ছবি তোলা কিংবা দল বেঁধে ঘোরার ভান করে চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে অবস্থান নেয় তারা। নিশানা করে মোটরসাইকেল আরোহীদের। প্রথমে উড়ালসড়কের একপাশের রেলিংয়ে নাইলন সুতার বেঁধে দেয়। কোনো বাইক আরোহী কাছাকাছি আসলেই সুতার অন্য পাশ শক্তভাবে বেঁধে দেওয়া হয় উড়ালসড়কের অন্যপ্রান্তের রেলিংয়ে। এরপর র্যাম্পের ভেতর লুকিয়ে থাকে তারা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গলায় সুতা প্যাঁচ লেগে উড়াল সড়কে পড়ে যান বাইক আরোহী। আর এ সুযোগে র্যাম্পের ভেতর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র ‘দুর্ঘটনায়’ পতিত হওয়া বাইক আরোহীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় সর্বস্ব।
গত শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আগ্রাবাদ অংশে নাইলন সুতার ফাঁদে পড়ে গুরুতর আহত হন সুজন তঞ্চঙ্গ্যা নামে চাকরিজীবী এক যুবক। একই ঘটনায় সুজনের মোটরসাইকেলটির সামনের চাকা ভেঙে আলাদা হয়ে যায়। তবে নগরের উড়াল সড়কে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। গত ১৮ অক্টোবর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে সুতার ফাঁদে পড়ে আহত হন সাইদুর রহমান আরেক মোটরবাইক আরোহী। এর আগে নগরের আখতারুজ্জামান উড়াল সড়কেও একইরকম একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশের নজরদারি না থাকায় চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ছিনতাইয়ের অন্যতম স্পট হিসেবে পরিণত হচ্ছে। তবে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রকে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান মিয়া।
নাইলন সুতার ফাঁদে পড়ে আহত হওয়া বাইক চালক সুজন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গার দিকে যাচ্ছিলাম। আগ্রাবাদ এলাকা অতিক্রম করার পর হঠাৎ গাড়ি থেকে পড়ে যাই। পড়ে গিয়ে দেখি চিকন নাইলনের সুতা গলায় লেগে আছে। গলায় হাত দিয়ে দেখি রক্ত ঝরছে। বাইকের সামনের চাকা ভেঙে আলাদা হয়ে গেছে। বাইকে আমার সঙ্গে বন্ধু উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা ছিলেন। সুতার ফাঁদে পড়ে মারাও যেতাম। তবে সৃষ্টিকর্তা রক্ষা করেছে।’
তার বন্ধু উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘আমরা বাইক থেকে ছিটকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে পড়ে গেলে পাশ থেকে কিশোর বয়সী দুজন আমাদের দিকে আসতে দেখি। তবে এ সময় আমাদের পেছন থেকে আরও কিছু বাইক আসতে দেখে ওই দুই কিশোর দ্রুত সেখান থেকে সরে যায়। আমার ধারণা, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে পরিকল্পিতভাবে নাইলন সুতা বেঁধে রাখা হয়েছিল। দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তির টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়ে সটকে পড়ে অপরাধচক্র। সুতার ফাঁদ পাতার পর উড়াল সড়কের র্যাম্পের ভেতর লুকিয়ে থাকে অপরাধচক্রের সদস্যরা।’
এর আগে গত ১৮ অক্টোবর একইভাবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ঘটনার শিকার হন সাইদুর রহমান নামে আরেক চাকরিজীবী। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পতেঙ্গা থেকে ওঠেন লালখান বাজার আসার জন্য। কিছুদূর আসার পর পতেঙ্গা মহাজনঘাটা এলাকায় ধারালো সুতা গলায় আটকে আহত হন তিনি। তিনিও ওই সময় আশপাশে কয়েকজন কিশোরকে দেখেছেন। আশপাশে যানবাহন থাকায় তিনি ছিনতাইয়ের হাত থেকে বেঁচে যান। তবে এ ঘটনায় তিনি থানায় কোনো মামলা করেননি।
জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রায়হান নামে এক যুবক পাঁচলাইশ অংশের উড়াল সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হন। এর আগেও অসংখ্যবার পথচারীরা এ চক্রের হাতে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। সেদিন রায়হান তার মোটরসাইকেল নিয়ে নগরের মুরাদপুর থেকে জিইসি মোড় যাচ্ছিলেন। উড়াল সড়কের মাঝামাঝি পৌঁছলে তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন। অপরাধচক্রের সুতার তৈরি মরণফাঁদে পড়ে তিনি আহত হন। ধারালো সুতায় তার গলা কেটে রক্তক্ষরণ হয়।
নগরের উড়াল সড়কে ‘নাইলন সুতার ফাঁদ’ পেতে সর্বস্ব লুটের চেষ্টার ঘটনার প্রেক্ষাপটে ‘মোটরসাইকেল পার্টস’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গত ১৯ অক্টোবর তাদের ভেরিফাইড ফেসবুকে ‘বাইকারদের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা!’ শীর্ষক একটি পোস্ট দেন। এতে তারা লেখেন ‘নির্জন জায়গা দেখে দুই পাশের রেলিংয়ে বেঁধে রাখা হয় নাইলনের সুতা, যা ছুটে চলা বাইকচালকদের নজরেই পড়ে না। এমনই সুতার ফাঁদে আটকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পতেঙ্গা থেকে আসার সময় ভাগ্যক্রমে বড় দুর্ঘটনার থেকে রক্ষা পেলেন সাইদুর রহমান সাকিব নামে একজন। তবে ঘাড় ও মুখে বেশ কিছু অংশে কেটে গেছে তার। এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারে নির্জন এলাকায় সাবধানে চলুন, কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের উচিত গাড়ি ছাড়া যারা হাঁটাহাঁটি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। গাড়ি দাঁড়ানো এবং গাড়ি ছাড়া এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারে হাঁটাহাঁটি সম্পূর্ণ বন্ধ করা।’
