অর্জনের চেয়ে বিতর্ক জন্ম দিয়েছেন বেশি

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:১৩ এএম

বিপিএলের ক্রিকেটারদের দল চূড়ান্তের পর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন শেষে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন বিসিবির প্রভাবশালী একজন কর্তা। এ সময় হলরুমের সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, দিন দুয়েকের মধ্যেই একটা বড় সংবাদ আসছে। বলেই তিনি বেরিয়ে গেলেন। উপস্থিত তিন সাংবাদিকের সবার মধ্যেই কৌতূহল, কী হতে পারে! একজন বললেন, চন্ডিকা হাথুরুসিংহের বিদায় ছাড়া বড় খবর আর কী হতে পারে। সেই কথোপকথনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জানা গেল, অনুমিত সেই সংবাদ। শ্রীলঙ্কান কোচকে বরখাস্ত করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।

মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় বিসিবির সংবাদ সম্মেলন কক্ষে হাজির হয়ে এই কথা জানান বোর্ড সভাপতি ফারুক আহমেদ। ভারতের মাটিতে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে ধবলধোলাই হয়ে এসেছে বাংলাদেশ। ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যানস ছিল যা-তা। অনেকেই তাই ধারণা করতে পারেন, এমন ফলাফলের কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু তা আসলে না। কারণ এক সিরিজ আগেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয় করে এসেছেন নাজমুল হোসেন শান্তরা। তাহলে কেন?

অক্টোবরের বিকেলের এই বরখাস্তের কারণ জানতে হলে ফিরে যেতে হবে গত বছরের অক্টোবরে। ভারতে হয়ে যাওয়া ওয়ানডে বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচে একাদশের বাইরে থাকা এক ক্রিকেটারের (নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায় তার নাম নাসুম আহমেদ) গায়ে হাত তুলেছিলেন হাথুরুসিংহে। সেই ঘটনায় তদন্ত হয়েছিল বিশ্বকাপ থেকে ফেরার পরপরই। প্রতিবেদনও জমা দিয়েছিল তদন্ত কমিশন। কিন্তু সেটা ধামাচাপা দিয়েছিলেন তৎকালীন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন।

এমনকি ‘কোনো কিছুই হয়নি’ জানিয়ে গণমাধ্যমের সামনে তিনি মন্তব্যও করেছিলেন। বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে ফারুক ধামাচাপা দেওয়া সেই তদন্তে আবারও হাত দেন। নিজে তদন্ত করেন, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেন। সত্যতা পেয়ে দেশের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচকেরও খারাপ লেগেছে। তিনি সেটা মানতে পারছিলেন না। তাছাড়া এটা চুক্তি লঙ্ঘনও। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে তারপরই সিদ্ধান্ত নেন হাথুরুসিংহেকে বরখাস্তের।

শুধুই এই ঘটনা নয়। তিনি লঙ্ঘন করেছেন চুক্তির আরও একটি শর্ত। বছরে ৯০ দিনের বেশি ছুটি পাওয়ার কথা না হাথুরুসিংহের। কিন্তু তিনি এই বছরেও ইতিমধ্যে সেটা অতিক্রম করে ফেলেছেন। যতবারই গেছেন, ইমেইল দিলেও কোনো আলোচনা ছাড়াই গেছেন। এটাও আমলে নিয়েছে বিসিবি।

অথচ পাপনের নেতৃত্বাধীন বোর্ড সেটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে সব সময়। কারণ হিসেবে সামনে আসত হাথুরুর অধীনে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান। ২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালসহ ঘরের মাঠে ভারত-পাকিস্তান-দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজে হারানো ছিল উল্লেখযোগ্য সাফল্য। টেস্টে তার অধীনে ২০১৬ সালে টাইগাররা হারায় ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে। এই মেয়াদে আবার ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডকে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারানো ও সবশেষ পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়। সবমিলিয়ে তার অধীনে ৩১ টেস্টে ১১ জয়, ১৬ হার ও ৪ ড্রয়ের মুখ দেখে বাংলাদেশ। সাফল্যের হার ৩৫.৪৮%। ৮৫ ওয়ানডেতে ৪৪ জয় ৪২ হার ও দুটি ম্যাচ ফলহীন। সাফল্যের হার ৫৩.০১%। আর ৫৪ টি-টোয়েন্টিতে ২৭ জয়, ২৬ হার ও একটি ফলহীন ম্যাচে তার সাফল্যের হার ৫১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানের দোহাই দিয়ে তিনি বছরের পর একনায়কসুলভ আচরণ করে গেছেন বিসিবিতে। বোর্ড সভাপতি ছাড়া কাউকেই খুব একটা জবাবদিহি করতেন না তিনি।

শেষ পর্যন্ত হাথুরুসিংহে বরখাস্ত হয়েছেন নাসুমের গায়ে হাত তোলা কাণ্ডে। তবে এই বাঁহাতি স্পিনার ছাড়াও দেশের শীর্ষ ক্রিকেটারদের সবার সঙ্গেই তার সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। একাধিক বিতর্কিত কাণ্ডে হয়েছেন খবরের শিরোনাম। এমনকি তার কোচিং কৌশল নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন। 

চুক্তিতে থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালে হুট করেই তিনি দায়িত্ব ছেড়েছিলেন বাংলাদেশ দলের। ৭ বছর আগে এ নিয়ে বেশ সমালোচনাও হয়েছিল। হাথুরুসিংহের কোচিংয়ের সময়ে বাংলাদেশ দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাকে বাধ্য করেছিলেন টি-টোয়েন্টি থেকে সরে যেতে। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের শততম টেস্টে তিনি খেলতে দেননি। বাদ দিতে চেয়েছিলেন ঐ বছর ওয়ানডে সিরিজ থেকেও। তবে মাশরাফী ঢাল হয়ে দাঁড়ানোয় সেটা তিনি পারেননি। এই মেয়াদে এসে বিশ্রামের কথা বলে তাকে দল থেকে বাদ দিয়েছিল বিসিবি তার কথাতেই। যদিও সমালোচনার মুখে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। বিশ্বকাপে তিনি এর প্রতিদানও দেন। মুশফিককে টেস্ট অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে হাথুরুসিংহের বড় ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও মুশফিকের যত টেস্ট সাফল্য সেটা হাথুরুসিংহের আমলেই।

দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের দ্বন্দ্বের আগুনে যেন ঘি ঢেলেছিলেন। সাকিবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তামিমকে বাদ দিয়েছিলেন ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপের দল থেকে। তারপর সাকিব একটি সাক্ষাৎকার দিয়ে সরাসরি তামিমকে নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। যা বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সেও প্রভাব ফেলেছিল দলের ভেতরে। এ সবেও হাথুরুর ভূমিকা ছিল বলে গুঞ্জন উঠেছিল। এছাড়াও আছে বহু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড।

খেলোয়াড় নির্বাচনে পক্ষপাত : হাথুরুসিংহে তার কোচিংয়ের সময় তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের যথাযথভাবে সুযোগ না দিয়ে একাধিকবার অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপরে নির্ভর করেছেন। তরুণদের বিকাশে তার অবদান অনেক ক্ষেত্রে কম মনে করা হয়। এমনকি, তার সময়ে দলীয় নির্বাচনে কিছু অনাকাক্সিক্ষত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ ছিল। সৌম্য সরকার অফ ফর্মে থাকলেও তাকে জোর করে খেলানোর প্রবণতা ছিল হাথুরুসিংহের। ফলে দলের মধ্যে প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা নিজেদের মেলে ধরতে পারেননি।

স্বৈরতান্ত্রিক ও দুর্বল কোচিং কৌশল : হাথুরুসিংহের কোচিং শৈলীকে কঠোর এবং স্বৈরতান্ত্রিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে কঠোরভাবে আচরণ করতেন এবং তাদের ওপর উচ্চমানের চাপ প্রয়োগ করতেন। এই ধরনের শাসন অনেক খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হয়। এমনকি বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদও বলেছেন হাথুরুসিংহের দেওয়ার কিছু নেই। তার কৌশল আধুনিক ক্রিকেটের সঙ্গে মানানসই না।

আক্রমণাত্মক মনোভাবের অভাব : বাংলাদেশ দল তার কোচিংয়ে কখনোই ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক খেলায় ফিরে আসতে পারেনি বলে বিশেষজ্ঞদের মত। ম্যাচ হারলে হাথুরুসিংহের মধ্যে দলকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সহায়তা করার প্রবণতা দেখা যায়নি। বরং তার কঠোর শাসনব্যবস্থার কারণে খেলোয়াড়রা আরও চাপের মধ্যে পড়তেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত