হতো না। আমার মনে হয়, রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই আমাকে কথা বলতে হয়। সত্যিকার অর্থে একটি পৃথক ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত আমার এ লড়াই চালিয়ে যাব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত