বাজার নিয়ন্ত্রণে অভিযান, ভোক্তা-দোকানিদের চোর-পুলিশ খেলা

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ০২:৪১ পিএম

হঠাৎই ডিম নেই পাবনার বাজারগুলোতে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রিতে বাধ্য করতে ভোক্তা অধিদপ্তর জরিমানা করায় ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বিপাকে পড়েছেন ভোক্তারা। অতিরিক্ত মূল্যেও মিলছে না ডিম।

রোববার (১৩ অক্টোবর) সকালে পাবনার বাজারগুলোতে ঘুরে কোথাও ডিমের দেখা মেলেনি। এদিকে অস্থির সবজির বাজারও। ৫০ টাকার নিচে নেই কোনো সবজি। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচের দর প্রায় ৪শ’ টাকার ঘর।

সরে জমিনে দেখা যায়, পাবনার বড় বাজার ও লাইব্রেরি বাজার সহ অধিকাংশ বাজারেই ডিমের দোকান বন্ধ। প্রতিদিন ভোর থেকে ডিম সাজিয়ে যে ব্যবসায়ীরা বসে থাকতেন, দেখা মেলেনি তাদের। কয়েকজন আশেপাশে থাকলেও দোকান বন্ধ রেখে এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করছেন। এদিকে ক্রেতারা ডিম ক্রয় করতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। বাজারের সব জায়গায় ঘুরেও মিলছে না ডিম।

সকালের দিকে এ চিত্র দেখা গেলেও সকাল সাড়ে ১১টার পর হাতেগোনা দুএকজন দোকানি লুকিয়ে দোকান খুলে কয়েকজনের কাছে বিক্রি করে আবার দোকান বন্ধ রাখছেন। অধিকাংশ ক্রেতাই ডিম ক্রয় করতে পারছেন না।

ব্যবসায়ীদের দাবি, ফার্ম থেকে কেনা দামের থেকেও কমে বিক্রি না করলেই জরিমানা করা হচ্ছে। এ জন্য তারা নতুন করে ডিম কিনছেন না, যা মজুত আছে লুকিয়ে বিক্রি করে শেষ করে আর ডিম আনবেন না। আগামীকাল ডিম বেচা বিক্রি সব বন্ধ বলেও জানান তারা।

ক্রেতারা জানায়, এতোদিন অতিরিক্ত মুনাফার জন্য চড়া দামে ডিম বিক্রি করেছে ব্যবসায়ীরা, সামর্থ্য না থাকায় অল্প করে হলেও ডিম কিনে খেয়েছেন তারা। কিন্তু এখন সেটিও বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন তারা।

এ ব্যাপারে পাবনার বড় বাজারে আসা ক্রেতা শফিউল হাসান বলেন, বিবেকবোধ হারিয়ে ফেলেছেন ব্যবসায়ীরা। এ কয়দিন স্বাভাবিক লাভের বাইরে অতিরিক্ত লাভের জন্য চড়া দামে ডিম বিক্রি করলেন তারা। ডিম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই চলে গেছে । ব্যবসার নামে এমন দুর্বৃত্তায়ন রোধে সরকার প্রতিটি ডিমের মূল্য প্রায় ১১টাকা করে বেধে দিয়েছেন। সে নির্দেশ তারা মানেন না। বাধ্য হয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরকে দিয়ে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানাও করছেন। তাতেও তারা থামছেন না। এবার ভোক্তা অধিদপ্তর ও সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা ডিম বিক্রিই বন্ধ রাখলেন। যদিও তারা বলছেন কেনার চেয়ে কম দামে বিক্রি করলে লোকসানে পড়বেন জন্য ডিম বিক্রি করছেন না। তবে এসবই তামাশা।

আরেক ক্রেতা মাহবুব মিয়া বলেন, বিলাসিতার জন্য না হোক অন্তত প্রয়োজনীয় হারে তো ডিমটা খেতে চায় সবাই। সেটিও কি সম্ভব হচ্ছে? ব্যবসায়ীরা বেশি বেশি টাকা লাভ করবে, বাড়ি গাড়ি করবে। এতে দেশের মানুষ মরুক বা বাঁচুক সেটা তাদের বিবেচনার বিষয় নয়। কোনোভাবে বাঁচার উপায় নাই। পেঁপে ছাড়া পঞ্চাশ টাকায় এক কেজি সবজি মেলা অসম্ভব। এক কেজি কচু কিনতে গেলে ৬০ টাকা, বেগুন ৮০/৯০ টাকা। সপ্তাহ বা মাসে বাজারে যে দর বৃদ্ধির হিড়িক দেখা যায়, এক বছরে একজন চাকরিজীবীর ওই টাকা ইনক্রিমেন্ট হয় না। তাহলে কীভাবে বাঁচবে মানুষ?

লাইব্রেরি বাজারে আসা ক্রেতা আশীষ কুন্ডু জানান, এক আটি শাক নিতে গেলে ৪০/৫০ টাকা গুণতে হয়। সেই হারে আয় বাড়েনি অথচ খরচ প্রতিদিনই বাড়ছে। এভাবে কতদিন চলা যাবে সেটি বলা মুশকিল।

ডিম বিক্রি বন্ধ রাখার ব্যাপারে পাবনার বড় বাজারের এক ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ হয়। নাম পরিচয় না জানালেও ব্যবসায়ীদের অসুবিধার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, সবস্তরে যদি শৃঙ্খলা না থাকে তাহলে শুধু আমাদের ধরে জরিমানা করে বাজার ঠিক করা সম্ভব নয়। আমরা কম দামে কিনতে পারলে অবশ্যই কমেই বিক্রি করবো। কিন্তু সেটা তো হচ্ছে না। ফার্ম থেকে একটি ডিমের দাম প্রায় ১৩ টাকার ওপরে পড়ে যাচ্ছে। অথচ ম্যাজিস্ট্রেট এসে বলেন ১১টাকার বেশি দাম নেওয়া যাবে না। বেশি দামে ক্রয়ের রশিদ দেখালেও জরিমানা করেন। তাহলে কীভাবে ডিম বিক্রি করবো?

তিনি বলেন, অতিরিক্ত লাভ করলে ফার্ম মালিক ও বড় আড়ৎদাররা করে। তারা যদি দাম না কমায় আমাদের সাধ্য আছে কমানোর? অথচ দোকান খুললেই জরিমানা গুণতে হচ্ছে। দুএকজন ব্যবসায়ীর কাছে খুবই অল্প কিছু ডিম ছিল, সেগুলো আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাজার ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আগামীকাল থেকে দোকান একদমই বন্ধ রাখবে ব্যবসায়ীরা।

গতকাল থেকেই পাবনার বাজারগুলোতে স্বাভাবিক হারে ডিম মিলছে না। কেউ কেউ স্বল্প পরিসরে দোকান খুলে বিক্রি করলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে গঠিত টাস্ক ফোর্সের উপস্থিতির খবর পেয়ে দোকান বন্ধ রাখছেন।

তদারকি ও জরিমানার কারণেই তারা এ পন্থা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পাবনা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনি। তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি ডিমের বাজারসহ পুরো বাজারের অস্থিরতা দূর করতে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা নিয়ম মেনে সেভাবে সহযোগিতা করছেন না। উল্টো তারা চোর-পুলিশ খেলছেন। আমরা গেলেই দোকান বন্ধ করে সরে যাচ্ছেন। যাদের পাচ্ছি তারা কেউই সরকার নির্ধারিত মূল্যে ডিম বিক্রি করছেন না। খুচরা বিক্রেতা থেকে শুরু করে পাইকার, আড়ৎদার ও ফার্ম মালিকেরাও একই কাজ করছেন।

তিনি আরও বলেন, সবজি বা অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত দাম হাঁকছেন। এখন তারা দোকান বন্ধ রাখার পন্থা নিয়েছেন, এতে আমরা আমাদের অবস্থান থেকে সরে যাব এমন নয়। নিয়ম এবং আইনের বাইরে গেলেই আমরা ব্যবসায়ীদের ধরবো। এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত