কারা আইন যুগোপযোগী হোক

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৪, ১২:২২ এএম

আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার কথাটি পুরনো। সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা নির্ভর করে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ওপর। যে দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত সে দেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ। পৃথিবীর অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। আধুনিক সভ্যতার যুগে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আইন ও বিধান গড়ে উঠেছে। ইংরেজ শাসনামলে প্রণীত কারা আইন ও কারাবিধি দ্বারা দেশের কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আমাদের দেশে অধিকাংশ সেক্টরে এখনো ব্রিটিশ আইনের আধিপত্য। তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। শাসকের আইন দ্বারা সুরক্ষিত রাখতেই এসব করা হয়েছিল সেই ব্রিটিশ সময়ে। এরপর অনেক সময় গড়িয়েছে। আমরা অনেক জায়গায় তা রেখে দিয়েছি। সরকারের নেতৃত্বে যারা থাকে, তারা বরাবরই জনগণকে দমন করতে চেয়েছে। প্রচলিত আইন কাঠামো কোন সময়ে প্রণীত আধুনিক আইন? বিশেষ করে কারা আইন? সেই ব্রিটিশ সময়ে! এরপর শুধু সংশোধন হয়, নতুন আইন হয় না। আমাদের কারা আইনও চলছে সেই ধারায়। এসব আইন ও বিধিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বন্দির সুযোগ-সুবিধা না থাকা, নারী ও শিশু বন্দিদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা নিয়ে বরাবরই সমালোচনা হয়েছে।

রবিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে শনিবার দুপুরে কারা অধিদপ্তরের কারা কনভেনশন সেন্টারে ‘কারাগার সংস্কার : বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় আলোচকরা বিভিন্ন কথা বলেন। কর্মশালাটি যৌথভাবে আয়োজন করে আইন, আদালত, মানবাধিকার ও সংবিধানবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল-রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ) ও কারা অধিদপ্তর। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের শিল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, ‘আজকের এই সেমিনার থেকে আমাদের লক্ষ্য থাকবে কারাগারগুলো সংস্কারের চেষ্টা করা। এই লক্ষ্যে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন সুপারিশ করবে। যারা মানবাধিকার ও বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন, তারা এ সুযোগটিকে কাজে লাগান।

বাংলাদেশে কারাগার ব্যবস্থা সংশোধনমূলক তত্ত্বের ওপর গড়ে উঠেছে। কিন্তু কারাগারগুলো এখনো সংশোধনাগার হয়ে ওঠেনি। কারাসংক্রান্ত বিধানগুলো শত বছরের বেশি পুরনো। এমন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, মানবাধিকার এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের সমন্বয় করে কারাব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ ও বাস্তবসম্মত করতে হবে। কারাসংক্রান্ত পুরনো আইন বাতিল করে সংস্কার বা পরিবর্তন করতে হবে।

শুধু এই আইন না। প্রচলিত অনেক আইন, বিধিবিধান  তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। মানুষকে নিয়ন্ত্রণ, দমন-পীড়নই ছিল তখনকার শাসকদের উদ্দেশ্য। কিন্তু আধুনিক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে এসব সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঔপনিবেশিক আইন অনুযায়ী প্রণীত জেল কোডের তালিকাভুক্ত বিধি ও আইন অনুযায়ী বর্তমানে দেশে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারসহ কারাগারগুলো পরিচালিত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জেল কোড পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী এতদিনেও এসব আইনের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। আমাদের কারাগারগুলো এখনো সংশোধনাগার হয়ে ওঠেনি। এমন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, মানবাধিকার এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের সমন্বয় করে কারাব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ ও বাস্তবসম্মত করতে হবে। কারাগারের অনিয়ম বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, অপরাধীরা যেন কারাগার থেকে সংশোধনের সুযোগ পায়, পাশাপাশি দেশে বিদ্যমান জেল কোড, দণ্ডবিধি যুগোপযোগী করে কারাগারকে সংস্কার করতে হবে।

কারাবন্দিদের মানবাধিকার এবং জামিন নিয়েই বা কতটুকু ভাবি? ৯৯ জন আসামি শাস্তি পেতে পারে, একজন নিরপরাধ যেন শাস্তি না পায় যদি এই প্রতিষ্ঠিত যুক্তি মানি, তাহলে একজন কারাবন্দিকে জামিনে অনীহা কেন? অহেতুক শাস্তি না সংশোধনের জায়গা কারাগার? ঔপনিবেশিক আমলের তল্পিবাহক আইন যুগোপযোগী করে সংস্কারের এখনই সময়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত