বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে গত ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা আন্দোলন শুরু হয়। ওই আন্দোলন একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অবসান ঘটে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের। ভারত চলে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ ৫ নভেম্বর ঐতিহাসিক এ ঘটনার তিন মাস পূর্ণ হলো। এই আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। অভ্যুত্থানের পরও অন্তর্বর্তী সরকার গঠন থেকে শুরু করে দেশ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তারা। তবে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি ইস্যুতে হোঁচটও খেয়েছেন ছাত্রনেতারা। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে পড়ে। তবে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে ছাত্র-জনতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ৮ আগস্ট দেশে ফিরে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে এতে যুক্ত হন আন্দোলন অন্যতম দুই সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এরপরও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে সরকার এবং আন্দোলনকারীরা। পুলিশ, প্রশাসনসহ দেশের প্রায় সব সেক্টরে আসে পরিবর্তন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে এক দফার ভিত্তিতে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, সেটি এখনো পূরণ হয়নি। ফ্যাসিবাদের বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এখনো হয়নি। গণহত্যার বিচার এখনো হয়নি। এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সচল করা, দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানা, সিন্ডিকেট ভাঙাসহ অনেক ক্ষেত্রেই অসমর্থতা লক্ষ করা গেছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক ঐকমত্য না হওয়ায় সংবিধান, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে পড়েছে সরকার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তাড়াহুড়ো এবং ভুল সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী বলে মনে করেন কেউ কেউ।
গত ২২ অক্টোবর শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদচ্যুতি, ৭২-এর সংবিধান বাতিল, ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করাসহ পাঁচ দফা দাবিতে সময়সীমা বেঁধে দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তাদের আলটিমেটাম শেষ হলেও এক ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা ছাড়া আর কোনো দাবিই পূরণ হয়নি। বিশেষ করে সংবিধান বাতিল এবং রাষ্ট্রপতির অপসারণে বিএনপির মত না পাওয়ায় আলোর মুখ দেখেনি তাদের দাবি। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির অফিসে আগুন দেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সমালোচনার সৃষ্টি হয়। যদিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেউ এর সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন সমন্বয়ক সারজিস আলম। এ ছাড়া সমালোচনার মুখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ১১টি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার নির্দেশনা চেয়ে করা রিটও প্রত্যাহার করা হয়। সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামের ‘মেট্রোরেলে আগুন না দিলে কিংবা পুলিশ হত্যা না করা হলে, এত সহজে বিপ্লব অর্জন করা যেত না’ আপত্তিকর বক্তব্যের কারণেও বিপাকে পড়তে হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে। পরে তাকে শোকজ করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়ক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কয়েকটি সিদ্ধান্ত একটু সময় নিয়ে করা উচিত ছিল। জাতীয় পার্টির অফিসে আগুন দেওয়ার ঘটনার আগে আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুকে পোস্ট না করলে হয়তো সমালোচনার সৃষ্টি হতো না। এ ছাড়া আরেকটু চিন্তাভাবনা করে রিট করা গেলে সমালোচনা হতো না। হাসিব আল ইসলামের বক্তব্য নিয়েও আমরা অনেকটাই বিপাকে পড়েছি। তবে আশা করি, সব সংকট কাটিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা পূরণে কাজ করবে।’
গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা শিক্ষার্থীরা বলছেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের তিন মাস পূরণ হতে চললেও প্রত্যাশা ঠিকঠাক পূরণ হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সচল হয়নি। ফ্যাসিবাদের বিলোপ করা যায়নি। নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন করাই বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরমানুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের সাম্য মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দিতেই এই গণ-অভ্যুত্থান। অন্তর্বর্তী সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটানোর। তবে এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সচল করা যায়নি। গণহত্যায় জড়িতরা এখনো ঘুরঘুর করছে প্রকাশ্যে, আহত বা নিহতদের ন্যায়বিচার বা চিকিৎসা-ক্ষতিপূরণের বিষয়টাও যথাযথভাবে এ সরকার পালন করতে পারছে না বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রেদ্ওয়ান আহমদ বলেন, ‘বর্তমান সরকার সাংবিধানিক সরকার, না বিপ্লবী সরকার এই সিদ্ধান্তে যেমন পৌঁছানো যায়নি, তেমনি পৌঁছানো যায়নি এখনো আমরা কি সংবিধান সংশোধন করব, নাকি আবার লিখব সে সিদ্ধান্তে। একদিকে প্রায় ভেঙে পড়েছে পুলিশ প্রশাসন। নির্বাহী বিভাগ থেকে পুরোপুরি সহযোগিতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, সরকার এতগুলো সংস্কার কমিটি করলেও সেখানে নেই শিক্ষা সংস্কার কমিটি। নবজাগরণকে প্রতিষ্ঠায় নেই তেমন শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা। এ ছাড়া পুরাতন রীতিতে চাঁদাবাজি হাজির হয়েছে আবারও। এসব কারণে প্রতিনিয়ত ভঙ্গ হচ্ছে সাধারণ জনগণের স্বপ্নের পারদ।
এখনো জনমনে সন্তুষ্টি ফেরেনি উল্লেখ করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারুফ হোসেন বলেন, ‘সংস্কার করতে হবে গোড়া থেকে। বৈষম্য, শোষণ ও নির্যাতনের সব সিস্টেমকে এমনভাবে বদলে দিতে হবে, যেন কেউ নতুন করে ক্ষমতায় এসে আগের স্বৈরাচার রূপ ধরন করতে না পারে। আমাদের প্রত্যাশা এমন নাগরিকবান্ধব সিস্টেমের যেখানে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, নাগরিকরা স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারবে, নিরাপদ ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারবে।’
ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের গত সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসন থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অবশ্যই কঠিন এবং সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। এ ছাড়া এত বেশি দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে, আমাদের মূল কাজে ফোকাস করা কঠিন হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তাদের চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছেন। আমরা যে পাঁচ দফা দাবি দিয়েছি, সেটা পূরণ হলেই আমাদের গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা অনেকটাই পূরণ হবে বলে আমরা মনে করি।’
মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসুদ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ সম্পূর্ণ বিলোপে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বৈষম্য এবং ফ্যাসিবাদ বিলোপ আমাদের অন্যতম দাবি। সবপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় সেটি কঠিন বটেই। তবে আমরা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সব সমস্যা এবং সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। অভ্যুত্থানের যে আকাক্সক্ষা এবং মানুষের প্রত্যাশা, সেটা পূরণ না করা পর্যন্ত আমরা দমে যাব না।’
