বিশ্লেষকদের প্রশ্ন

স্বরাষ্ট্রের দুই বিভাগ কেন এক

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:২০ এএম

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ আবারও এক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি বিভাগ চালু হলেও দুই বিভাগের কাজের ব্যাপকতা, অধিকতর সমন্বয়, গতিশীলতা আনা ও জনস্বার্থ বিবেচনা করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই অনুশাসন দিয়েছেন। গতকাল রবিবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অবশ্য জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিয়ে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন নেই। তাদের দাবি, জনগণের সবচেয়ে বড় শঙ্কা হচ্ছে জানমালের নিরাপত্তা। রাজধানীসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা বিবেচনায় এখনই দুই বিভাগের বিলুপ্তির প্রয়োজন নেই। বরং পুলিশ প্রশাসন, গ্রাম পুলিশ-আনসার ভিডিপিসহ মাঠপর্যায়ের স্ট্রাইকিং ফোর্সকে শক্তিশালী করা দরকার। পাশাপাশি বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে বড় মন্ত্রণালয়গুলোতে কাজের পরিধি অনুযায়ী বিভাগ থাকাটা যৌক্তিক। অনেক গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আন্তঃমন্ত্রণালয় মতামত যাচাই করে ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য সুরক্ষা সেবা বিভাগ ও জননিরাপত্তা বিভাগ চালু হয়। দুই বিভাগের জন্যই তখন আলাদা করে তৈরি হয় প্রশাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ। চলমান কাঠামোতে জননিরাপত্তা বিভাগের অধীনে রয়েছে ছয়টি সংস্থা পুলিশ অধিদপ্তর, বিজিবি, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, তদন্ত সংস্থা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আর সুরক্ষা সেবা বিভাগের অধীনে রয়েছে চারটি বিভাগ বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং ব্যবস্থা।

জননিরাপত্তা বিভাগের অধীনে থাকা পুলিশ বাহিনীর ১৮ ইউনিটে প্রায় আড়াই লাখ সদস্য রয়েছেন। এই বাহিনীর নিয়োগ, ক্রয়-বিক্রয়, বদলির কর্মযজ্ঞ সাবলীল ও সহজ করতে পুলিশ বিভাগ আসে জননিরাপত্তা বিভাগে। এখানে এসবি, ডিবি, সিআইডি, র‌্যাব, শিল্প পুলিশের মতো গতিশীল ইউনিট কাজ করে। কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, এত গবেষণা করে যে বিভাগ করা হয়েছে সেটি আবার এক করে ফেললে কাজের গতি নষ্ট হবে, শৃঙ্খলা ব্যাহত হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল বাজেটের ৫৫ ভাগই খরচ হয় পুলিশ বাহিনীতে। তাই বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে,  দুই বিভাগ এক হয়ে গেলে পুলিশ বাহিনীকে সামলাতেই হিমশিম খাবে মন্ত্রণালয়।

জননিরাপত্তা বিভাগের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ৭০ হাজার সদস্যের আধাসামরিক এই বাহিনী দেশের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। সামরিক বাহিনীর আদলে এই বাহিনীর শৃঙ্খলার কাজ সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় জননিরাপত্তা বিভাগকে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই বিভাগ এক না করার পক্ষে মত দিয়ে জনপ্রশাসন বিশ্লেষক ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি অনেক। দেশব্যাপী প্রত্যক্ষ নিরাপত্তার কাজের ব্যাপ্তি তাদের। দুই বিভাগকে এক করে ফেললে কাজের গতি শ্লথ হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের নিরীক্ষা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, যে প্রশ্ন তুলে বিভাগ একীভূত হচ্ছে, তা এককথায় সমাধান হওয়ার নয়। পদায়ন-পদোন্নতি, মিশনে প্রেরণ এসব টেকনিক্যাল বিষয়। এসব ক্ষেত্রে সুশাসন জরুরি। তিনি বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে একটা হুলস্থুল ব্যাপার তৈরি হবে।

প্রধান উপদেষ্টার অনুশাসন অনুযায়ী নতুন প্রস্তাবিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ১০টি অধিদপ্তর থাকবে। পুলিশ অধিদপ্তর, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, তদন্ত সংস্থা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এবং মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর।

দুই বিভাগের এক হওয়া নিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের কর্মকর্তারা বলছেন, এত বিভাগ অথবা একত্রীকরণ করে কী লাভ হবে, যদি প্রকৃত ওয়াচডগ সিস্টেম না থাকে। তারা বলছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন এমন একটা কর্তৃপক্ষ, যারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। উদাহরণ দিয়ে তারা বলেন, আট বছর ধরে যানবাহন ক্রয় জটিলতায় ভুগছে পুলিশ বাহিনী। ন্যায়পাল বা সাংবিধানিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ হলে সংকট কমবে মন্ত্রণালয়ের।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সুরক্ষা সেবা বিভাগ বা জননিরাপত্তা বিভাগ এক হওয়ার মধ্য দিয়ে সংকট নিরসন হয় হবে না। বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশ ও পদায়নের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসনের রুলস অব বিজনেস মানলেই সংকট কমবে। 

বড় মন্ত্রণালয়গুলো যেমন স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ জ্বালানি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একাধিক বিভাগ থাকার পক্ষে অধিকাংশ ওইসব মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। গতকাল সচিবালয় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কর্মকর্তারা বলেন, এখনই একীভূত করার প্রয়োজন ছিল না। বেশ কিছুদিন ধরে একজন সচিব দিয়ে মন্ত্রণালয় কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে দাবি করে তারা বলেন, উচ্চ পদগুলোতে আরও নিরপেক্ষ, অরাজনৈতিক ও দক্ষ লোক নিয়োগ দিয়ে সংকট সমাধান সম্ভব ছিল।

২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পুনর্গঠন করে দুটি বিভাগ গঠন করা হয়। তখন রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পুনর্গঠন করে এ দুটি বিভাগ গঠন করেছিলেন। কাজের সুবিধার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দুভাগ করা হয় বলে তখন জানানো হয়েছিল।

তবে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ’ ও ‘সুরক্ষা সেবা’ বিভাগ দুটির কাজের ব্যাপকতা, অধিকতর সমন্বয়, গতিশীলতা আনয়ন ও গুরুত্ব বিবেচনা করে জনস্বার্থে একত্রীকরণে প্রধান উপদেষ্টা সদয় অনুশাসন দিয়েছেন। এমতাবস্থায় জননিরাপত্তা বিভাগ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ দুটিকে একত্রীকরণের বিষয়ে পরবর্তী কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।

সচিবালয় থেকে জানানো হয়েছে, ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগকে একীভূত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত