বাঁ প্রান্তের দুরূহ কোণ থেকে বাঁ পায়ের শটটা নেপাল কিপারকে পরাস্ত করে দূরের পোস্টে জড়াতেই ভোঁ দৌড়ে গ্যালারির কাছে ছুটে গেলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। বাঁ হাতের তর্জনি ঠোঁটে চেপে দশরথ রঙ্গশালার গ্যালারিকে চুপ করিয়ে দিলেন মুহূর্তে। এর পরের ১৪টি মিনিট কেটে যাওয়ার রূদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। ভারতীয় রেফারির শেষের বাঁশি বেজে উঠতেই দশরথে পিনপতন নীরবতা ভেঙে আরেকবার বিস্ফোরিত বাংলাদেশ শিবির। আরেকবার গড়া হলো ইতিহাস। ঠিক দুই বছর আগের মতো সেই স্বাগতিক নেপালকে কাঁদিয়ে বাংলাদেশ বসল দক্ষিণ এশিয়ার সেরার আসনে। ২-১ গোলের জয়ে প্রমাণ হলো, সবাইকে ছাড়িয়ে এই অঞ্চলের নারী ফুটবলে বাংলাদেশই সেরা।
নেপালের জন্য সাফটা দুঃখ হয়ে থাকছে। সেই ২০১০ থেকে ২০২৪, ১৪ বছরে হওয়া সাতটা ফাইনালে খেলেও ছোঁয়া হলো না কাক্সিক্ষত শিরোপা। প্রথম পাঁচবার পারেনি ভারত বাধা পেরুতে। আর শেষের দুবার তাদের স্বপ্নের হন্তারক বাংলাদেশ। সেটাও নিজেদের আঙিনায়।
ফাইনালটা হয়েছে ঠিক ফাইনালের মতোই। আগের ছ’বারের আক্ষেপ ঘোচাতে দুপুর পেরুতেই দশরথের গ্যালারি ভরতে লাগল নেপালি সমর্থকে। ট্যাকটিক্যাল ও টেকনিক্যাল দিক থেকে এই আসরের সেরা বাংলাদেশ। সেটার প্রমাণ মিলেছে ফাইনালে। প্রথমেই তারা নিয়ে নেয় মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ। এরপর গোছানো আক্রমণে নেপালকে চেপে ধরতে চেয়েছে তারা। নেপাল রক্ষণ সামলে চেয়েছে প্রতি-আক্রমণ নির্ভর ফুটবলে বাংলাদেশকে বিপদে ফেলতে। দুদলের কোচের দুরকম কৌশলই দারুণ কাজ করায় ম্যাচটা হয়ে ওঠে উপভোগ্য।
তবে বিরতি থেকে ফিরে চার মিনিটের ব্যবধানে দুদলই পেয়ে যায় গোলের দেখা। ৫২ মিনিটে প্রথমে মনিকা চাকমার গোলে লিড নেয় বাংলাদেশ। এর চার মিনিট পর আমিশা কারকির গোলে সমতায় ফেরে নেপাল। তবে ৮১ মিনিটে ঋতুপর্ণার অসাধারণ গোলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ঘরে তোলে বাংলাদেশ।
ক্রসবারের বাধা পড়ে গিয়েছিল প্রথমার্ধে। দুদলেরই একটি করে শট ঠেকিয়ে দেয় পোস্ট। প্রথমার্ধ থাকে গোলশূন্য। দুদলই গোলের সুযোগ পেয়েছে এবং হারিয়েছে। ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশের। নেপাল ডিফেন্ডার গীতা রানা গোল কিক করতে গিয়ে পিছলে পড়ে বল তহুরার পায়ে তুলে দিয়েছিলেন। তহুরা সুযোগ পেয়ে শটও নিয়েছিলেন। তবে পোস্টে লেগে তা ফিরে আসে। পরে তহুরার হেড সহজেই আয়ত্তে নেন নেপাল কিপার অনিলা সুব্বা। ১০ মিনিটে ভাগ্য সহায় হয় বাংলাদেশের। এবার সাবিত্রা ভান্ডারির কাটব্যাকে বক্সের বাইরে থেকে আমিশা কারকির ডান পায়ের শট ক্রসবারে লেগে ফিরলে নেপালকে হতাশ হতে হয়। ম্যাচের ২৮ মিনিটে ভান্ডারির আড়াআড়ি পাস খুঁজে পেয়েছিল আমিশাকে। তবে বল আয়ত্তে নিতে দেরি করে ফেলেন। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে নেপাল কিপারের ক্লিয়ারেন্স ভালো জায়গায় পেয়েও পোস্টে রাখতে পারেননি মনিকা চাকমা।
বিরতি থেকে ফিরে বাংলাদেশ তাদের খেলায় পরিবর্তন আনেনি। মাঝমাঠের প্রাধান্য রেখে তারা আক্রমণে উঠেছে। ৫২ মিনিটে মনিকা চাকমার অসাধারণ ফিনিশে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। নেপালের এক ডিফেন্ডাররে ভুল পাস পেয়ে সাবিনাকে বাড়িয়েছিলেন মারিয়া। সেটা ক্লিয়ার করতে গিয়ে মনিকার পায়ে তুলে দেন আরেক নেপাল ডিফেন্ডার। মার্কারকে ছিটকে ফেলে আগুয়ান কিপারকে পরাস্ত করে কোনাকুনি শটে বল পোস্টে জমা করেন মনিকা। চার মিনিট পর ডিফেন্ডারদের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে নেপালকে ম্যাচে ফেরান আমিশা কারকি। প্রীতি রায় ডিফেন্স-চেরা থ্রু দিয়েছিলেন। মাসুরা সেটা ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে বল পেয়ে একা হয়ে পড়া বাংলাদেশ কিপার রূপনাকে সহজেই পরাস্ত করেন আমিশা।
৬১ মিনিটে সাবিত্রা ভান্ডারি বাঁ-দিক দিয়ে আক্রমণে উঠেছিলেন। মার্কার আফিদা তাকে ধরে রাখতে পারেননি। অনেকটা এগিয়ে আড়াআড়ি ক্রসও ফেলেছিলেন। তবে সেটা জালে রাখতে নেপালের কেউ ছিল না। ৬৮ মিনিটে ঋতুর আড়াআড়ি পাস বক্সের বাইরে পেয়ে মারিয়া বাঁ পায়ে শট নিয়েছিলেন। তবে নেপাল কিপার অনিলা সুব্বা বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে তা কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন। ৭৮ মিনিটে শামসুন্নাহার গোলের সেরা সুযোগ নষ্ট করেন। বাঁ দিক থেকে ঋতুর ক্রসে হাত ছোঁয়া দূরত্ব থেকে ঠিকঠাক হেড করতে পারেননি তিনি। তবে ৮১ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঋতুপর্ণার গোলে লিড নেয় বাংলাদেশ। শামসুন্নাহার সিনিয়রের থ্রো-ইন আয়ত্তে নিয়ে বাঁ দিক দিয়ে আক্রমণে উঠে বাঁ পায়ের ক্রস নিয়েছিলেন ঋতু। নেপাল কিপার তা ক্লিয়ার করতে ঝাঁপিয়েছিলেন। তবে তার গ্লাভস ছুঁয়ে দূরের পোস্ট দিয়ে বল জালে প্রবেশ করলে এক মুহূর্তে থমকে যায় দশরথের গ্যালারি।
বাকিটা সময় গোল ধরে রাখে দশরথে আবারও ইতিহাস গড়ে সেরার মুকুট নিজেদের কাছেই রেখে দেন বাংলাদেশের মেয়েরা।
