মানসিক অবসাদ নিয়ে কথা বলতে ভয় জ্যোতির

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০১ এএম

সর্বোচ্চ স্তরে ক্রিকেট খেলতে হলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শারিরীক সামর্থ্য, ফিটনেস, দক্ষতা থাকা চাই। এসব মাপার জন্য আছে ইয়ো ইয়ো টেস্ট সহ নানান মাপকাঠি? কিন্তু মনের জোর? চাপ নেবার ক্ষমতা?  ক্রিকেটারের শারিরীক চোট দৃশ্যমান, তার জন্য আছে উপশমের নানান উপায়। কিন্তু মনের অসুখ হলে সেটা সারবে কি করে? বাংলাদেশের বাস্তবতায় মানসিক অবসাদ নিয়ে কথা বলা এখনো ক্রিকেটারদের কাছে অভাবনীয় একটা ব্যপার, যেটা মেনে নেয়ার মত অবস্থায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখনো পৌঁছাতে পারেনি। সোমবার ইএমকে সেন্টারে আয়োজিত  ইউএসইড-এর 'গতিতেই সুস্থ্যতা' ক্যাম্পেইন এর অনুষ্ঠানে এমনটাই বলেছেন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি।

মানসিক অবসাদের কারণে ক্রিকেট থেকে দূরে থাকার উদাহরণ অনেক আছে। শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেটের প্রতিদ্বন্দিতার চাপ থেকে শুরু করে বিদেশ সফরে লম্বা সময় পরিবারের বাইরে থাকা, পারফরম্যান্স ধরে রাখার চাপ সব মিলিয়ে নানান কারণেই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন ক্রিকেটাররা। ইংল্যান্ডের মার্কাস ট্রেসকোথিক ২০০৬ সালে ভারত সফরের মাঝপথে কাউকে কিছু না জানিয়ে হুট করেই দেশে ফিরে এসেছিলেন মানসিক অবসাদের কারণে। লম্বা সময় তাকে ভুগতে হয়েছে মানসিক অবসাদে। আইপিএলের মাঝপথে খেলা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের মত তারকা। মানসিক অবসাদে ভুগেছেন বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলিও। টেনিস তারকা  নাওমি ওসাকা, অলিম্পিকের একাধিক সোনাজয়ী জিমন্যাস্ট সিমোন বাইলসও মানসিক অবসাদের জন্য বড় আসর থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বের অনেক শীর্ষ ক্রীড়াবিদই এভাবে ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে বিরতি নিয়েছেন মানসিক অবসাদের কারণে। তবে বাংলাদেশে এমন বিরতি নেয়াটা  এখনো স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে মনে করেন জ্যোতি, 'আমি যদি এখন বিসিবিকে জানাই যে আমি মানসিকভাবে অবসাদ গ্রস্থ, আমি ক্লান্ত; আপনার কি মনে হয় আমাদের দেশে সেই সংস্কৃতি বা গ্রহণযোগ্যতা আছে এই ব্যপারটাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেয়ার?  কেই কখনো এরকম করেনি আগে।'

আমি যদি এখন বিসিবিকে জানাই যে আমি মানসিকভাবে অবসাদ গ্রস্থ, আমি ক্লান্ত; আপনার কি মনে হয় আমাদের দেশে সেই সংস্কৃতি বা গ্রহণযোগ্যতা আছে এই ব্যপারটাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেয়ার?  কেই কখনো এরকম করেনি আগে

নিগার সুলতানা জ্যোতি

সাকিব আল হাসান অতীতে ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে টেস্ট খেলতে জাননি এমন উদাহরণ আছে জানার পর জ্যোতি বলেছেন, 'সাকিব ভাইয়েরটা ব্যতিক্রম, উনি সবার চেয়ে আলাদা। আমার মনে হয় মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যপারটাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমলে নেয়া দরকার কারণ আমরা সবাই শারিরীক সুস্থ্যতা বা ফিটনেসটা দেখি। আমি হয়তো টানা খেলছি বা চোটগ্রস্থ তাই আমি বিরতি নিলাম।কিন্তু সবকিছুই হচ্ছে মাথায়, ক্রিকেট খেলাটার ৭০%ই হচ্ছে মাথায়। বাকিটা হচ্ছে আমাদের ফিটনেস ও দক্ষতা। এই ব্যপারটা আরও সামনে নিয়ে আসা দরকার। খেলোয়াড়রা যেভাবে একটার পর একটা সিরিজ খেলছে,বড় টুর্নামেন্ট খেলছে; কেউ জিজ্ঞেস করে না আমরা ভাল আছি কি না। জিজ্ঞেস করা হয় আমরা ফিট আছি কি না।'

মানসিক অবসাদ অনেক সময়ই আসে টানা হার, ভাল পারফর্ম করতে না পারা থেকে। জ্যোতি জানালেন, 'একজন ক্রিকেটারের আগে আমি তো একজন মানুষ। তাই আবেগ এখানে অবশ্যই কাজ করে, ভাল লাগা খারাপ লাগা সবই। আমার মনে হয় আমরা খেলাটার শারিরীক সুস্থ্যতাকে এতটা গুরুত্ব দেই, আমরা দেখি কেউ শারিরীক ভাবে ফিট আছে কি না, কেন কেউ রান করতে পারছে না বা পারফর্ম করছে না, কেউ কেন বাররাব ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু একজন ক্রিকেটারকে ঘিরে প্রত্যাশার চাপ দিন দিন বাড়তেই থাকে,যে জন্য তাকে অনেক মানসিক চাপ নিতে হয়। এখন মেয়েদের ক্রিকেটেও প্রত্যাশা অনেক বেশি। কখনো দলের প্রত্যাশা থাকে, কখনো পরিবারের প্রত্যাশা থাকে, অনেক সময়ই অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় না।'

ইউএসএইড এর 'গতিময় সুস্থ্যতা' কার্যক্রমে এই মানসিকভাবে ভাল থাকাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যে অনুষ্ঠানে বক্তা হয়ে জ্যোতির আগমন। জ্যোতির কথা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এখনো মানসিক অবসাদকে সহজভাবে গ্রহণ করার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। অনুষ্ঠানে বক্তারা মানসিক সুস্বাস্থ্যের উপর জোর দেন এবং তরুণদের খেলাধূলায় সক্রিয় হবার আহবান জানান। অনুষ্ঠানে জ্যোতির পাশাপাশি আরও উপস্থিত ছিলেন নেমেসিস ব্যান্ড এর ভোকাল জোহাদ রেজা চৌধুরি ও যোগব্যায়ম প্রশিক্ষক শাজিয়া ওমর। ইউএসএইড এর এই কর্মসূচীতে তারা তিনজনই আছেন শুভেচ্ছাদূতের ভূমিকায়। আগামী কয়েক মাস ধরে ‘গতিতেই সুস্বাস্থ্য’ ক্যাম্পেইনের অধীনে আঞ্চলিক এবং জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচী'র আয়োজন করা হবে, যেখানে তরুণ, নারী ও কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে ফিটনেস পেশাজীবী, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সেলিব্রিটিরা একত্রিত হবেন এবং সুস্থ জীবনযাপনের প্রচার করবেন। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত