তবুও সড়কে বাড়ছে মৃত্যু

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:২৪ এএম

আজ ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর এই দিনটি জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হয়। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ছাত্র-জনতার অঙ্গীকার, নিরাপদ সড়ক হোক সবার’। দিবসটি সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জনগণ ও পরিবহনের চালকরা সচেতন না হলে এবং সড়ক পরিবহন আইনের কার্যকর প্রয়োগ না হলে সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না। ৩৬৫ দিনের নিরাপদ সড়কের জন্য শুধু এক দিনের দিবস পালন করে কমানো যাবে না সড়ক দুর্ঘটনা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এই আইন থাকলেও সেটি শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ। ফলে সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থার তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। সড়ক নিরাপত্তায় সরকারের পৃথক আইন প্রণয়নে একটি কমিটি গঠিত হলেও তা এখন স্থবির অবস্থায় আছে। সড়ক আইনের যেসব নিয়মকানুন রয়েছে, সেগুলো কার্যকরে কাউকে ভালোভাবে পালন করতে দেখা যায়নি। ফলে সড়কে ফিটনেসবিহীন বাস প্রকাশ্যে চলাচল করছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনিবন্ধিত যানের সংখ্যা। কোনো কিছুর শৃঙ্খলা নেই সড়কে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, সড়ক সেক্টরে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, চরম অব্যবস্থাপনা, চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের কারণে বিগত ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ বছরে দেশে ৬০ হাজার ৯৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ৫ হাজার ৩৩৮ জন নিহত হয়। এতে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন আহত হয়। এ সময় গণপরিবহন সংকটে মোটরসাইকেলে যাতায়াতের কারণে ২০ হাজার ১২৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৩৭ হাজার ৫৫৩ জন নিহত হয়। আর ৪৬ হাজার ১৬৭ জন আহত হয়, যা মোট নিহতের ৩৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

গতকাল ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনে আয়োজিত এক সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতিবছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে প্রতি লাখে রোডক্র্যাশে মৃত্যু ছিল ১৫.৩ এবং ২০২১ সালে এই মৃত্যু বেড়ে হয় প্রতি লাখে ১৮.৬ জনের মতো। অন্যদিকে, বিআরটিএর হিসাব মতে, প্রতিবছর দেশে গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ মারা যায় ও ১০ হাজারের বেশি বিভিন্ন বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয় এবং পঙ্গুত্ববরণ করে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দেশের ইতিহাসে সড়ক মন্ত্রণালয়ের এক যুগেরও বেশি সময়ের মন্ত্রী হিসেবে ওবায়দুল কাদের পরিবহনে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়ানৈরাজ্য, সড়কে চাঁদাবাজি, মানসম্মত গণপরিবহন নামানো, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে চরমভাবে ব্যর্থতার কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পরিবর্তনের পরও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএতে ওবায়দুল কাদেরের প্রেতাত্মারা পদে পদে বসে আছেন। এখনো তারা সড়কে গণহত্যা বন্ধে, যানজট ও দুর্ঘটনা কমানো, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। তিনি বলেন, এখন যে সড়ক আইন আছে, সেটি ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে এই সেক্টর সংস্কার কমিশন গঠন করা দরকার। তাহলেই এ বছরের তরুণদের যে অঙ্গীকার তা বাস্তবায়িত হবে। তাই সড়ক নিরাপত্তায় সংস্কার ভাবনা এখন সময়ের দাবি বলে জানান তিনি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিরাপদ সড়ক আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না সড়কে। যার জন্য সড়কে বিশৃঙ্খলা রয়েই গেছে। এখন সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য নিরাপদ সড়ক আইন কঠোরভাবে মনিটরিং করা দরকার। তাহলেই সড়ক হবে নিরাপদ বলে জানান তিনি।

সড়কে দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে শ্রমিকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা না থাকার কথা উল্লেখ করে পরিবহন নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন বলেন, একজন শ্রমিক কতক্ষণ গাড়ি চালাবেন সেটি কিন্তু ঠিক নেই। নানা চাপে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে যেতে হয়। এ ছাড়া তারা নানাভাবে বঞ্চিত। তাদের বেতন-ভাতার কোনো ঠিক নেই। নিয়োগপত্র না থাকায় নেই চাকরির নিশ্চয়তাও। যার ফলে তাদের মাথা সব সময় খারাপ অবস্থায় থাকে। সড়ক আইন মেনে যদি এসব ঠিক থাকত, তাহলে শ্রমিকরাও ভালো থাকতেন। দুর্ঘটনা কমে যেত।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়ক নিরাপদ করার বিষয়টি স্বল্পকালীন কোনো প্রকল্প নয়। ২০১৭ সাল থেকে নিরাপদ সড়ক দিবস পালন হয়ে আসছে। আগের থেকে সচেতনতা বাড়ছে। তবে সড়কে এখনো শৃঙ্খলা ফেরেনি। মূলত সেজন্য সড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। এক যুগে সড়ক নেটওয়ার্ক বড় আকারে তৈরি হয়েছে। তবে সড়ক নিরাপদ করার কাজটি দরদ দিয়ে করতে হবে। শুধু এক দিনের জন্য নয়, ৩৬৫ দিনই সড়ক নিরাপত্তার জন্য কাজ করতে হবে।

সড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ এবং দক্ষ চালক তৈরির কাজে জোর দেওয়ারও তাগিদ দেন তিনি।

এদিকে ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিবছর এই দিনটিকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালন করে আসা নিরাপদ সড়ক চাইয়ের (নিসচা) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার দিবসটিকে প্রাধান্য দিয়ে পালন করেছে। সড়ক নিরাপদ করার জন্য আমার বেশ কিছু প্ল্যান বিগত সরকারের আমলে দেওয়া আছে। সেগুলো যদি ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে সড়কে দুর্ঘটনা রোধ হবে। সেই সঙ্গে তখন এই দিবসটির সার্থকতা পাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত