দুই বছরের বেশ সময় ধরে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করছে ইউক্রেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইউক্রেন তেমন কোনো সফলতা পায়নি। তবুও দীর্ঘসময় ধরে রুশ বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে পারছে মূলত পশ্চিমা অর্থ ও সামরিক সহায়তার কারণে। ইউক্রেনের এসব সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। চলমান এই যুদ্ধে লক্ষ্য অর্জন ও সাফল্য পেতে তাই কিয়েভ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে তীক্ষè নজর রাখছে ইউক্রেনীয়রা। কেননা মস্কোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে টিকে থাকতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সমর্থন প্রয়োজন ইউক্রেনের।
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতার আভাস পাওয়া গেছে নির্বাচনপূর্ব জরিপগুলোতে। গত দুই বছরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে কিয়েভকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আসছে বাইডেন প্রশাসন। তাই স্বভাবতই ইউক্রেনীয়দের প্রত্যাশা নির্বাচনে বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের জয়। নির্বাচনে জিতলে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা। অন্যদিকে, নির্বাচনে জিতলে দ্রুতই এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পদক্ষেপ নেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় তিনি যুদ্ধ থামাবেন সে বিষয়ে কোনো পরিকল্পনার কথা জানাননি। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ইতিহাসের সেরা বিক্রয়কর্মী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী। এমনকি যুদ্ধ শুরুর জন্যও ইউক্রেনকে দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এই সাবেক প্রেসিডেন্ট। ফলে এটি সহজেই অনুমান করা যায় ট্রাম্প জিতলে ইউক্রেনে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও সামরিক সহায়তা অনেকটাই কমে আসবে। এ মুহূর্তে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার পরিমাণ ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি। সেই সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দাবি করা ট্রাম্প যে পন্থাতেই যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করুক না কেন, সেটি ইউক্রেনের জন্য পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার কাছে কিছু ভূখ- ছেড়ে দিয়ে হলেও, ইউক্রেনের যুদ্ধের অবসান ঘটানো উচিত। ফলে আসন্ন ৫ নভেম্বরের নির্বাচনের ওপর ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করছে।
তবে কমলা জিতলেও রিপাবলিকাননিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে তার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, কমলা বা ট্রাম্প যেই যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট হোন না কেন, ইউক্রেন সীমান্তে এমনকি দেশটিতে বসবাসরত প্রত্যেকের ওপর এর গভীর প্রভাব পড়বে। যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনকে কিছু ভূখ- রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দেওয়া ও সম্মুখসারি থেকে সেনা প্রত্যাহারের মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। সে ক্ষেত্রে জাপোরিঝিয়ার মতো অঞ্চলগুলো হঠাৎ উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে। যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে উনিশ শতকের পাঁচের দশকে দুই কোরিয়া ও তাদের মিত্রদের লড়াই থামলেও এখনো কোরীয় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটেনি।
আবার ইউক্রেনের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে রুশ বাহিনী ক্রমেই তাদের কাক্সিক্ষত এলাকাগুলো দখল করে নিতে পারে। এমনকি একসময় পুরো ইউক্রেনই রাশিয়ার দখলে চলে যেতে পারে। ফলে পাঁচ হাজার মাইলের বেশি দূরের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের হাতে ভাগ্য ঝুলছে ইউক্রেনীয়দের। যুদ্ধে ইউক্রেনীয় সেনাদের সাফল্য বলতে গেলে সামান্যই। উপরন্তু ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর-গ্রামে প্রতিদিন রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও গ্লাইড বোমা হামলার হামলার শিকার হচ্ছেন ইউক্রেনীয় সেনারা। ফলে তাদের মনোবলে চিড় ধরেছে নিশ্চিতভাবেই।
আন্দ্রিয়া একজন ইউক্রেনীয় সেনা। সম্মুখসমরে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্র-নির্মিত সাঁজোয়া যানের বহরের একটি ইউনিট পরিচালনার দায়িত্বে আছেন তিনি। বিবিসিকে আন্দ্রিয়া বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ হয় বা কমে আসে, তবে আমাদের সেনাদের কাঁধে বোঝা এসে পড়বে। আমাদের কাছে যা আছে, আমরা তা নিয়েই লড়ব। কিন্তু সবাই জানে, এটা ইউক্রেনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। স্বাভাবিকভাবেই আন্দ্রিয়া ও তার সহকর্মী সেনারা ৫ নভেম্বর মার্কিন নির্বাচনের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছেন। এ নিয়ে অনিশ্চয়তা এরই মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের উচ্চাকাক্সক্ষা দমিয়ে দিচ্ছে এবং আরও সামরিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা হতাশাজনক করে তুলছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনবাসী কমলাকেই তাদের পছন্দের প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। ইউক্রেনের সাংবাদিকেরাও তার বিরুদ্ধে রাশিয়ার অপতথ্য মোকাবিলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অবশ্য ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল জুড়ে মানুষের মধ্যে ক্রমেই ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তারা চান, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অনতিবিলম্বে অবসান। এ যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের জেতা সবচেয়ে বড় সুযোগ বলে ধারণা তাদের।
এদিকে, আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভারতীয় অভিবাসীদের সমর্থন কমেছে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের তুলনায় এবার কমলার হ্যারিসের প্রতি সমর্থনের হার অনেকটাই নিম্নমুখী হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে ৬১ শতাংশ প্রবাসী ভারতীয় কমলাকে ভোট দিতে পারেন, যা দেশটির সবশেষ নির্বাচনের থেকে ৪ শতাংশ কম। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫২ লাখ ভারতীয় অভিবাসী রয়েছে, যা মেক্সিকান আমেরিকানদের পর দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম অভিবাসী গোষ্ঠীর তকমা দিয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ।
