ভারতকে মাটিতে নামিয়ে উড়ল কিউইরা

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:৪০ এএম

‘আমরা স্রেফ একদল কিউই, যারা লড়ছি গোটা পৃথিবীর বিপক্ষে’, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারতকে ২৫ রানে হারাবার পর এটাই বলছেন ড্যারেল মিচেল। আসলেই তো তাই। ভারতে এসে ভারতকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করাটা কিউই পাখির উড়তে পারার মতোই একটা অসম্ভব কাজ। স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়া, ক্লাইভ লয়েডের পরাক্রমশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজও যা পারেনি, টম ল্যাথামের নেতৃত্বাধীন একদল কিউই সেটাই করে দেখাল, ভারতকে ৩ টেস্টের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করল তাদেরই মাটিতে।

আগের দিনের ১৭১ রানের সঙ্গে মাত্র ৩ রান যোগ করেই তৃতীয় দিন সকালে অলআউট হয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। ভারতের সামনে চতুর্থ ইনিংসে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৪৭ রানের। ২০ বছর আগে এই মুম্বাইতেই, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১০৭ রানও বাঁচিয়ে ফেলেছিল ভারত, অস্ট্রেলিয়াকে চতুর্থ ইনিংসে মাত্র ৯৩ রানে অলআউট করে ম্যাচটা জিতেছিল ১৩ রানে। ১৪৭ রানের লক্ষ্যটাও তাই ভারতের জন্য সহজ ছিল না। এজাজ প্যাটেল আর গ্লেন ফিলিপস মিলে সেই লক্ষ্যটাকে করে তুলেছেন আরও কঠিন।

মাত্র ৩ ওভার বল করেছেন পেসার ম্যাট হেনরি, অবশ্য নিজের কাজটা ঠিকই করে দিয়েছেন। রোহিত শর্মাকে পুল শট খেলতে প্রলুব্ধ করিয়ে তাকে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেছেন। ব্যাটের ওপরের দিকে লেগে উঠে যাওয়া বলটা মিড উইকেটে দারুণভাবে লুফে নিয়েছেন ফিলিপস। শুভমান গিলকে বোল্ড করে এজাজের শুরু, বল ছেড়ে দিয়ে বোল্ড হয়েছেন গিল। মিচেল সিøপে ধরেছেন বিরাট কোহলির ক্যাচ। যশস্বী জয়সওয়ালকে বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আগেই লেগ বিফোর উইকেটের ফাঁদে ফেলেন ফিলিপস, দুই বল পর এজাজের বলে বোল্ড সরফরাজ খান। ২৯ রানেই ৫ উইকেট নেই ভারতের, ১৪৭ তখন দূরের বাতিঘর।

তবুও রিশভ পান্ত ছিলেন, আশাটা জাগিয়ে রেখেছিলেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় চালিয়ে খেলছিলেন পান্ত, রবীন্দ্র জাদেজার সঙ্গে ৫৩ বলে ৪২ রানের একটা জুটিও হয়। জাদেজার বিদায়ের পর ওয়াশিংটন সুন্দরের সঙ্গেও ৩৪ বলে ৩৫ রানের জুটি। সেটা ভাঙে টিভি আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে। মাঠের আম্পায়ার কট বিহাইন্ডের আবেদনে নট আউট দিলে রিভিউ নেন ল্যাথাম, টিভি আম্পায়ার পল রেইফেল মাঠের আম্পায়ার রিচার্ড ইলিংওয়ার্থকে জানিয়ে দেন সিদ্ধান্ত বদলের জন্য। ৫৭ বলে ৬৪ রান করে পান্ত আউট হয়ে যেতেই আসলে শেষ হয়ে যায় ভারতের সম্ভাবনা। রবিচন্দ্রন অশ্বিন কিছুক্ষণ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পর ২৯ বলে ৮ রান করে ফিলিপসের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে। পরের বলেই আকাশ দীপও বোল্ড। এরপর এজাজ প্যাটেলের বলে ওয়াশিংটন সুন্দর বোল্ড হতেই উল্লাসে মেতে ওঠেন নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা, ওয়াংখেড়ের স্টেডিয়ামে তখন নিস্তব্ধ নীরবতা।

খেলা শেষে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে এসে রোহিত শর্মা মেনে নিয়েছেন; ভুল ছিল তাদের ‘টেস্ট সিরিজে হারাটা হজম করা কঠিন। আমরা আমাদের সেরা ক্রিকেটটা খেলিনি, নিউজিল্যান্ড গোটা সিরিজ জুড়েই আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে। গোটা সিরিজ জুড়ে আমরা অনেক ভুল করেছি। প্রথম দুই টেস্টেই প্রথম ইনিংসে ভালো রান করিনি। এই ম্যাচেও আমরা ৩০ রানের মতো (২৮) লিড পেয়েছিলাম আর রানটাও তাড়া করার আয়ত্তের মধ্যেই ছিল, তবুও আমরা পারিনি। দল হিসেবেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি’। গত তিন চার-বছর ধরেই আমরা এই ধরনের উইকেটে খেলছি। আমরা বেশ কিছু জিনিস চেষ্টা চালিয়েছি যা সফল হয়নি। অধিনায়ক হিসেবে আমিও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছি। সমন্বিতভাবে, দল হিসেবেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি’।

ল্যাথাম বলেছেন, তার কাছে সব অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে, ‘এই মুহূর্তটাকে সবকিছু অবাস্তব মনে হচ্ছে। সিরিজ শুরুর আগে সেখানে ছিলাম আর এখন যেখানে আছি...ছেলেরা সবাই কঠিন পরিশ্রম করেছে আর অবশেষে মুম্বাইতে এসে সফল হয়েছে। এই সফরটা কঠিন ছিল, একেকটা ম্যাচ একেকভাবে জিততে হয়েছে। সিমাররা জিতিয়েছিল বেঙ্গালুরুকে, একেক ভেন্যুতে একেকজন জিতিয়েছে আমরা যতটা অবদান আশা করছিলাম তারচেয়ে বেশি করেছে। গত সপ্তাহে মিচ (মিচেল স্ট্যান্টনার) আর এই সপ্তাহে এজাজ।’

মুম্বাইতেই জন্ম এজাজের, এই শহরে এখনো আত্মীয় পরিজন মিলিয়ে ৩০টা পরিবার তার চেনা। নিউজিল্যান্ডে অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমানো এজাজের হাতেই ওয়াংখেড়েতে উঠেছে ১১ উইকেট। ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে হাত নেড়েছেন, তাতে আত্মীয়দের হয়তো মুখে হাসি ফুটলেও অন্তরটা হয়তো কাঁদছিল। কারণ এজাজ নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমালেও তার আত্মীয়রা তো ভারতীয়! ম্যাচসেরার পুরস্কার নিয়ে এজাজ বললেন, ‘স্পিন বোলিংটা ছন্দের ব্যাপার, কেউ যখন ছন্দে থাকে তাহলে তার উচিত সামর্থ্যরে সবটুকু ব্যবহার করা। সকালের সেশনে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম কিন্তু উইকেট থেকে সহায়তা পাচ্ছিলাম না। লাঞ্চের পর আমি আত্মবিশ্বাস পেলাম, একটু ঝুলিয়ে দিলাম বলটা আর নিজের সহজাত সামর্থ্যটা কাজে লাগালাম। পান্তকে আউট করার জন্য ছকের বাইরে চিন্তা করতে হয়েছে। আমরা নতুন একটা পরিকল্পনা নিয়ে আসি আর ওর চেয়ে এগিয়ে থাকি।’

ভারতকে তাদেরই মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করায় টেস্টের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার সম্ভাবনা টিকে থাকল নিউজিল্যান্ডের। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ টেস্টের সিরিজের সবগুলো ম্যাচই জিততে হবে তাদের, তাহলেই বিশ্বকাপের ফাইনালে আরও একবার খেলা সম্ভব। ভারতকে হারিয়ে একটা অসম্ভব তো করে দেখিয়েছে কিউইরা, দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডকে হারানোটাও তাই খুবই সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত