কথায় কথায় পুলিশ হেনস্তা

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:০৭ এএম

রাজধানীসহ সারা দেশে পথে-ঘাটে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন পুলিশের বিভিন্ন সদস্যরা। গত সরকারের দোসর হিসেবে পরিচয় দিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণও করা হচ্ছে। কেউ কেউ গায়ের জোর খাটিয়ে, আবার কেউ বলছেন, এতদিন নির্যাতন করছে, এখন তো একটু হেনস্তার শিকার হবেই। অন্যায় করেও আবার পুলিশকেই দোষারোপ করছেন অনেকে। দেশের চলমান পরিস্থিতিতে কেউ মানছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৃঙ্খলা।

সড়কে উল্টো পথে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ট্রাকসহ নানা যানবাহন চলাচল করছে। তাদের আটক করে উল্টো পথে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেও পুলিশ সদস্যর ওপর চড়াও হচ্ছেন অনেকে। আবার সভা-সমাবেশে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে দায়িত্ব পালন করতে এলে হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। আসামি গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হেনস্তার শিকারও হন পুলিশ সদস্যরা। প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের হেনস্তার ভিডিও। হেনস্তার বিষয়গুলো নিয়ে দুঃখ প্রকাশও করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, বিগত দিনের পুলিশিং সেবায় এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেনের খবর এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে, পুলিশের ওপর মানুষের রাগ, ক্ষোভ ও ঘৃণা তৈরি হয়েছে। একটা সময় পুলিশই অর্থের বিনিময়ে অপরাধের সুযোগ করে দিয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর পুলিশের সেই আগের অবস্থান নেই। রয়েছে নৈতিক সংকটেও। তাই অন্যায়কে অন্যায় বলে বাধা দিলেও চড়াও হচ্ছে, পুলিশ সদস্যকে লোক-সমাজে হেনস্তা করা হচ্ছে।

এমন অবস্থা থেকে বের হতে পুলিশের করণীয় কী এমন প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, এই বিষয়টি রাতারাতি ঠিক হবে না। পুলিশকে জনগণের কাছে গিয়ে কাজ করতে হবে। নৈতিকভাবে আইনের মধ্যে দিয়ে পুলিশিং সেবা দিতে হবে। তাহলে একটা সময় পুলিশ তার সম্মানে ফিরে আসবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গত বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ের দিকে টাইলস ভর্তি একটি পিকআপ ভ্যান কাঁঠাল বাগান রোড থেকে উল্টো পথে আসছিল। এমন সময় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্য আমীরুল ইসলাম হাত দিয়ে সিগন্যাল দেন। উল্টো পথে এলে রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়। কেন উল্টো পথে আসছে এমন প্রশ্ন করলে পিকআপ ভ্যানের চালক উল্টা-পাল্টা কথা বলেন। ট্রাফিক সদস্যর ওপর চড়াও হন। পিকআপ ভ্যানের ওপরে থাকা তিন-চারজন লোকও নেমে আসেন। ট্রাফিক পুলিশের ওই কর্মকর্তা তখনও বুঝিয়ে কথা বলছিলেন। কিন্তু ওই পিকআপ ভ্যানে থাকা সবাই নেমে পুলিশের সঙ্গে তর্কে লেগে যান। এর মধ্য একজনের ধাক্কায় ট্রাফিকের ওই পুলিশ সদস্যের পোশাক ছিঁড়ে যায়। রাস্তায় ভিড় জমতে থাকে মানুষের। ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে এমন তর্কবিতর্ক দেখছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন। দায়িত্বরত আশপাশের ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা এলেও যেন ছাড় দিচ্ছে না পিকআপ ভ্যানের লোকজন। কেন তাকে থামতে বলা হলো এটাই যেন ট্রাফিক পুলিশের অন্যায় হয়ে গেছে!

এমন ঘটনার বিষয়টি জানতে চাইলে ট্রাফিক সদস্য আমীরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সড়কে দায়িত্ব পালন করি। যানজট মুক্ত রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক সময় উল্টো পথে পিকআপ ভ্যান, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও রিকশা চলে আসে। এদের ক্ষেত্রে রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়। তাই পিকআপ ভ্যানটি উল্টো এলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি। এতে ওই পিকআপ ভ্যানের চালকসহ পাঁচ-ছয়জন আমার ওপর চড়াও হয়, ধাক্কা দেয়, আমার পোশাক ছিঁড়ে ফেলে। উল্টো পথে এসে অন্যায় করছে, আবার আমাকে হেনস্তাও করছে। পুলিশ মানুষের জন্য কাজ করে। পুলিশ যদি এমন হেনস্তার শিকার হয় তাহলে এক সময় জনগণের ওপর আরও খারাপ কিছু এসে ভর করতে পারে।’

গত মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে মোতায়েন করা হয় পুলিশ। রাত ৯টা ৪৫মিনিটে পুলিশের ৪০-৫০ জনের একটা দল এলে তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। পুলিশ আক্রমণাত্মক না থাকলেও তাদের দেখা মাত্র হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় পুলিশের ২৫ সদস্য আহত হয়েছেন। হামলার মুখে কয়েকজন পুলিশ সদস্য অস্ত্র ফেলে চলে যান। পরে আন্দোলনকারীরা অস্ত্রগুলো সেনাবাহিনীর কাছে জমা দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিগত দিনের পুলিশিং সেবা নিয়ে বর্তমান সময়ের পুলিশ সদস্যদের তুলনা করলে হবে না। কিন্তু প্রায়ই দেখা যাচ্ছে আগের দিনগুলোর কথা বলে পুলিশদের হেনস্তা করা হচ্ছে। আইনের মানুষদের যদি হেনস্তার শিকার হতে হয় তাহলে দেশে শৃঙ্খলা ফিরবে কীভাবে? তাই বিগত দিনের কথা ভুলে পুলিশকে সহযোগিতা করে তাদের কাজকে এগিয়ে নিতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মাদ তালেবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিগত সময়ের পুলিশিং সেবা এবং ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্নের শিকার হচ্ছেন বর্তমান পুলিশ সদস্যরা। অন্যায় করেও পুলিশের বিগত দিনের কথা উল্লেখ করে তাদের হেনস্তা করা হচ্ছে। পুলিশের পোশাকের ওপর রাগ বা ঘৃণা না করে ব্যক্তির ওপর রাগ বা ঘৃণা করতে হবে। অন্যায় করলে পুলিশ সাজা দেবে, আর নিরপরাধ মুক্ত হলে তাদের ছেড়ে দেবে। শুধু পুলিশের ওপর চড়াও হলেই হবে না, সবার সমন্বয়ে পুলিশের কাজে সহযোগিতা করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত