ব্যাটিং স্বর্গে দুঃস্বপ্নের ফিল্ডিং

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:০৪ এএম

হুট করে দেখলে মনে হবে, অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস বাম হাতে ব্যাট করছেন! দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান টোনি ডি জর্জির লম্বা চুল আর শারীরিক অবয়ব মিলিয়ে অনেকটাই প্রয়াত অস্ট্রেলিয়ান অলরাউন্ডারের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলতে পারেননি ডি জর্জি, টেস্টের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হলেও ছিল না যে কোনো সেঞ্চুরি। তিন অঙ্কে পৌঁছানোর পর চেলসির ফুটবলার কোল পালমারের মতো করে উদযাপনের ভঙ্গিমার ছবিটা অন্তর্জালে যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে টোনি ডি জর্জিকে মনে রাখতেই হবে। চট্টগ্রামে প্রথম দিনের খেলা শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ২ উইকেটে ৩০৭ রান, তাতে ডি জর্জির একারই অবদান ১৪১*। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতকের দেখা পাওয়ার পরই বোল্ড হয়ে যাওয়া ট্রিস্টান স্টাবস আর ডি জর্জি মিলেই প্রথম দিনে প্রোটিয়াদের নিয়ে গেছেন বড় সংগ্রহের পথে। তাদের এই কৃতিত্বে অবশ্য বড় ভূমিকা বাংলাদেশের ফিল্ডারদের। ক্যাচ ফেলা, স্টাম্পিং মিস, রানআউটের সুযোগ হাতছাড়া...সম্ভাব্য সবকিছুই করেছেন। তাতেই ক্যারিয়ারের প্রথম শতকের দেখা পেয়েছেন টোনি ও স্টাবস।

টস জিতে ব্যাটিং নিয়েছেন এইডেন মার্করাম, চট্টগ্রামে এটাই প্রত্যাশিত। অপ্রত্যাশিতভাবে টেস্ট অভিষেক হয়ে গেছে মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনের। জাকের আলি অনিকের মাথায় চোট আর লিটন দাসের জ্বর, উইকেটের পেছনে একজোড়া হাত তো লাগবেই। তাই জাতীয় লিগে খেলার মাঝপথে চট্টগ্রামে এসে উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছে অঙ্কনকে। হয়তো এই জন্যই উইকেটের পেছনে ছিলেন আড়ষ্ট, দিনের সপ্তম ওভারে তাইজুল ইসলামের বলে ডি জর্জির ক্যাচটাই ছেড়েছেন বাংলাদেশের উইকেটরক্ষক। জর্জি অবশ্য আরেকবার সুযোগ দিয়েছেন পঞ্চাশ ছাড়াবার পর, এবার হাসান মাহমুদের বলে সিøপে ক্যাচ ছেড়েছেন সাদমান ইসলাম যা রাওয়ালপিন্ডি থেকেই নিয়মিত দৃশ্য। স্কয়ার লেগে একটা ক্যাচ জমাতে পারেননি জাকির হাসানও, বল পড়েছে তার সামনে। ব্যাটিং স্বর্গে একজন ব্যাটসম্যানকে যদি এভাবে একের পর এক ‘জীবন’ উপহার দেওয়া হয়, তাহলে তার ইনিংসটা তো বড় হবেই। হয়েছেও তাই। দিনশেষে ডি জর্জি ২১১ বল খেলে ১৪১ রানে অপরাজিত, ১০টা চারের পাশাপাশি মেরেছেন ৩ খানা ছক্কাও।

ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন স্টাবসও। টি-টোয়েন্টি ধাঁচের এই ব্যাটসম্যানকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ থেকেই ওয়ান-ডাউনে খেলাচ্ছে প্রোটিয়ারা। ২০-৩০ রানের ভেতরেই আটকে যাচ্ছিলেন স্টাবস, বড় হচ্ছিল না ইনিংসগুলো। ৮ ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি ছিল মাত্র একটা। চট্টগ্রামের ব্যাটিং স্বর্গে সেঞ্চুরি তুলে নিলেন স্টাবস, যদিও ২৫ রানে তাকে স্টাম্পড করার সুযোগটাও হাতছাড়া করেছেন অঙ্কন। ৬ বাউন্ডারি আর ৩ ছক্কায় ১০০ রানের ইনিংসটা সাজানোর পর তাইজুলের সোজা আসা ডেলিভারিতে আড়াআড়ি ব্যাট চালাতে গিয়ে বোল্ড হয়ে যান এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। তাইজুলের আরেক শিকার প্রোটিয়া অধিনায়ক এইডেন মার্করাম, ৩৩ রান করার পর তাইজুলের বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে তুলে মারতে গিয়ে মিড অনে তুলে দেন মুমিনুল হকের হাতে। গোটা দিনে ৮১ ওভার বোলিং করে এই দুটোই উদযাপনের মুহূর্ত এসেছে বাংলাদেশের, বাকি সময়টা শুধুই খাটুনির। ক্যাচ ফসকেছে, স্টাম্পিং মিস হয়েছে, রানআউটে চেষ্টায় সরাসরি থ্রো লাগেনি স্টাম্পে...এমন সব হতাশার মুহূর্তগুলো লবণ ছিটিয়েছে হতাশার ক্ষতে।

বাংলাদেশের কোচ ফিল সিমন্স দিনের খেলার শেষে বললেন, এমনটা হবে সেটা জানাই ছিল, ‘আমি হতাশ এ কথা বলব না। অসাধারণ একটা ব্যাটিং উইকেট, বোলাররা খেটেছে এবং ভালো বল করেছে। বেশ কিছু সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে, দিনশেষে উইকেটের সংখ্যাটা চার কিংবা পাঁচ হতে পারত। কঠিন একটা দিন গেছে। আমি কঠিন দিনে মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখেছি, যখন আগে এখানে এসেছিলাম (ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে), তাই আমি বলব যে হতাশাগ্রস্ত নই।’ দায়িত্ব পাওয়ার পর মাত্রই দ্বিতীয় টেস্ট, সিমন্স জানালেন এখনো দেখছেন খেলোয়াড়দের, ‘এই ম্যাচে অভিজ্ঞতা একটু বেড়েছে। প্রথম ম্যাচটা তো আসার পরপরই হলো, এখন খেলোয়াড়দের একটু একটু করে বুঝতে শুরু করেছি।’

প্রথম দিনেই বড় রান করে প্রতিপক্ষ ব্যাকফুটেই ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশকে, অবশ্য চট্টগ্রামে যে রান উৎসব হবে সেটা অনুমিতই। সিমন্স বললেন দলের ভেতর এখন কাল (আজ) সকালে যত দ্রুত প্রোটিয়াদের বাকি উইকেট তুলে নেওয়ার তাগিদ, ‘দলের ভেতরের আলাপ হচ্ছে, কাল সকালে এসে যত দ্রুত সম্ভব কিছু উইকেট নিতে হবে যাতে ওদের অলআউট করার একটা সুযোগ তৈরি হয়। আমি পাকিস্তানে দেখেছি একটা দল প্রথম ইনিংসে ৫৫০ করার পর আরেক দল ৮০০ রান করেছে এবং সেই ম্যাচে ফলও এসেছে। জেতাটা সবসময়ই লক্ষ্য, তবে আপাতত আমরা এই দিনটা নিয়েই ভাবছি। দেখব কীভাবে কী করলে কালকের ফলটা ভিন্ন হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত