যার হাত ধরে শহর-গ্রামে সন্ত্রাস

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:১০ এএম

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে যশোরের মোড়ে মোড়ে ছিল এক-একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের আধিপত্য। দখলদারি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মাদক কারবার ও খুনের মতো গুরুতর সব অপরাধ ছিল এসব গ্রুপের নিত্যদিনের কারবার। চাঁদাবাজির সর্বনিম্ন দর ছিল ১০ টাকা, যা নেওয়া হতো ইজিবাইকের চালকদের কাছ থেকে। তবে চাঁদার টাকার সর্বোচ্চ কোনো সীমা ছিল না। জমি বেচতে চাঁদা, কিনতে চাঁদা, বাড়ি তৈরিতে চাঁদা এবং ইট, খোয়া ও বালু বিক্রির নামেও চলত চাঁদাবাজি। এই চাঁদাবাজদের কবল থেকে বাদ পড়েননি সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা, এমনকি পুলিশ সদস্যরাও। জমি, বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করে নেওয়ার অসংখ্য নজির আছে এসব বাহিনীর বিরুদ্ধে। আর এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের সবই হতো আওয়ামী লীগ নেতা শাহীন চাকলাদারের নামে। চাঁদাবাজি তো নস্যি, খুনের মতো ঘটনা ঘটিয়েও সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর সদস্যরা আশ্রয়-প্রশ্রয় পেতেন শাহীন চাকলাদারের। এসব সন্ত্রাসী গ্রুপ পুষে শাহীন চাকলাদার এখন কয়েকশ কোটি টাকার মালিক। তবে শুধু যে তিনিই অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন তা নয়, বাহিনীগুলোর প্রধানদের কারও কারও সম্পদও কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

যশোর জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কখনো ইতিবাচক বা ভালো কোনো ঘটনায় নাম উচ্চারণ হয়নি শাহীন চাকলাদারের। নিজের মহল্লা যশোর শহরের পুরাতন কসবা থেকে শুরু হয় তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। এ মহল্লায় একসময় চাকলাদার বাহিনী ও ঢোল রফিক বাহিনীর বোমাবাজি এবং গোলাগুলিতে আতঙ্কে থাকতেন স্থানীয়রা। এরপর যখন শাহীন চাকলাদার জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন, সেই সন্ত্রাস সংক্রমিত হয় দলে। নিজের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুধু অসৌজন্যমূলক আচরণই নয়, হামলা-মারধরের ঘটনা ঘটিয়েছেন বহুবার। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ক্রমেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে কোণঠাসা হয়ে পড়েন শাহীন চাকলাদারের পেশিশক্তির কাছে। একপর্যায়ে জ্যেষ্ঠ ওই নেতারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন দলীয় কর্মকাণ্ডেও। যার ফল হিসেবে সন্ত্রাসনির্ভর দলে পরিণত হয় যশোর জেলা আওয়ামী লীগ।

ভুক্তভোগীরা বলেন, যেখানেই শাহীন চাকলাদারের পা পড়েছে, সেখানেই সংক্রমিত হয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। আধিপত্য তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসী ও মাদকাসক্তদের। যশোর জেলা সদর থেকে ক্রমেই তা ছড়িয়েছে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে। তিনি যখন কেশবপুর থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) হন, তখন যশোর শহরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংক্রমিত হয় সেখানেও। অবশ্য তার এমন কর্মকাণ্ডের যথাযথ জবাব দিয়েছে কেশবপুর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা গত সংসদ নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে অন্য কোনো দল অংশ না নেওয়ায় প্রার্থী যেমন ছিলেন আওয়ামী লীগের, তেমনি ভোট দিতেও এসেছিলেন একই দলের ভোটাররা। সেখানে নৌকা প্রতীক পেয়েও স্বতন্ত্র প্রার্থী দলীয় এক যুবকের কাছে শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয় শাহীন চাকলাদারকে।

টাকার জন্য হেন কোনো কাজ নেই, যা তিনি করেননি। যশোরে মদের বার ও ডিজে পার্টির আসর বসিয়ে শহরে ছড়িয়েছেন বিশৃঙ্খলা।

সন্ত্রাসীদের আশ্রয়দাতা শাহীন চাকলাদারকে গত ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে আর দেখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে তার সম্পদের অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

শাহীন চাকলাদার ২০০৪ সাল থেকে যশোর জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। ২০০৯-২০ সাল পর্যন্ত ছিলেন যশোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুর পর যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনটি শূন্য হলে ২০২০ সালের ১৪ জুলাইয়ের উপনির্বাচনে সেখান থেকে এমপি হন। সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও নিজ দলীয় বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে শোচনীয় পরাজয় বরণ করেন।

তবে এই দীর্ঘ সময়ে শাহীন চাকলাদার যশোর আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন। রাজনীতিতে অভিষেক হওয়ার আগে মূলত ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনুসারীদের দাবি, চাকলাদার পরিবহন শাহীন চাকলাদারের পারিবারিক ব্যবসা। দেশ স্বাধীনের পর থেকে তারা এ ব্যবসা করে আসছেন। মূলত পরিবহন ব্যবসা দিয়েই চাকলাদার পরিবার যশোরে পরিচিতি পায়। তার বাবা প্রয়াত আবদুল মান্নান চাকলাদার ছিলেন তহসিলদার।

পরিবহন ব্যবসার পাশাপাশি ঠিকাদারিতে সম্পৃক্ত হন শাহীন চাকলাদার। এর পাশাপাশি যশোর শহরের এমএম আলী রোডে জামান ফার্মেসি নামে একটি ওষুধের দোকান পরিচালনা করতেন। তখন তাদের জীবনযাপন সাদাসিধে থাকলেও আওয়ামী রাজনীতিতে প্রবেশ করে সবকিছু রাতারাতি বদলে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৬ বছরে শাহীন চাকলাদারের সম্পদ বেড়ে যেন আকাশ ছুঁয়েছে।

যশোর আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতাকর্মী জানান, ২০০৩ সালে জেলার আহ্বায়ক কমিটিতে স্থান পেয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন শাহীন চাকলাদার। এর এক বছর পরই জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়ে দলে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে ওঠেন। শহর ও আশপাশের এলাকায় গড়ে তোলেন ছোট ছোট সন্ত্রাসী গ্রুপ। এ গ্রুপগুলো শাহীন চাকলাদারের হয়ে পরিচালনা করতেন তারই চাচাতো ভাই সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সদর উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদ চাকলাদার ফন্টু, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শাহারুল ইসলাম, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ার হোসেন বিপুল, যশোর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন সুমন এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রওশন আলী শাহীসহ আরও কয়েকজন। এসব সন্ত্রাসী গ্রুপ দিয়ে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ঘের দখল, জুয়ার আসর দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে কোটি কোটি টাকা আয় করতে থাকেন শাহীন চাকলাদার।

সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য নিজ দলে সমালোচিত ছিলেন শাহীন চাকলাদার। যে কারণে কয়েক দফা দলের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ-গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। দলের অভ্যন্তরে এমন শক্ত বলয় তৈরি করেন যে তার অন্যায়ের প্রতিবাদ পর্যন্ত কেউ করতে সাহস পাননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোর আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাহীন চাকলাদারের কাছে নিজ দলের নেতাকর্মীরাও নিরাপদ ছিলেন না। দলের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতেন না। বরং অসংখ্য নেতাকর্মী তার ও তার বাহিনীর লোকজনের কাছে অপমান-অপদস্থ হয়েছেন। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা খালেদুর রহমান টিটো, আলী রেজা রাজু, অ্যাডভোকেট শরীফ আব্দুর রাকিবের মতো বর্ষীয়ান নেতারাও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর আক্রোশের শিকার হয়েছেন। সাবেক সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদের সঙ্গে তার ছিল সাপে নেউলে সম্পর্ক।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৪ সালে শাহীন চাকলাদার যখন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন, তখন তার জমা দেওয়া হলফনামায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ উল্লেখ ছিল ১৪ কোটি টাকা, যা মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ কোটি টাকা। অল্প সময়ে বিপুল এই সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি সে সময়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে এলেও শাহীন চাকলাদারের ক্ষমতার প্রভাবের কারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার মতো কোনো উদ্যোগই নিতে পারেনি ওই সংস্থাটি। এরপর থেকে বলা চলে, শাহীন চাকলাদার শুধু যশোর শহর নয়, পুরো জেলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। নিজ দলের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীও কোণঠাসা হয়ে পড়েন শাহীন চাকলাদারের প্রভাব বলয়ের কাছে। তার আশ্রিত সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন বেশ কয়েকজন নিজ দল ও বিরোধী দলের নেতাকর্মী। সঙ্গে বিরোধী মতের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসে নানা নিপীড়ন।

শাহীন চাকলাদারের বিপুল অর্থের ভা-ার বড় হতে থাকে মূলত টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি থেকে। তার বিরুদ্ধে সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানির অভিযোগও রয়েছে। এর বাইরেও জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের সময় বিভিন্ন উপজেলার নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের কাছ থেকেও টাকা নিয়ে পদ দেওয়ার মতো ঘটনায় জড়িত ছিলেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, তার নিয়ন্ত্রিত যশোরের হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে একটি ক্যাসিনো বার ছিল। যেখানে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীরা জুয়া ও মদের আসরে অংশ নিতেন। ওই হোটেলে বসে বিভিন্ন বিচার-সালিশ ও বড় বড় মামলা মীমাংসার নামে শাহীন চাকলাদার কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নিতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

যশোর শহরের চিত্রা সিনেমা হল অনেকটা সিনেমা স্টাইলে দখল করে সেখানে গড়ে তোলেন ৫ তারকার হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনাল। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় যেখানে আগুন লেগে বহু মানুষের প্রাণ যায়।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকা এবং কেশবপুরের বিভিন্ন স্থানে শত শত বিঘা জমি রয়েছে শাহীন চাকলাদারের নামে-বেনামে। এর বাইরে রাজধানীর কলাবাগান, উত্তরাসহ একাধিক স্থানে তার নামে জমি ও ফ্ল্যাট আছে। মালয়েশিয়া, কানাডাসহ আরও কয়েকটি রাষ্ট্রে শাহীন চাকলাদারের নামে-বেনামে জমি ও বাড়ি আছে বলে জানা গেছে।

এদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ইতিমধ্যে শাহীন চাকলাদারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। গত ২২ সেপ্টেম্বর দুদকের কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশনের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শাহীন চাকলাদারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়ায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অবৈধভাবে অর্জিত জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ রয়েছে মর্মে দুদকের গোয়েন্দা তথ্যানুসন্ধানে প্রাথমিক তথ্য সঠিক পরিলক্ষিত হওয়ায় অভিযোগটি প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের জন্য কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গত ১৬ অক্টোবর শাহীন চাকলাদার, তার স্ত্রী ফারহানা জাহান মালা ও তিন সন্তানকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত