সাতক্ষীরা থেকে উঠে এসে দক্ষিণ এশিয়ার সম্রাজ্ঞী বনে গেছেন সাবিনা খাতুন। এ যেন স্বপ্নের ভেসে বেড়ানোর মতোই একটা ব্যাপার। পুরো ভ্রমণ জুড়ে চড়াই-উতরাই ছিল। ছিল অনেক অনেক আত্মত্যাগ। প্রতিকূলতার দেয়াল সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেছে বারবার। সব হার্ডল পেরিয়ে আজ সাবিনা গর্বে করে বলতে পারছেন, ‘বাঙালি হিসেবে আমি গর্বিত। এই দেশটার জন্য কিছু করতে পেরেছে ভেবে আমি গর্বিত। এ দেশের মানুষকে আনন্দের উপলক্ষ এনে দিতে পেরে আমি গর্বিত।’
এ গর্বটা সাবিনা করতেই পারেন। পরপর দুবার দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে সেরা দলটির অধিনায়ক তিনি। ২০২২ সালে এ কাঠমান্ডুতেই যে ইতিহাস লিখেছিলেন, দুই বছর পর পুনর্বার লিখলেন একই গল্প। প্রতিপক্ষ না বদলালেও এবার প্রেক্ষাপট বদলেছে। বয়সটাও বেড়েছে কিছুটা। অনেক কারণে এবার দায়িত্বটাও বেড়ে গিয়েছিল ঢের। আসলে ছোট বোনের মতো সতীর্থদের আগলে রাখা। মাঠ ও মাঠের বাইরে সবাইকে একত্রিত করে রাখার গুরুদায়িত্ব যেমন পালন করতে হয়েছে, ভালো পারফর্ম করে সামনে থেকেও দিতে হয়েছে নেতৃত্ব। ভালো মানে যদি আগের মতো কাঁড়ি কাঁড়ি গোল করাকে বোঝায়, সেটা সাবিনা এবার করেননি। নিজেদের পজিশন বদলে ফেলে গোল করার চেয়ে করানোতে ছিল বেশি মনোযোগ। তাতেই ফুল হয়ে ফোটার সুযোগ পেয়েছিলেন তহুরা, শামসুন্নাহার জুনিয়ররা। উইঙ্গার হয়েও বারবার গোল করার চেষ্টা করার সাহস এই সাবিনার কাছ থেকেই পেয়েছেন ফাইনাল জয়ের নায়ক ঋতুপর্ণা চাকমা। আবার মাঝমাঠে বেশি নজর দেওয়ায় মনিকা-মারিয়ারাও সাহস পেয়েছেন ওপরে উঠে গোলের চেষ্টা করার।
এইতো গেল মাঠের সাবিনার নিবেদনের কথা। এবার শুনুন মাঠের বাইরে কী করে এ গোটা দলকে দেখে রেখেছেন তিনি। ব্রিটিশ কোচের সঙ্গে বিরোধের জেরে দলের মনোবল ভেঙে চৌচির হয়ে গিয়েছিল টুর্নামেন্টের শুরুতে। সেখান থেকে সতীর্থদের চাঙ্গাই কেবল করেননি, বের করে এনেছেন সেরা পারফরম্যান্স। এত এত অবদানের পরও নিজেকে একদমই লেটার মার্কস দিচ্ছেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক। সব কৃতিত্ব সতীর্থদের দিয়ে বলেছেন, ‘এ শিরোপা অবশ্যই দেশের সব মানুষের। তারা খুব করে চেয়েছিলেন এ শিরোপা আমাদের হাতে দেখতে। একটা কঠিন ম্যাচ জিতে আমরা তাদের আশা পূরণ করেছি। তবে আমি আলাদা করে মেয়েদের কথা বলব, যারা অনেক ত্যাগ, অনেক পরিশ্রম করে এটা অর্জন করেছে। আমরা ফুটবলাররা মানুষের জন্য খেলি ঠিক, তবে এ শিরোপাটা আমি আমার সতীর্থদেরও উৎসর্গ করতে চাই।’ সতীর্থ বলতে সাবিনা শুধু বর্তমান দলকে বোঝাননি।
এ সাফল্যের প্রথম বীজটা বপন হয়েছিল দুই বছর আগেই প্রথম শিরোপা জয়ে। প্রিয় গুরু গোলাম রব্বানী ছোটনের অধীনে সবাইকে চমকে দিয়ে বাংলাদেশ জিতেছিল শিরোপা। তবে স্বাধীনতা পাওয়ার চেয়ে আগলে রাখার চ্যালেঞ্জটা নেওয়ার ছিল সাবিনাদের। সেটা করতে পেরেই বেশি খুশি তিনি, ‘দেখুন, প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর অনেকের মনেই একটা ধন্দ কাজ করেছিল যে, ওটা এমনি এমনি হয়ে গেছে। আসলে যে আমরাই সেরা, সেটা প্রমাণ করতেই এবার শিরোপাটা জিততে চেয়েছিলাম। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে অনেক কিছু পার করে আমরা আমাদের সেরাটা খেলেই সেরার আসনে বসেছি।’ দুটি শিরোপাকেই আলাদা করতে চান না সাবিনা, ‘দুটি শিরোপা আমরা দেশে নিয়ে যেতে পারছি, এটাই তো বড় কথা। আমার কাছে দুটি অর্জনই সমান। দুটিই সেরা।’
সেই সেরার স্বাদ পেতে লড়তে হয়েছে অনেক। লড়াইটা হয়তো জারি থাকবে সামনেও। কারণ প্রথমের অভিজ্ঞতাটা যে ভোলার নয়। ইতিহাস গড়া সেই জয়ের পর দীর্ঘ ৯ মাস মেয়েরা কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। উদ্দেশ্যহীনভাবে ট্রেনিংই শুধু করে গেছেন। অলিম্পিক বাছাইয়ের মতো আসরে পাঠানো হয়নি তাদের। অভিমানে, হতাশায় অনেক সতীর্থ খেলা ছেড়ে গেছেন। প্রিয় কোচ ছোটনও চাকরি ছেড়েছেন। তাদের সবার কথাই বিজয়ের এ সন্ধ্যায় মনে পড়ছে সাবিনার, ‘আমি জানি আমরা যতটা তাদের মিস করেছি, ঠিক ততটাই তারা আমাদের মিস করেছে। তারা থাকলে আরও ভালো লাগত। এখন দূরে থাকলেও মনে হয়, এ সাফল্যে ভাগীদার তারাও। কারণ দুই বছর আগের সেই সাফল্যই আমাদের আবার সেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে।’
সাবিনারা আরও এগিয়ে যান, এটাই প্রত্যাশা।
