ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা পেতে কয়েক বছর অপেক্ষার প্রহর গুনছেন পাঁচ শতাধিক কিডনি রোগী। আবেদনের কয়েক বছর পার হলেও মিলছে না কাক্সিক্ষত ডায়ালাইসিস সেবা গ্রহণের সুযোগ। আবেদনকারী রোগীর জন্য সিরিয়াল পেতে হলে নিবন্ধনকৃত ২০০ জনের মধ্যে কারও মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকতে হয়। বর্তমানে হাসপাতালে পাঁচ শতাধিক আবেদন জমা পড়ে আছে। এখন আবেদন নিয়ে এলে আর গ্রহণ করা হচ্ছে না। তাই হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর দাবি রোগীদের। ১০ বেডের মাধ্যমে ডায়ালাইসিস চিকিৎসাসেবা চালু হলেও তিন ধাপে দৈনিক ২৭ জন কিডনি রোগী এ সেবা নিতে পারে। ফলে ডায়ালাইসিসের একটি শয্যা যেন সোনার হরিণ।
কিডনি রোগীর অতিরিক্ত চাপের কথা স্বীকার করে ২৫০ শয্যার ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) মো. আসিফ ইকবাল বলেন, ‘আমার একজন নিজস্ব রোগী ডায়ালাইসিস সেবা পেতে আবেদন করলেও কারও মৃত্যু ছাড়া তাকে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন কয়েকজন কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস সেবার জন্য আবেদন করলেও পাঁচ শতাধিক আবেদন জমা থাকায় এখন আর গ্রহণ করা হচ্ছে না।’
একজন প্রবাসী নাম প্রকাশ না করে জানান, তিনি সৌদিতে ছিলেন। কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে সেখানকার কো¤পানি তাকে দেশে (বাড়ি) পাঠিয়ে দেন। এখন সপ্তাহে দুবার করে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। ঢাকায় থেকে বাসা ভাড়া, থাকা-খাওয়াসহ এ চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। নিজ জেলা ফেনীতে চলে এসেছেন। ফেনী সদর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে সিরিয়াল পেতে আবেদন করে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছেন। সেখানে এমনিতেই কয়েকশ রোগীর আবেদন জমা পড়ে রয়েছে। তিনি জানান, রোগীদের চিকিৎসার কথা চিন্তা করে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের নতুন ভবনে ১০ শয্যার আরও একটি ডায়ালাইসিস ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত জনবল ও বরাদ্দ পেলেই সেটি চালু করা হবে।
শিরিন আক্তার নামে একজন বলেন, রোগীর চাপে শিডিউল মিলছে না। এজন্য ডায়ালাইসিস বেড বাড়ানো দরকার। এতে অন্তত এক বছর অপেক্ষা করতে হবে না।
প্রবাসফেরত ফয়েজ আহম্মেদ বলেন, তিনি কিডনির রোগে আক্রান্ত হওয়ায় গত চার বছর ধরে তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হয়। বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয়বহুল এ সেবাটি নিতে গিয়ে এখন অনেকটা নিঃস্ব তিনি। তুলনামূলকভাবে খরচ কম হওয়ার কথা শুনে ফেনীর এ সরকারি জেনারেল হাসপাতালে আবেদন করেন। কিন্তু সেখানে মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও সুযোগ না পেয়ে এখন বেঁচে থাকার স্বপ্ন যেন ফিকে হয়ে আসছে তার।
ফেনী সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের পুরাতন ভবনের নিচতলায় স্থাপিত হয়েছে ১০ শয্যার একটি হেমোডায়ালাইসিস বিভাগ। সেখানে প্রতিদিন তিন পালায় (শিফট), প্রতি পালায় ৯ জন করে ২৭ রোগীকে ডায়ালাইসিস করানো যায়। এ ছাড়া হেপাটাইটিস-বি ও হেপাটাইটিস-সি আক্রান্ত কিডনি রোগীদের জন্য একটি করে তিন পালায় তিনটি শয্যায় ডায়ালাইসিস সেবারও ব্যবস্থা রয়েছে। তবে যান্ত্রিক ত্রুটিসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে প্রতি পালায় ৭ জন করে তিন পালায় ২১ জনকে ডায়ালাইসিস করা হয়। হেপাটাইটিস-বি ও হেপাটাইটিস-সি তিনজন রোগীকে ডায়ালাইসিস করা হয়। প্রতিবার ডায়ালাইসিস করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ ৪০০ টাকা খরচ হয়। প্রতি শিফটে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান কাজ করেন। চিকিৎসক ছাড়াও নার্সসহ ১০ জনকে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতালসহ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা চালু থাকলেও সেখানে শয্যাসংখ্যা অপ্রতুল এবং ব্যয়বহুল। ফেনীতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রতিবার ডায়ালাইসিস করাতে খরচ পড়ে আড়াই হাজার টাকা।
আরএমও আসিফ ইকবাল বলেন, ‘দেশে দিন দিন কিডনি রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তাই সেবা প্রদানে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, এই ইউনিটটি চালু হওয়ার পর থেকে এখান থেকে এমন দুই শতাধিক কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছেন। এখন যাদের ডায়ালাইসিস দেওয়া হচ্ছে তাদের কাছ থেকে প্রতি ছয় মাসের জন্য ২২ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। তাদের সপ্তাহে দুবার করে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। এসব রোগীর মধ্যে অনেকেই হতদরিদ্র অথবা মধ্যবিত্ত।
আসিফ ইকবাল বলেন, ‘যিনি একবার এ হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের সুযোগ পেয়েছেন, ওই রোগীকে আমৃত্যু এটি নিতে হবে। কারও মৃত্যুজনিত কারণ অথবা কোনো রোগী বিশেষ কারণে অন্য কোথাও হাসপাতালে স্থানান্তর হলেই একটি শয্যা খালি হয়। তখন নতুন একজনকে নেওয়া সম্ভব হবে।’
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল খায়ের মিয়াজী বলেন, ‘আমাদের এখানে অপেক্ষমাণ তালিকা অনেক দীর্ঘ। এতগুলো রোগীর সেবা দেওয়া এই মুহূর্তে আমাদের জন্য সম্ভব নয়। যারা অপেক্ষায় আছেন তাদের অনেককে আমরা ঢাকার অন্যান্য হাসপাতালে চলে যেতে বলছি।’ তিনি সব সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে অনুরোধ করেছেন স্বাস্থ্য বিভাগকে।
ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. মো. শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘ফেনী জেনারেল হাসপাতালের নতুন ভবনে ১০ শয্যার আরও একটি ডায়ালাইসিস ওয়ার্ড চালু হলে সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে। শিগগিরই নতুন এ ওয়ার্ড চালু হবে।’
