অংশীজনের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পুনর্লিখন

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:১২ এএম

সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্য ও রূপরেখা তুলে ধরেছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার আলোকে সংবিধান সংস্কার হবে জানিয়ে কমিশন বলেছে, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সংবিধান বা পুনর্লিখনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গতকাল রবিবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয়। কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ সংবিধান সংস্কারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য দেন।

এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করব। তাদের বক্তব্য শুনব। লিখিত বক্তব্য চাই। তারপর সে অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে সংবিধান সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন, পুনর্বিন্যাস ও পুনর্লিখন কোনটা করা হবে।’

কমিশনের প্রস্তাব বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করবে নাকি পরবর্তী নির্বাচিত সরকার করবে এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনের সদস্য ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম বলেন, ‘আমি সরকার বা সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে এখানে বলতে চাইছি না প্রস্তাবগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে। তবে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে বলতে পারি, বাস্তবায়ন অবশ্যই অবশ্যই বর্তমান সরকার করবে। কেন করবে না? এ সরকার ছাড়া কেউ এটি করবে না।’

তিনি বলেন, ‘কমিশন গঠনের সময় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলকে ডেকেছি। কমিশন থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হবে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর করা হবে।’

মাহফুজ আলম বলেন, ‘যেদিন আমাদের এক দফা ঘোষণা করা হয়, তখনই পুরাতন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আমরা খারিজ করেছি। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামই নতুন সংবিধান। সেটা এক দফার ঘোষণাতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা অনির্বাচিত হতে পারি, কিন্তু আমরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করি। পুরো দুনিয়ার কোথাও ছাত্ররা সরাসরি সরকারে যায়নি। আন্দোলন করেছে, সরকারে গেছে এরকম হয়নি। এটা (অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার) একটা এক্সট্রা অর্ডিনারি পরিস্থিতি। এখানে সংসদ, নির্বাচন, নির্বাচিত শব্দগুলো খুবই দুর্বল কথাবার্তা। আমি জানি না এ সরকারের ক্ষেত্রে এগুলোর কী তাৎপর্য আছে।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকরামুল হক, ড. শরীফ ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী, ফিরোজ আহমেদ ও মো. মুসতাইন বিল্লাহ।

লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ সংস্কারের সাতটি উদ্দেশ্য উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে বৈষম্যহীন জনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।’

ড. আলী রীয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানো হবে সুপারিশে। পাশাপাশি রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বস্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান রোধ, রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ পৃথককরণ, ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ ও পর্যাপ্ত ক্ষমতায়নের সুপারিশ থাকবে কমিশনের। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক, আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশসান নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকবে।

তিনি বলেন, কমিশন সংস্কারের সুপারিশ তৈরিতে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করবে। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মতামত ও প্রস্তার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। সংস্কারের অংশ হিসেবে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের লিখিত মতামত এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ করবে। তবে দলগুলোর সঙ্গে কমিশন আলোচনায় বসবে না। কমিশন সুপারিশ দেওয়ার পর তাদের সঙ্গে আলোচনা করবে সরকার।

তিনি আরও বলেন, সংবিধান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সিভিল সোসাইটির সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, তরুণ চিন্তাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনায় বসবে কমিশন। তবে যেসব ব্যক্তি, সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা দল জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সক্রিয়ভাবে হত্যাকা-ে যুক্ত ছিল, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হত্যাকা- ও নিপীড়নকে সমর্থন করেছে, ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমকে বৈধতা দিতে সহযোগিতা করেছে, তাদের যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বিরাজমান যে সংবিধান সেটি পর্যালোচনা করছি। আমরা পূর্ব ধারণা থেকে কিছুই শুরু করছি না। কমিশন দৃঢ়ভাবে মনে করে যে, সংবিধানের সংস্কার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় অংশীজন বাংলাদেশের জনগণ। তারপর রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি ও সংবিধানের বিশেষজ্ঞ।’

অধ্যাপক রীয়াজ বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব হলো সুপারিশ করা। আমরা অংশীজনের সঙ্গে কথা বলব। তাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করব। আমরা আসলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ নই। এটি করবে সরকার।’

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না এমন প্রশ্নে আলী রিয়াজ বলেন, ‘জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এটি সংবিধানে নিঃসন্দেহে উল্লেখ থাকতেই হবে। হাজার হাজার মানুষের আত্মদানের ফসল, ফ্যাসিবাদী ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই, এটাতো লিপিবদ্ধ করতে হবে। সংবিধানে (মূল সংবিধান) থাকুক বা না থাকুক, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, এর পেছনে প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন আছে। এ ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে আমরা তো জাতি হিসেবে অগ্রসর হতে পারব না।’

প্রচলিত সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতার অভাবনীয় এককেন্দ্রীকরণ ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ১৯৯১ সালে যখন রাষ্ট্রপতিশাসিত থেকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে যায় তখন থেকে। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময় রাষ্ট্রপতির হাতে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, সেই ক্ষমতা জিয়াউর রহমান, এরশাদ সবাই ভোগ করেছেন। সেই ক্ষমতা কার্যত বাক্সবন্দি করে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা ছাড়া ফ্যাসিবাদ তো আর এমনি তৈরি হয় না। আমরা ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ দেখতে চাই না।’

মতামত চেয়েছে পুলিশ সংস্কার কমিশন : ‘কেমন পুলিশ চাই’ এ বিষয়ে জনমত জানার জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থেকে এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে সবার কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

গুগল ফরমের ((https://forms.gle/kcXcL247eTbp3fHk6)) এই লিংকে অথবা পুলিশ সংস্কার কমিশনের ওয়েবসাইটে  (www.prc.mhapsd.gov.bd) প্রবেশ করে ‘কেমন পুলিশ চাই’ লিংকে ক্লিক করে জনসাধারণকে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে তাদের ‘মূল্যবান মতামত’ দিতে বলা হয়েছে। মতামত প্রদানকারীর পরিচয় ‘গোপন রেখে’ প্রাপ্ত তথ্য শুধু সংস্কার কাজের সহায়তায় ব্যবহৃত হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিককালে দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে প্রতিহত করতে কিছু পুলিশ সদস্যের সহিংস ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘পুলিশ সংস্কার’ এখন সময়ের দাবি। সেজন্য সরকার পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের লক্ষ্যে ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছে, যার কার্যক্রম চলমান। পুলিশ সংস্কার কমিশন এ বিষয়ে আপনার মূল্যবান মতামত জানতে চায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত