ডিম, মাংসসহ ভোগ্যপণ্যের দামে লাগাম টানতে সরকার কয়েকটি পণ্যের দাম বেঁধে দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ডিমের উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাপর্যায়ে দাম বেঁধে দিয়েছিল সরকার। পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছিল। তাতে কোনো কাজ হচ্ছিল না। আড়ত ও পাইকারি বাজারে ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছিলেন ব্যবসায়ীরা। শেষ পর্যন্ত সরকার ব্যবসায়ীদের বুঝিয়ে নির্ধারিত দামে ডিম বিক্রি করতে রাজি করিয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন দৈনিক ডিমের চাহিদা পাঁচ কোটি পিস। পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) হিসাবে, দেশে দৈনিক ডিমের উৎপাদন সাড়ে চার কোটি পিস। তবে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যায় ৫০ লাখ পিস ডিমের উৎপাদন কম হওয়ার কারণে তা নেমেছে চার কোটিতে।
গত মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সাত কোম্পানিকে সাড়ে চার কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছে। কিছু ডিম আমদানি হলেও সিংহভাগের কোনো খবর নেই। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নিয়মিত অভিযানের ভয়ে তেজগাঁও ও চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিমের আড়তে ডিম ব্যবসায়ী সমিতি ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছিল। ফলে রাজধানীতে ডিমের সংকট দেখা দেয়।
এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, আমদানিকৃত ডিমের শুল্ক ৩৩ থেকে ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ ডিম আমদানিতে ২০ শতাংশ শুল্কছাড় সুবিধা পাবেন আমদানিকারকরা। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ সবসময় ছিল এবং এখনো আছে। এ মুহূর্তে ডিমের দাম ঊর্ধ্বমুখী। দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে বর্তমান সরকার যথেষ্ট আন্তরিক।
আজাদ মজুমদার বলেন, আজকে (গতকাল) ভোক্তা অধিদপ্তর কার্যালয়ে ডিম সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে আড়তদাররা সরাসরি খামারিদের কাছ থেকে ডিম কিনবেন। যাতে করে ডিমের দাম কিছুটা কমে সহনীয় পর্যায়ে আসে।
এদিকে ডিম উৎপাদক এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান জানান, আজ (বুধবার) থেকে সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম যথাক্রমে উৎপাদক পর্যায়ে ১০ টাকা ৯১ পয়সা, পাইকারিতে ১১ টাকা ১ পয়সা এবং খুচরায় ১১ টাকা ৮৭ পয়সায় ডিম বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে হিসাবে ভোক্তাপর্যায়ে প্রতি ডজন কিনতে খরচ হবে ১৪২ টাকা ৪৪ পয়সা।
ভোক্তা অধিদপ্তরের বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ডিম উৎপাদক কাজী ফার্ম, ডায়মন্ড, প্যারাগনের মতো কোম্পানির প্রতিনিধিরা ছিলেন। তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আমানত উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক হানিফ মিয়া, সহসভাপতি হারুনুর রশিদ, কোষাধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে সরকার নির্ধারিত দামে ডিম কেনাবেচার জন্য সব পক্ষ রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আমানত উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি ১০০ পিস ডিম ১ হাজার ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি করতে পারব। সেই হিসাবে খুচরা পর্যায়ে ১১ টাকা ৮৭ পয়সায় বিক্রি করতে সমস্যা হবে না বলে মনে করি।’ তিনি আরও বলেন, আজ থেকেই ডিম আমদানি শুরু হবে। তাছাড়া ফার্মগুলো যখন থেকে ডিম দেওয়া শুরু করে, তখন থেকেই আমদানি করা শুরু করবেন তারা।
গতকাল রাজধানীর কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ডজনপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে। বাজারগুলোতে লাল ও সাদা ডিম ডজনপ্রতি ১৮০ টাকা বিক্রি হলেও পাড়া-মহল্লায় এসব ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা পর্যন্ত।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, তাদেরই প্রতি পিস ডিমের কেনা পড়ে ১২ টাকা ৭০ পয়সা। তা বিক্রি করতে হয় ১৩ টাকা বা তার একটু বেশি। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও ভোক্তার অভিযানে তাদের গণহারে জরিমানা করায় সাময়িক সময়ের জন্য ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন তারা।
তবে সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম এক মাসেও কার্যকর না হওয়াকে নতুন ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সাড়ে চার কোটি ডিমের অনুমোদন দিয়েছে। তাছাড়া প্রায় ১২ টাকা ডিমের দাম বেঁধে দিয়েও তা এক মাসেও কার্যকর করতে পারেনি। উল্টো সরকারের অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যবসায়ীরা ডিম বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কোনো এলাকায় ডিমের পর্যাপ্ত মজুদও দেখা যাচ্ছে। সব কারণ বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, নতুন কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের জন্য ডিমসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। সরকার নানাভাবে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে টালমাটাল ডিমের দামের লাগাম টানতে মূল্য বেঁধে দেওয়া ও আমদানির অনুমতি দিয়েছে। তবুও তারা ব্যর্থ হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা পণ্য স্টক করে বাজারকে কৃত্রিম সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এর মূল কারণ, সরকারের যথেষ্ট গবেষণা না থাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘অতীতেও দেখা গেছে, সরকার নানা সময় বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহারসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু তার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। এবারও সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। এর জন্য উৎপাদক থেকে ভোক্তা, চাহিদার বিষয় যথেষ্ট গবেষণা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকা দরকার।’
