পদত্যাগপত্র প্রশ্নে পরস্পরবিরোধিতা

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:২৫ এএম

প্রবল গণআন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার আড়াই মাস পার হয়েছে। এরপরও তাকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিদিনই থাকে কোনো না কোনো আলোচনা-সমালোচনা। তিনি দেশ ছাড়ার আগে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন কি করেননি তা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে চলত বাহাস। এরই মধ্যে এ আলোচনায় নতুন করে রসদ জুগিয়েছে সম্প্রতি ‘দৈনিক মানবজমিন’-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এক সাক্ষাৎকার। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে উদ্ধৃত করে মতিউর রহমান চৌধুরীর লেখায় বলা হয়েছে, তিনি শুনেছেন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু তার কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। যা নিয়ে হঠাৎই সরগরম হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আড়াই মাস পর রাষ্ট্রপতির এমন বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা কড়া সমালোচনা করেছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে অসৎ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করা হয়। সরকারের আইন ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি স্ববিরোধী কথা বলেছেন। মিথ্যাচার করেছেন। তার এই বক্তব্য শপথ ভঙ্গ করার শামিল।’ এমন বক্তব্যের পর তিনি রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে পারেন কি না সে প্রশ্ন তোলেন আসিফ নজরুল। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে যাওয়ারও জোরালো বক্তব্য আসে।

তবে শেষমেশ গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগকেন্দ্রিক মীমাংসিত বিষয়ে নতুন করে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বঙ্গভবন থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গত শনিবার দেওয়া সাক্ষাৎকারের ব্যাখ্যায় তিনি বিতর্ক সৃষ্টি করে অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল কিংবা বিব্রত করা থেকে বিরত থাকার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট দুপুরের পর দেশ ছাড়েন। ওইদিন প্রথমে বিকেলে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং রাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা জানান। এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০ আগস্ট ওয়াশিংটনে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘আমার মা অফিশিয়ালি পদত্যাগ করেননি। সেই সময় তার হাতে ছিল না।’

সেই থেকেই শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে নানা মহলে গুঞ্জন তৈরি হয়। কিন্তু গত শনিবার দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ করার কোনো দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। তবে এটিকে মীমাংসিত বিষয় বলেও ওই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এ বিষয়ে আর বিতর্কের সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী চলে গেছেন এবং এটাই সত্য। তবু এ প্রশ্নটি যাতে আর কখনো না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে আমি সুপ্রিম কোর্টের মতামত চেয়েছি।’

আমার মা অফিশিয়ালি পদত্যাগ করেননি : জয়

শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ১০ আগস্ট ওয়াশিংটনে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমার মা পদত্যাগ করেননি। তার পরিকল্পনা ছিল, একটি বিবৃতি দেওয়ার পর পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তখন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন লক্ষ্য করে পদযাত্রা শুরু করে দিয়েছে এবং সে সময় তার হাতে একদমই ছিল না। এমনকি আসার আগে গোছানোর সময়ও তার কাছে ছিল না। তাই সাংবিধানিকভাবে, এখনো তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।’

তিনি বলেন, ‘সেনাপ্রধান এবং বিরোধী রাজনীতিবিদদের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নিজের পদে থাকা সত্ত্বেও যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছে, তা নিয়ে আমরা আদালতে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারি।’

৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে যা বলেছিলেন রাষ্ট্রপতি : গত ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, আপনারা জানেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আজ বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়কের সঙ্গে আলোচনা হয়। শুরুতেই সেনাপ্রধান বিরাজমান সার্বিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তার আলোচনা সম্পর্কে আমাকে অবহিত করেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও এ সময় তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। সভায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত শহীদদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়। এ ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিটিভিসহ দেশের ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমগুলোতে সেই ভাষণ সম্প্রচার হয়, যা এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল।

মানবজমিনের প্রধান সম্পাদককে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার : গত শনিবার মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, তিনি শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তার কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ বা নথিপত্র নেই। সেখানে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি বহুবার পদত্যাগপত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। হয়তো তার সময় হয়নি।’

কথোপকথনের সময় রাষ্ট্রপতি বলেন, ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে বঙ্গভবনে ফোন আসে, তখন বলা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আসবেন। এরপরই বঙ্গভবনে প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যে আরেকটি ফোন আসে যে তিনি (শেখ হাসিনা) আসছেন না।

সেই সময়ের কথা উল্লেখ করে সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘চারদিকে অস্থিরতার খবর। কী হতে যাচ্ছে জানি না। আমি তো গুজবের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে পারি না। তাই সামরিক সচিব জেনারেল আদিলকে বললাম খোঁজ নিতে। তার কাছেও কোনো খবর নেই। আমরা অপেক্ষা করছি। টেলিভিশনের স্ক্রলও দেখছি। কোথাও কোনো খবর নেই। একপর্যায়ে শুনলাম তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আমাকে কিছুই বলে গেলেন না।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার যখন বঙ্গভবনে এলেন, তখন জানার চেষ্টা করেছি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন কি না? তার কাছে (জেনারেল ওয়াকার) একই জবাব শুনেছি তিনি পদত্যাগ করেছেন। মনে হয় সময় পাননি জানানোর।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সবকিছু যখন নিয়ন্ত্রণে এলো তখন একদিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব এলেন পদত্যাগপত্রের কপি সংগ্রহ করতে। তাকে বললাম, আমিও খুঁজছি।’ মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপচারিতার একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এ বিষয়ে আর বিতর্কের সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী চলে গেছেন এবং এটাই সত্য। তবু এই প্রশ্নটি যাতে আর কখনো না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে আমি সুপ্রিম কোর্টের মতামত চেয়েছি।’

রাষ্ট্রপতির পাঠানো রেফারেন্সের পরিপ্রেক্ষিতে সেই সময়ের প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ৮ আগস্ট এ সম্পর্কে মতামত দেয়। তাতে বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক শূন্যতা দূর করতে এবং নির্বাহী কার্যক্রম সুন্দরভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টামণ্ডলীকে শপথবাক্য পাঠ করাতে পারবেন বলে আপিল বিভাগ মতামত দেয়।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শপথভঙ্গের শামিল : আসিফ নজরুল

শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি বলেছেন উনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র পাননি, এটা হচ্ছে মিথ্যাচার এবং উনার শপথ লঙ্ঘনের শামিল। কারণ উনি নিজেই ৫ আগস্ট রাত ১১টা ২০ মিনিটে তিন বাহিনীর প্রধানকে নিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী উনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং উনি তা গ্রহণ করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে জানতে চাওয়া হয়, এ পরিস্থিতিতে করণীয় কী। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উপদেশমূলক এখতিয়ার প্রয়োগ করে জানতে চাওয়া হয়। সেটার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের সব বিচারপতি মিলে ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতির রেফারেন্সের ভিত্তিতে মতামত দেন। এর প্রথম লাইন ছিল, দেশের বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, তারপর অন্যান্য কথা।’

আসিফ নজরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়েছেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে যে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা যায়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এই মতামতের ভিত্তিতে একটি নোট আমরা মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠিয়েছি।’ নোটে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি এই মতামতটা দেখেছেন এবং গ্রহণ করেছেন। এরপর উনি নিজে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছেন।’

আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘৫ আগস্ট রাত ১১টা ২০ মিনিটে নিজের মুখে ভাষণে বলেছেন, উনাকে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এবং উনি গ্রহণ করেছেন। পরবর্তীকালে একের পর এক কার্যাবলির মধ্য দিয়ে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, উনি পুরো জাতির কাছে বিভিন্নভাবে নিশ্চিত করেছেন, আবারও নিশ্চিত করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এবং তিনি গ্রহণ করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকে যদি উনি (রাষ্ট্রপতি) আড়াই মাস পর বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র দেননি, তাহলে এটা এক ধরনের স্ববিরোধিতা হয়। উনার শপথ লঙ্ঘন হয় এবং এই পদে থাকার যোগ্যতা উনার আর আছে কি না, প্রশ্ন আসে। কারণ আমরা জানি বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা না থাকলে বা গুরুতর অসদাচরণ করলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে থাকতে পারে কি না, সেটা নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আমাদের দেশের সংবিধানে আছে।’ আসিফ নজরুল বলেন, ‘এখন উনার স্ববিরোধী কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। যদি উনি এ বক্তব্যে অটল থাকেন, তাহলে উনার রাষ্ট্রপতি পদে থাকার যোগ্যতা আছে কি না, সেটা আমাদের উপদেষ্টামণ্ডলীর সভায় ভেবে দেখা হবে।’

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা, যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেদিন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর দেন। সেদিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ দেন। এরপর সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সেই সরকারের শপথ পড়ান।

সমালোচনা সমন্বয়কসহ রাজনীতিবিদদের: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, রাষ্ট্রপতির কাছে মৌখিকভাবে পদত্যাগ করেছিলেন শেখ হাসিনা। গতকাল নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্ট এমন তথ্য জানান তিনি। ওই পোস্টে ক্রীড়া উপদেষ্টা উপদেষ্টা লেখেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে মৌখিকভাবে পদত্যাগ করেছিল স্বৈরাচারী খুনি হাসিনা। পদত্যাগপত্র নিয়ে বঙ্গভবনে যাওয়ার কথা থাকলেও ছাত্র-জনতা গণভবনের কাছাকাছি চলে আসলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় খুনি হাসিনা।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মতো মানুষ যদি বলেন শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রের ডকুমেন্টস তিনি রাখেননি, তাহলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা ছাত্রসমাজই নির্ধারণ করবে।’ গতকাল রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন সারজিস আলম।

তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সিস্টেম এখনো সরেনি। বিভিন্ন এজেন্সি ও কুচক্রী মহল দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের প্রতিহত করতে হবে। প্রয়োজনে আমরা আবার রাজপথে নামব।’

শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শপথ ভঙ্গ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের উদ্দেশে বলেন, ‘এখনো সময় আছে, বঙ্গভবনের বিলাসিতা ছেড়ে আপনি আপনার নিজের রাস্তা দেখে নিন। ফ্যাসিস্ট খুনি শেখ হাসিনার সংবিধান আমরা মানি না; কিন্তু ওই সংবিধানের আপনি শপথ ভঙ্গ করেছেন। যদি আপনি মনে করে থাকেন, ফ্যাসিস্ট খুনি শেখ হাসিনাকে আপনি পুনর্বাসিত করবেন, তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। ফ্যাসিস্ট খুনি শেখ হাসিনার পুনর্বাসন এই বাংলায় আর কোনোদিন হবে না। তবে এই খুনি শেখ হাসিনাকে বাংলায় আসতে হবে, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে, ফাঁসির কাষ্ঠে তাকে ঝুলতে হবে।’

গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক সমাবেশে এসব কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে ক্যাম্পাসে মশাল মিছিল শেষে এ সমাবেশ হয়।

দ্রুতই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। রাষ্ট্রপতি তার পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন, দ্রুত তাকে পদত্যাগ করতে হবে। দ্রুতই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কোনোভাবেই আর রাষ্ট্রপতিকে পদে দেখতে চাই না।’

এদিন এক অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন একটি সংবাদমাধ্যমকে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ‘বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তার এ ভাষণ সারা দেশের মানুষ শুনেছে। রাষ্ট্রপতি নিজে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাকে শপথ পড়িয়েছেন। এখন তিনি বলছেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের দালিলিক প্রমাণ নেই। আমি বলব, রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের দুই মাস পরে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এ কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতি অসত্য বলেছেন।’

অন্যদিকে শিক্ষা জীবনে রাষ্ট্রপতি ছাত্রলীগ করতেন এবং পলাতক শেখ হাসিনাকে তিনি পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি তো শেখ হাসিনারই নিয়োগ দেওয়া। রাষ্ট্রপতি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করতেন, যুবলীগ করতেন। শেখ হাসিনা মনোনীত রাষ্ট্রপতির কণ্ঠের সুর ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। উনি (রাষ্ট্রপতি) বলেছেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র পাননি। যে স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে অন্য লোকের কাছে চলে যায়, সে কি ডিভোর্স লেটার দিয়ে যায়নি। পলাতক শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দিয়ে যাননি, হতে পারে এটা। কিন্তু আমরা জানি তিনি পদত্যাগপত্র দিয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ বিষয়ে সংবিধানে যা বলা আছে : সংবিধানের ৫৭ (ক) ধারা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন, তার কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র বা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রমাণ পৌঁছায়নি।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বিষয়ে সংবিধান কী বলে : সংবিধানের প্রথম পরিচ্ছেদের ৫৩ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে রাষ্ট্রপতিকে পদ থেকে অপসারণ করা যাবে। তবে সেজন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। তবে রাষ্ট্রপতির অপসারণ বিষয়ে সংবিধানে যে অভিশংসনের কথা লেখা আছে, সেটি এখন কার্যকর নয় এই কারণে যে, সংসদ এখন কার্যকর নয়। বিএনপি নেতা জয়নুল আবেদীন অবশ্য অপসারণের প্রসঙ্গে যেতে চাননি। তিনি বলেন, ‘যেহেতু রাষ্ট্রপতির পদে থেকে তিনি অসত্য কথা বলেছেন, তাই দেশের মানুষ মনে করেন তার পদত্যাগ করা উচিত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত