চট্টগ্রাম ওয়াসার ভা-ালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় শুধু শিল্প-কারখানায় পানি দেওয়ার জন্য ১৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো হয়েছে। একনেকে অনুমোদন করার সময়েও প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বোয়ালখালী, পটিয়া ও আনোয়ারার শিল্প-কারখানায় পানি সরবরাহ করা। কিন্তু দিনে ছয় কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতার এ প্রকল্পের আওতায় অফিস-আদালত ও রেস্টুরেন্টে ওয়াসা যে দরে পানি দেয়, সেই দরেই দেওয়া হবে কোরিয়ান ইপিজেড, কাফকো, সিইউএফএলসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায়। এতে কি অফিস-আদালতে এবং কারখানায় পানির দরের ভারসাম্য রক্ষিত হবে?
মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে পানি সরবরাহের প্রশ্নে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতি এক হাজার লিটার পানির দর ১১০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক জোন অথরিটিকে (বেজা) প্রস্তাব দিয়েছিল। এখন তারা ভা-ালজুড়ি প্রকল্পের আওতায় শিল্প-কারখানায় পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে ৩৭ টাকা দর প্রস্তাব করছে কীভাবে?
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হুম, আমরা বেজার কাছে প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম প্রায় ১১০ টাকা অফার করেছিলাম। তবে চট্টগ্রাম ওয়াসায় বর্তমানে আবাসিক ও অনাবাসিক দুটি ক্রাইটেরিয়া আছে। আবাসিকের বাইরের সব সংযোগ অনাবাসিক ক্রাইটেরিয়ায় দেওয়া হয়ে থাকে। এখন যেহেতু শিল্প-কারখানায় সরাসরি সংযোগ দেওয়া হচ্ছে, তাই তৃতীয় আরেকটি ক্রাইটেরিয়া (শ্রেণি/বর্গ) করা যেতে পারে।’
তৃতীয় ক্রাইটেরিয়াটি কে করবে? জবাবে তিনি বলেন, ‘ওয়াসা ভর্তুকি মূল্যে গ্রাহকপর্যায়ে পানি সরবরাহ করে থাকে। শিল্প-কারখানাগুলো আমাদের পানি ব্যবহার করে, শিল্পোৎপাদন করে পণ্য রপ্তানি করবে। তাই তাদের ভর্তুকি মূল্যে পানি সরবরাহ করা ঠিক নয়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে শিল্প-কারখানার জন্য আরেকটি ক্রাইটেরিয়া ও তার জন্য আলাদা মূল্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পানি সরবরাহ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফজলুর রহমান বলেন, ‘কোনো ক্রাইটেরিয়া যুক্ত করলে যদি সরকারের রাজস্ব বাড়ে ও তা যৌক্তিক হয়, তাহলে তা করা যেতে পারে। ওয়াসার পানির ক্ষেত্রে শিল্প-কারখানার জন্য নতুন ক্রাইটেরিয়া করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম ওয়াসার একাধিক ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম ইপিজেডে অনাবাসিক হিসেবে প্রতি এক হাজার লিটার পানি ৩৭ টাকা দরে বিক্রি করছি। কিন্তু ইপিজেডের কারখানাগুলো ডলারে বিদেশে পণ্য রপ্তানি করছে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের আদলে অবশ্যই শিল্প-কারখানার জন্য পৃথক ক্রাইটেরিয়া করা যেতে পারে। এতে ওয়াসা তথা সরকারের রাজস্ব বাড়বে। বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসায় ৯১ হাজার ৮১০টি সংযোগের বিপরীতে আবাসিক সংযোগ ৮৫ হাজার ৪৫৮টি ও অনাবাসিক (শিল্প-কারখানা, দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, অফিস প্রভৃতি) সংযোগ ৬ হাজার ৩৫২টি। শিল্প-কারখানাগুলো অনাবাসিক হিসেবে সংযোগ নেওয়ায় ওয়াসার রাজস্ব আদায় যথাযথভাবে হচ্ছে না।’
শিল্প-কারখানার জন্য পৃথক দর থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘নগরীর বহদ্দারহাট মোড়ের একটি রেস্টুরেন্ট কিংবা অফিস ভবনে যে দরে পানি কেনে একই দরে শিল্প-কারখানার মালিকের পানি কেনা উচিত নয়। শিল্প-কারখানার জন্য পৃথক দর থাকা প্রয়োজন। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।’
একই মন্তব্য করেন পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি ও চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নুরুল হক। তিনি বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতে যেমন শিল্প-কারখানা পৃথক বিল দিচ্ছে, পানির ক্ষেত্রেও পৃথক হতে পারে। তবে এই পৃথককরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প-কারখানা সরকার থেকে যেমন পৃথক সুবিধা পেয়ে থাকে, তেমনিভাবে এদের পানির সংযোগও পৃথক থাকা প্রয়োজন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় আরও বাড়বে।’
শিল্প-কারখানায় পানি দিতেই ভান্ডালজুড়ি প্রকল্প
শুধু বোয়ালখালী, পটিয়া ও আনোয়ারা এলাকার শিল্প-কারখানায় পানি দিতে কর্ণফুলী নদীর ওপারে বোয়ালখালী-ভা-ালজুড়ি এলাকায় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পানি সরবরাহ প্রকল্পটি নিয়েছিল ওয়াসা। দিনে ছয় কোটি লিটার পানি পরিশোধন করে এসব এলাকার শিল্পাঞ্চল ও আবাসিকে সংযোগ দিতে ১৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসিয়েছে ওয়াসা। ১ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক দিচ্ছে ১ হাজার ২২৫ কোটি টাকা, সরকারের তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে ৭৫০ কোটি ও ওয়াসা দিচ্ছে ২০ কোটি টাকা। সম্পন্ন হতে যাওয়া প্রকল্পটি আগামী মাসে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যাবে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মুহম্মদ মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এ প্রকল্পের আওতায় দৈনিক ছয় কোটি লিটারের মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ আবাসিকে ও অনাবাসিকে ৪ কোটি ৮০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করা হতে পারে। তবে অনাবাসিক ক্রাইটেরিয়ায় শিল্প-কারখানাই বেশি।’
তিনি বলেন, ‘আনোয়ারায় যেহেতু চায়নিজ ইকোনমিক জোনের প্রস্তাব রয়েছে এবং কোরিয়ান ইপিজেড, কাফকো, সিইউএফএলসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানা রয়েছে, তাই প্রকল্প স্থাপনে এগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।’
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসার অনুমোদিত আইন অনুযায়ী আবাসিক ও অনাবাসিক দুটি ক্রাইটেরিয়া রয়েছে। বিদ্যমান ক্রাইটেরিয়ায় শিল্প সংযোগগুলো অনাবাসিকই হয়। তবে সরকার যদি শিল্পের জন্য পৃথক ক্রাইটেরিয়া করে দেয়, তাহলে নতুন দর নির্ধারিত হতে পারে।’
বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসার আবাসিকে প্রতি এক হাজার লিটার পানির দর ১৮ টাকা ও অনাবাসিকে ৩৭ টাকা। প্রতিবছর তা ৫ শতাংশ হারে বাড়ে।
শিল্পে পানি সংযোগের ক্ষেত্রে পাশের দেশ ভারতের চেন্নাইয়ে এক হাজার লিটার পানির দর ২৩২ টাকা, ত্রিপুরায় ১৯৮, দিল্লিতে ২৩১, হায়দরাবাদে ৩১৬, ফিলিপাইনে ১৩৫ টাকা ৩০ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৪৭ টাকা ৪০ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১০৩ টাকা ৪০ পয়সা ও সিঙ্গাপুরে ১৭৩ টাকা ৮০ পয়সা।
