বিস্ফোরণঝুঁকিতে চট্টগ্রাম বন্দর

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:৫৮ এএম

রাসায়নিক পদার্থের বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে ২১৮টি কনটেইনারে সালফিউরিক অ্যাসিড এবং সোডিয়াম ও পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইডের মতো বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরনো এসব রাসায়নিক কনটেইনার ভেঙে বাইরে গড়িয়ে পড়ছে। ফলে লেবাননের বৈরুতের মতো বিস্ফোরণের আশঙ্কা করছে খোদ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি চারটি কনটেইনারে থাকা ১৪ বছরের পুরনো তরল রাসায়নিক ইয়ার্ড থেকে খালাস করা হলেও এখনো চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং ওভারফ্লো ইয়ার্ডের বিভিন্ন স্থানে ২১৮টি কনটেইনার রয়ে গেছে। এসব কনটেইনারের অনেকগুলো ভাঙা; কোনোটিতে পাউডার জাতীয় রাসায়নিক, আবার কোনোটিতে তরল রাসায়নিক রয়েছে। কনটেইনারের গ্যালন ভেঙে রাসায়নিক পদার্থ বাইরে গড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও কনটেইনারের ওপর গাছের চারা গজিয়েছে।

ডেনমার্কের শিপিং কোম্পানি মায়ের্স্ক চট্টগ্রাম বন্দরে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার পরিবহন করে থাকে। এ কোম্পানির ২৩৮৩১৭৮ নম্বরের কনটেইনারটি ভেঙে রাসায়নিকের গ্যালনগুলো বাইরে পড়ে আছে। কোরীয় মালিকানার কেএমটিসি শিপিং লাইন এখন কোনো পণ্য পরিবহন না করলেও এ কোম্পানির ১৮৪৫৩৬ নম্বরের কনটেইনারও ভাঙা। ২১৮টি কনটেইনারে রাসায়নিক পদার্থ থাকলেও সিসিটি-এনসিটি ইয়ার্ডে থাকা ৭৫টি কনটেইনার বেশি জীর্ণ ও ভাঙা। এসব কনটেইনারের মধ্যে পাতলা ক্যালসিয়াম কার্বনেট, সালফেট, সোডিয়াম সালফেটবোঝাই নয়টি কনটেইনার রয়েছে। এ ছাড়া ওভারফ্লো ইয়ার্ডে অতি বিপজ্জনক হিসেবে পরিচিত সালফিউরিক অ্যাসিড, জিংক অক্সাইড, পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড, মিথানল, সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড, ফসফরিক অ্যাসিড, ইথাইল অ্যাসিটেট ও কস্টিক সোডাবোঝাই আরও ১৩৪টি কনটেইনার পড়ে রয়েছে ২০ বছর ধরে।

জরাজীর্ণ এসব কনটেইনারের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় ২০ বছরের পুরনো কনটেইনারও রয়েছে। আমদানি করা পণ্য ডেলিভারি না নেওয়ায় প্রতি বছরই জমতে থাকে; কনটেইনারের পরিমাণ একসময় অনেক বেড়ে যায়। এসব কনটেইনারে রাসায়নিক পদার্থ থাকায় বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। বন্দরের গঠন করা তদন্ত কমিটির রিপোর্টেও ঝুঁকিপর্ণ রাসায়নিক সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তা সরাতে না পারায় ঝুঁকি বাড়ছে।’

ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের বিভাজন দরকার : চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক (বর্তমানে অবসরে) ও বাংলাদেশ রসায়ন সমিতির চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি জাফর আলম বলেন, ‘বন্দরের ইয়ার্ডে থাকা রাসায়নিক পদার্থগুলোকে বাছাই করতে হবে। কোন পদার্থগুলো ধ্বংস করা যাবে, কোনটি কোন প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করতে হবে কিংবা এসব পণ্যের কোনটি ব্যবহারের উপযোগী, তা পৃথক পৃথকভাবে যাচাই করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করতে হবে। সে কমিটি যেভাবে রিপোর্ট দেবে এগুলোকে সেভাবে ধ্বংস বা ব্যবহার করতে হবে।’

তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশে তৃতীয় একটি পক্ষ থাকে। যারা এসব ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য ধংস করে থাকে এবং বাছাইয়ের কাজও তারা করে। এ কাজ ব্যয়সাপেক্ষ।

এগুলো বাছাইয়ের এখতিয়ার চট্টগ্রাম কাস্টমসের। কাস্টমসের পণ্য ধ্বংসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার সাকিব হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রধান কাজ ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য সরিয়ে নেওয়া। যেগুলো পুনরায় ব্যবহার করা যাবে সেগুলো নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করব। আর যেগুলোকে পুনরায় ব্যবহার করা যাবে না সেগুলোকে ধ্বংস করার উদ্যোগ নিচ্ছি। গত সপ্তাহে চার কনটেইনার রাসায়নিক পদার্থ বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’

চট্টগ্রাম বন্দরে একাধিক অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে : বন্দরের বিভিন্ন শেডে রাসায়নিক উপাদানের কারণে বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকা- ঘটেছে উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক দিনমনি শর্মা বলেন, ‘২০২০ সালের ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরের দুই নম্বর জেটির কাছে তিন নম্বর শেডে অগ্নিকা- ঘটেছিল। ২০২২ সালের ১২ মে ৪ নম্বর গেটের কাছে একটি কনটেইনারে আগুন লেগেছিল। বন্দর সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যগুলো কোথায় কী অবস্থায় রয়েছে, তা জানা থাকলে আগুন লাগার আগেই আমরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে পারি; আর আগুন লেগে গেলে অগ্নিনির্বাপণে সঠিক ব্যবস্থা নিতে পারি।’

এদিকে কাস্টমস এক বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, বন্দরের ভেতরের রাসায়নিক পদার্থগুলো সরিয়ে নেওয়া না হলে লেবাননের বৈরুত বন্দরের মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৪ আগস্ট লেবাননের বৈরুত বন্দরে রাসায়নিক বিস্ফোরণে ১০০ জনের মৃত্যু ও সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিল।

লোকসান গুনছে শিপিং কোম্পানিগুলো : একটি কনটেইনার মাসে গড়ে একটি করে ভয়েজ (ভাড়ায় যাওয়া) করতে পারে। সে হিসাবে বছরে ১২টি ভয়েজ করতে পারার কথা। প্রতিবার ভাড়া সর্বনিম্ন ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এসব কনটেইনার বন্দরে জমা থাকায় একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে কনটেইনারগুলো নষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়ে এমএসসি শিপিং লাইনের উপমহাব্যবস্থাপক আজমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘শুধু আমাদেরই প্রায় ৩৫০ কনটেইনার প্রায় ১৩ বছর ধরে আটকা রয়েছে। এতে দুই ধরনের ক্ষতি। এক. আমরা ভাড়াবঞ্চিত হচ্ছি; দুই. আমাদের কনটেইনারগুলো নষ্ট হচ্ছে।’

বিশে^র সব বন্দরে কনটেইনার থেকে পণ্য নামিয়ে কনটেইনার খালি করে দেওয়া হলেও আমাদের দেশে এর ব্যতিক্রম হয় বলে জানায় শিপিং কোম্পানিগুলো। শুধু তাই নয়, কনটেইনার নিলামে বিক্রি না হলে পণ্য ধ্বংস করার পর কনটেইনার ভাড়া বাবদ কোম্পানিগুলো কোনো টাকা পায় না। নিলামে বিক্রি হলে বিক্রির টাকার একটি অংশ শিপিং কোম্পানি পেয়ে থাকে।

এসব রাসায়নিক পণ্য ধ্বংস কবে হবে? : বন্দরের ২০-২২ বছর আগের এসব পণ্য কবে ধ্বংস করা হবে জানতে চাইলে কাস্টমসের সহকারী কমিশনার সাকিব হোসাইন বলেন, ‘আমাদের অর্থ সংকট রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের সহায়তা পেলে আমরা পণ্যগুলো ধ্বংস করব। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। অনুমোদন পেলেই বন্দরের সহায়তায় ধ্বংস করা হবে।’

কাস্টমসের বক্তব্যের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘কাস্টমস আমাদের কাছে লজিস্টিক সাপোর্ট চেয়েছে। আমরা সহায়তা করব।’

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়ে থাকে। দেশের অর্থনীতিতে এ বন্দরের গুরুত্ব অনেক। রপ্তানি পণ্য থেকে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদনি হচ্ছে রাসায়নিক পণ্য। পণ্য খালাসের পর ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক ডেলিভারি না নিলে তা নিলামযোগ্য হয়ে যায়। নিলাম বা ধ্বংস করার এখতিয়ার চট্টগ্রাম কাস্টমসের। সম্প্রতি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের দুটি জাহাজে বিস্ফোরণ ও আগুন লাগার পর এলপিজিবাহী জাহাজে অগ্নিকান্ডের শঙ্কায় রয়েছে জ্বালানি খাত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত