শনিবার হতে যাচ্ছে ফুটবলের পালাবদলের নির্বাচন। সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি, চার সভাপতি ও ১৫ নির্বাহী সদস্য- এই ২১টি পদের জন্য ভোট যুদ্ধে নেমেছেন ৪৬জন প্রার্থী। এর মধ্যে একজন ভীষণ নির্ভার। আর কোন প্রার্থী না থাকায় সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গেছেন ইমরুল হাসান। এছাড়া বাকী পদগুলোতে হবে নির্বাচন। অথচ যারা নির্বাচনী ময়দানে লড়ছেন, তাদের একজনও আগামী চার বছরে নিজের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য কিংবা ফুটবল নিয়ে ভাবনার কথা কাউকে জানাননি। এক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম ইমরুল। ভোটের হিসেব মেলানোর তাড়া নেই। তবে দায়বদ্ধতা থেকেই তৈরী করেছেন ৪৭ পাতার এক বিশাল নির্বাচনী ইশতেহার। যার নাম দিয়েছেন ‘ফুটবল ৩৬০’। দেশের ফুটবল এগিয়ে নিতে করণীয়গুলো লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে তিনি চেষ্টা করেছেন পুরো ৩৬০ ডিগ্রি স্পর্শ করতে। তার বিশ্বাস এই ‘টনিক’ যথাযথ ব্যবহারে ফুটবলে পরিবর্তন দৃশ্যমান হবেই। দীর্ঘ দু’মাস তিনি ও তার টিম কাজ করেছে এই প্রকল্প তৈরীতে। অর্থাৎ কতটা গভীরে গিয়ে ফুটবল নিয়ে ভেবেছেন বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি!
দেশের অন্যতম বৃহত্তর শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন প্রায় তিন দশক। বড় দায়িত্বের মাঝেই ইমরুল হাসান ফুটবলকে সময় দেন আলাদা করে। তার নের্তৃত্বে বসুন্ধরা কিংস শীর্ষ ফুটবলে আবির্ভাবের পর থেকেই সেরা, টানা জিতেছে পাঁচটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। সর্বশেষ মৌসুমে ট্রেবল জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েছে কিংস। সেই সফল ক্লাবের ‘মাস্টারমাইন্ড’ ইমরুল হাসান গেলো চার বছরে সময় দিয়েছেন বাফুফেতেও। সহ-সভাপতি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিয়ে এবার সিনিয়র সহ-সভাপতি বনে গেছেন ভোটের জটিল সমীকরণ ছাড়াই।
ইমরুল তার ফুটবল ৩৬০ প্রকল্পটি ছয় বিভাগে বিভক্ত করেছেন। অর্গানাইজেশনাল, স্ট্র্যাটেজিক, অপারেশনাল, মার্কেটিং, মিডিয়া ও ইভেন্ট, ফ্যানস এবং ভলেন্টিয়ার- এই ছয় বিভাগের কর্মপরিধিগুলো তিনি স্বল্প, মধ্য, দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের একটা দিক নির্দেশনাও দিয়েছেন।
অর্গানাইজেশনাল ভাগে তিনি নির্বাহী কমিটির মাধ্যমে কি করে বাফুফে পরিচালিত হবে, তার একটা রূপরেখা দিয়েছেন। বাফুফের সংবিধান, নির্বাচনী বিধিমালা, শৃঙ্ক্ষলা নীতিমালা, মেম্বারশিপ গাইডলাইনের মতো বেশ কিছু বিষয় তিনি উল্লেখ করেছেন। বেশ কিছু নতুন স্ট্যান্ডিং কমিটি তিনি প্রস্তাব করেছেন ফিফা ও এএফসি আদলে। বাফুফে বর্তমানে যেই স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলো আছে, সেগুলো বেশিরভাগই নিস্ক্রিয় এবং আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে মানানসই নয়। তাই তিনি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানেও পরিবর্তন আনতে চান।
স্ট্র্যাটেজিক বিভাগে কোচদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ম্যানেজমেন্টের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পাতানো খেলা বন্ধে গঠিত কমিটির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে প্রকল্পভিত্তিক কাজগুলো এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাফুফের টাস্কফোর্স বিভিন্ন জেলায় গিয়ে কাজ করবে। এখানে দুটি অধ্যায়ের কথা বলেছেন তিনি। একটি ‘ওয়ান ডিসট্রিক্ট ওয়ান ক্লাব’ প্রজেক্ট। যে প্রজেক্টের আওতায় প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে ক্লাব থাকবে। যাদের ফিফা ও এএফসির গাইডলাইম মেনে ক্লাব লাইসেন্সিং করানো হয়। এভাবে ৬৪ জেলা থেকে ৬৪টি ক্লাবকে মডেল ক্লাব হিসেবে গড়ার চেষ্টা করবেন। এছাড়া সরকারের সহায়তায় আট বিভাগে আটটি ফুটবল স্টেডিয়াম বরাদ্দ নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। বাফুফের টাস্কফোর্সের আরও বেশ কিছু কাজ আছে। বিভিন্ন রিজিওনাল সেন্টার, মেডিক্যাল সেন্টার করার পরিকল্পনা উনি দিয়েছেন। এছাড়া জেলার লিগগুলো কি করে নিয়মিত করা যায় এবং অর্থবহ করা যায় তারও একটা দিক নির্দেশনা তিনি দিয়েছেন।
বাফুফে সচিবালয়কে রিফর্ম করার তরিকাটাও তিনি বাতলে দিয়েছৈণ ফুটবল ৩৬০ প্রকল্পে। বেশ কিছু বিভাগকে যুক্ত করার কথা বলেছেন। যার মধ্যে রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট ও ডাটা ডিপার্টমেন্ট অন্যতম। একটা আর্কাইভ গড়ে তোলা হবে। প্লেয়ার ও দলের ডাটা ও ইনফরমেশন নিয়ে এই বিভাগ কাজ করবে। এছাড়া রেফারি ট্রেনিং সেন্টার এন্ড এক্সিলেন্স সেন্টারের গড়ার কথা বলেছেন। আট বিভাগে আটটি রিজিওনাল অফিস গঠন করে জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কাজে সহায়তা দেওয়ার কথা আছে তার প্রকল্পে।
একটি কার্যকর মার্কেটিং টিম গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা সঙ্কট কাটিয়ে তোলায় গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এই মার্কেটিং টিম তাদের কাজগুলোকে সময় সময় সবার সামনে তুলে ধরবে। যাতে স্পন্সরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝতে পারে যে তারা সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করেছে এবং এই বিনিয়োগের ফলে তাদের সুবিধার দিকগুলো তারা জানতে পারবে। তাদের দেওয়া অর্থ কোন খাতে, কিভাবে খরচ করা হয়েছে তারও একটা ডিটেইল সেই প্রেজেন্টেশনে থাকবে।
ফুটসাল, বিচ সকার ই-ফুটবল, ভ্যাটেরানস ফুটবল আয়োজনের মাধ্যমে বড় একটা বাজার তৈরী সুযোগটা কাজে লাগানোর কথা বলেছেন ইমরুল হাসান। এ সবের জন্য ফিফা-এএফসি সার্টিফাইড স্টেডিয়াম নির্মান করে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য নিয়ৈ কাজ করার কথা বলেছেন। আগামী ৬ বছরের মধ্যে এশিয়ান কাপ বিচ সকার, আট বছরের মধ্যে বিচ বিশ্বকাপে নাম লিখানো, ফিফা ই-বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বিষয়গুলোও রয়েছে। এছাড়া নিয়ম বহির্ভূত খ্যাপ খেলাকেও একটা নীতিমালার মধ্য আনতে চান গ্রামে গঞ্জে ফুটবলের জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা করে। মিডিয়ার সঙ্গে দূরত্ব ঘোঁচানো, ফুটবলের কাজে তাদের সম্পৃক্ত করা, ফ্যানদের মেম্বারশিপের আওতায় আনা, তাদের নিয়ে বার্ষিক ফোরাম আয়োজন করার কথাও বলেছেন তিনি।
তবে এই প্রকল্পে ইমরুল হাসান সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে। সরকারের সহায়তা ছাড়া ফুটবলের উন্নয়ন অসম্ভব মেনেই তিনি চান পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে কাজ করতে। যাতে দু’পক্ষই দিন শেষে লাভবান হয়। সরকারের সঙ্গে কোন সংঘাতে না গিয়ে কী করে জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও ক্রীড়া সংস্থাগুলো এক হয়ে কাজ করতে পারে সেদিকটা জোড় দেওয়ার কথা বলেন। পাশাপাশি ফুটবলের মাধ্যমে সরকারের সামনে যাতে একটা স্পোর্টস ডিপ্লোমেসির পথ তৈরী হয় সেদিকে নজর দেয়ার কথা বলেন তিনি। যাতে বাফুফেকে ব্যবহার করে সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করতে পারবে। স্ট্যান্ডিং কমিটি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, বাফুফের স্বচ্ছ্তা, এথিকস, সততার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা, সর্বপোরি ফুটবলের মাধ্যমে কর্মসংস্থার সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটানোর কথাও বলা আছে ফুটবল ৩৬০-তে।
রানিংমেট হিসেবে ইমরুল হাসান কিন্তু সভাপতি নির্বাচিত হতে যাওয়া তাবিথ আউয়ালের কাজটা শুরুতেই সহজ করে দিলেন এই ফুটবল ৩৬০ ‘টনিকের’ মধ্য দিয়ে। এখন দেখার, তরুণ তাবিথ পরীক্ষিত ইমরুলের মস্তিস্কে আস্থা রাখেন কী না?
সবাইকে সাকিব ভাইয়ের পাশে থাকা উচিত: মিরাজ
পরাজয়ের পর শান্ত কোথায় গেলেন?
সাকিব ভাই উনার জায়গায়, আমি আমার জায়গায়: মিরাজ
গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেন খালেদা জিয়াসহ ৩ জন