প্রায় মাস সাতেক পর চট্টগ্রামে আবার টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ, চলতি পঞ্জিকাবর্ষে দেশের মাটিতে এটাই বাংলাদেশ দলের সবশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। চেন্নাই থেকে কানপুর হয়ে মিরপুর, রানখরায় ভুগতে থাকা বাংলাদেশ দলের জন্য চট্টগ্রামের উইকেট হতে পারে মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতোই উপভোগ্য। কারণ জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেট ব্যাটসম্যানদের দিকে বাড়িয়ে রাখে সহযোগিতার হাত। কিন্তু লাখ টাকার প্রশ্নটা হচ্ছে, এই সুবিধাটা কি নিতে পারবেন আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে থাকা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা, নাকি এই সুযোগে প্রোটিয়ারা চাপিয়ে দেবে রানের পাহাড়?
গতকাল সোমবারের অনুশীলনে নেটে মারমুখী ভূমিকায় দেখা গেছে ব্যাটসম্যানদের। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত নেটে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই সব শট খেলেছেন, মাঝব্যাটে লাল বলটা খেলার ছন্দময় শব্দ নিশ্চয়ই তাকে দিয়েছে প্রেরণা। এখানে বল থেমে আসে না, হঠাৎ লাফায়ও না। ব্যাটসম্যানদের শট খেলার আত্মবিশ্বাসটাও তাই তৈরি হয়। গত ১২ মাসে বাংলাদেশ দল দেশের মাটিতে যতগুলো টেস্ট খেলেছে, তার ভেতর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ, ৩১৮ রান করেছিল চট্টগ্রামেই। প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলঙ্কা। সময়ের ব্যাপ্তিটা আরেকটু বড় করলে দেখা যাবে, ২০২২ সালে এই মাঠেই ভারতের বিপক্ষে ৩২৪ রান করেছিল বাংলাদেশ। যদিও মুদ্রার উল্টোপিঠে ১৭৮ এবং ১৫০ রানে অলআউট হওয়ার দৃষ্টান্তও আছে। তবুও চট্টগ্রামের রানপ্রসবা উইকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে বড় ইনিংসের প্রত্যাশা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, ব্যাটসম্যানদের পক্ষ থেকেও উইকেটের অজুহাতে পার পেয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। যে অভিযোগটা ঢালাওভাবে করা হয় মিরপুরের উইকেট এবং কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার দিকে।
উইকেট ব্যাটিং সহায়ক হলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকেও যে ভালো ইনিংসের দেখা মেলে তার প্রমাণ রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট। মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজদের ব্যাটে দেখা গেছে চমৎকার কিছু ইনিংস। কিন্তু স্থান-কাল-পাত্রভেদে হতাশ করে চলা টপ অর্ডার নিয়ে শঙ্কা এখনো মজুদ। সাদমান ইসলাম প্রায় বছর দুয়েক পর টেস্ট দলে ফিরে পাকিস্তানে একটা বড় ইনিংস খেলেছেন ৯৩ রানের, এরপর থেকেই তার ব্যাট কথা বলছে না। কানপুরে যদিও একটা হাফসেঞ্চুরি আছে, তবে তাতে সাফল্যের চেয়ে ব্যক্তিগত মাইলফলক স্পর্শের পর উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসার ব্যর্থতাই প্রকট। ঢাকা টেস্টে শূন্য এবং এক রান করা সাদমানের জন্য এই টেস্টটা হয়তো একাদশে টিকে থাকারও পরীক্ষা। খারাপ করলে নাম কাটা যেতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকে। চোট থেকে সেরে উঠে দলে ফিরে মাহমুদুল হাসান জয় ঢাকায় করেছেন ৩০ এবং ৪০। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ক্রিকেটারের মতোই বাদ পড়ার পর কামব্যাক ম্যাচে তিনি ভালোই করেছেন সতীর্থদের চেয়ে, তবে দুটো ইনিংসই ভালো শুরুর পর পথভ্রষ্ট হওয়ার দোষে দুষ্ট।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত চেন্নাইতে দ্বিতীয় ইনিংসে ৮২ রান করেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছেন সংবাদ সম্মেলনে। তবে পূর্ণ মেয়াদে অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর ১৩ ইনিংসে এটাই তার সর্বোচ্চ এবং একমাত্র ৫০ ছাড়ানো ইনিংস। এই পরিসংখ্যান মাথায় রেখেই কি অধিনায়কত্ব ছাড়তে চাইছেন শান্ত? পাকিস্তান সফরে যাওয়ার আগে চট্টগ্রামেই বাংলাদেশ টাইগার্সের হয়ে দীর্ঘদিন অনুশীলন করেছিলেন মুমিনুল হক ও মুশফিকুর রহিম। দুজনেরই এই মাঠে আছে সুখময় সব স্মৃতি। মুশফিকের ১১ টেস্ট সেঞ্চুরির দুটোই চট্টগ্রামে, মুমিনুল তার ১৩ টেস্ট সেঞ্চুরির সাতটিই করেছেন এই সাগরিকা স্টেডিয়ামে। পয়মন্ত এই মাঠে আরেকবার হাসবে কি তাদের ব্যাট?
ক্রমেই অলরাউন্ডার হয়ে ওঠা মেহেদী হাসান মিরাজ ঢাকা টেস্টে তিন রানের জন্য সেঞ্চুরি পাননি, তার টেস্ট ক্যারিয়ারের একমাত্র সেঞ্চুরি এই চট্টগ্রামেই। এই মাঠে খেলা সবশেষ টেস্টেও আছে অপরাজিত ৮১ রানের ইনিংস। চট্টগ্রামে খেললে ব্যাটিং গড়টাও বেড়ে যায় লিটন দাসের। ক্যারিয়ার গড় ৩৪.৬১ আর চট্টগ্রামে খেলা আট টেস্টে তার ব্যাটিং গড় ৪৫.৬৪। এই মাঠে তার একটি সেঞ্চুরি আর পাঁচ হাফসেঞ্চুরি।
এই পরিসংখ্যান যদি আশার আলো জ¦ালায়, তাহলে প্রোটিয়াদের সামনে ফ্লাডলাইট হয়ে জ¦লজ¦ল করবেন গ্রায়েম স্মিথ ও নিল ম্যাকেঞ্জি। ২০০৮ সালে এই মাঠে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম উইকেটে ৪১৫ রানের রেকর্ড জুটি গড়েছিলেন সে সময়কার দুই প্রোটিয়া ওপেনার। প্রথম দিনে কোনো উইকেটই ফেলতে পারেননি বাংলাদেশের সাকিব-মাশরাফি-শাহাদাত-রফিক-রাজ্জাকরা মিলে। প্রথম উইকেটের পতন দ্বিতীয় দিনে, ১০৭ নম্বর ওভারের খেলায়! এই মাঠেই কুমার সাঙ্গাকারা করেছেন ৩১৯ রান, ক্যারিয়ারের একমাত্র ট্রিপল সেঞ্চুরি। নাইটওয়াচম্যান হিসেবে নেমে জেসন গিলেস্পির ডাবল সেঞ্চুরি, অভিষেকেই কাইল মেয়ার্সের সেই ইতিহাসগড়া ডাবল সেঞ্চুরি সবকিছুর সাক্ষী জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামের ২২ গজ। তাই প্রতিপক্ষের এইডেন মার্করাম, ট্রিস্টান স্টাবস কিংবা ডেভিড বেডিংহ্যামের মতো কেউ যদি এই উইকেটে একবার জমে যান, তাকে আউট করাটাও কিন্তু তখন হয়ে উঠবে দুঃসাধ্য।
উইকেট রানস্বর্গ হলেও প্রায়ই দেখা যায় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ভালো শুরুর পরও আটকে যান পঞ্চাশ থেকে ষাটের ঘরে, যেখানে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানরা সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ইনিংসটা বড় করে নিয়ে যান তিন অঙ্কের ঘরে। এখানেই তৈরি হয় ব্যবধান। তাই তো রানের স্বর্গে এসেও দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ে না বাংলাদেশের।
