মেয়েদের বোনাস ছেলেদের আশ্বাস

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ১১:০০ এএম

টানা সাফ জয়ের পর পাদপ্রদীপের আলোয় নারী ফুটবলাররা। নেপালে স্বাগতিকদের ফাইনালে কাঁদিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা সাবিনাদের এর মধ্যেই পুরস্কৃত করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও দিয়েছে বড় বোনাসের ইঙ্গিত। শনিবার নবনির্বাচিত নির্বাহী কমিটির প্রথম সভায় হবে সিদ্ধান্ত, আসবে ঘোষণা। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিও এমন বিজয়ে মেয়েদের দিতে চান সংবর্ধনা। এসব কিছুই প্রাপ্য শিরোপাজয়ীরা। তবে এই জায়গাটাতে ভীষণ দুর্ভাগা পুরুষ দলের ফুটবলাররা। একে তো, দীর্ঘদিন তারা কোনো সাফল্য এনে দিতে পারেনি। তারপরও বিচ্ছিন্ন কিছু ভালো পারফরম্যান্সের পর বাফুফে থেকে পুরস্কারের আশ্বাসও পায়নি বাস্তব রূপ। বাফুফের নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর বকেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ নিয়ে তাই শঙ্কায় জামাল ভূঁইয়া-তপু বর্মণরা।

গত বছর অক্টোবরে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ও ২০২৭ এশিয়ান কাপ যৌথ বাছাইয়ের প্রথম রাউন্ডে মালদ্বীপকে পেছনে ফেলে পরের ধাপে পৌঁছেছিল বাংলাদেশ। মালেতে ১-১ ড্রয়ের পর বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় মালদ্বীপকে ২-১ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশ নাম লিখিয়েছিল গ্রুপপর্বে। তাতে খুশি হয়ে বিগত চার মেয়াদের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ৬০ লাখ টাকা প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নির্বাহী কমিটির সভার সিদ্ধান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আকারেও প্রচার করেছিল বাফুফে। অথচ প্রণোদনার আশ্বাস আলোর মুখ দেখেনি, পৌঁছায়নি সেই মালদ্বীপের বিপক্ষেই আসছে ফিফা উইন্ডোতে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে যাওয়া জাতীয় দলের ফুটবলারদের হাতে।

২৬ অক্টোবর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছেন ১৬ বছর ফুটবল শাসন করা সালাউদ্দিন। তার স্থলাভিষিক্ত তাবিথ আউয়াল শনিবার প্রথম সভায় বসবেন সহযাত্রীদের নিয়ে। নবনির্বাচিত কমিটিতে নতুন মুখের সংখ্যাই বেশি। তবে পুরনো যারা আছেন, তাদের প্রণোদনার সেই ঘোষণা নিশ্চয়ই ভুলে যাওয়ার কথা নয়। গত বছর ২১ অক্টোবর কার্যনির্বাহী কমিটির ষষ্ঠ জরুরি সভায় হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত। এরপর কেটেছে পুরো এক বছর। সালাউদ্দিন নেতৃত্বাধীন কমিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষার কোনো উদ্যোগই নেয়নি। জাতীয় দলের বর্তমান স্কোয়াডে থাকা একজন ফুটবলার এ নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমরা তো বাফুফের কাছে কোনো পুরস্কার চাইনি। বরং তারাই ঘোষণা দিয়েছিল। এক বছর চলে যাওয়ার পরও সেটা ঘোষণা পর্যন্তই থেকে গেছে। এখন তো আগের সভাপতি বিদায় নিয়েছেন। তার সেই প্রতিশ্রুতির এখন কী হবে, একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন।’

তপুরা তারপরও একটা প্রতিশ্রুতি পূরণের আশায় রয়েছেন। গত আগস্টে নেপালেই স্বাগতিকদের হারিয়ে অনূর্ধ্ব-২০ সাফ জিতেছিল বাংলাদেশের যুবারা। অথচ তাদের জন্য কোনো বোনাসের ঘোষণাই আসেনি। বয়সভিত্তিক আসর হলেও দীর্ঘদিন পর পুরুষ ফুটবলে একটা শিরোপা দেখা মিলেছে। এর একটা স্বীকৃতি কিন্তু প্রাপ্য মিরাজুল ইসলাম, রাব্বি হোসেন রাহুলরাও।

বোনাস নিয়ে বাফুফের নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকাতেই হয়েছে যত সমস্যা। এ ক্ষেত্রে তারা চাইলে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের বোনাস নীতিমালা অনুসরণ করতে পারে। আর কিছু না হোক, বিওএ বহু বছর ধরেই এই নীতিমালা অনুসরণ করে চলছে বলেই থাকতে পারছে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরে পদকজয়ীদের জন্য বোনাসের অর্থটা আগেভাগেই নির্দিষ্ট করে রেখেছে বিওএ। ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ আসর অলিম্পিক গেমসে সোনা, রুপা ও ব্রোঞ্জজয়ী ক্রীড়াবিদদের জন্য যথাক্রমে ২ কোটি, ১ কোটি ও ৫০ লাখ টাকা পুরস্কারের অঙ্ক উল্লেখ রয়েছে বোনাস পলিসিতে। এ ছাড়া অলিম্পিকে দলগত সাফল্যের জন্য যথাক্রমে ৩ কোটি, দেড় কোটি ও ১ কোটি টাকা দেবে বিওএ। এভাবে এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস, ইয়ুথ অলিম্পিক গেমস, ইসলামিক সলিডারিটি গেমস, এসএ গেমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরের জন্য পুরস্কারের অঙ্কও আগেভাগে নির্ধারিত করা আছে।

চাইলে বাফুফেও পারে এ রকম একটা নীতিমালা করতে। যদিও একটা রূঢ় বাস্তবতাও এড়ানোর সুযোগ নেই। সালাউদ্দিন জমানায় বাফুফে একটা অন্তঃসারশূন্য প্রতিষ্ঠানের রূপ নিয়েছে। ফিফা-এএফসির অনুদান গত কয়েক বছরে ছিল বাফুফের অন্যতম আয়ের উৎস। এক বসুন্ধরা গ্রুপ ছাড়া সেভাবে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ফুটবল পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়ে আসতে পারেননি সালাউদ্দিন। ফলে তহবিলের অবস্থা বড্ড সঙ্গীন। তার ওপর তাবিথ-ইমরুল হাসানদের কাঁধে সালাউদ্দিন চাপিয়ে দিয়ে গেছেন বিশাল (প্রায় ১৪ কোটি টাকা) ঋণের বোঝা। তাই এ মুহূর্তে নিজস্ব তহবিল থেকে মেয়েদের বোনাস দেওয়ার সামর্থ্য নেই বাফুফের। গুঞ্জন আছে, মেয়েদের এই বোনাসটা নতুন কমিটির সব সদস্য নিজেদের পকেট থেকে দেওয়ার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন শনিবারের সভায়। একজন কর্মকর্তার কথায় মিলেছে সেই ইঙ্গিত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেছেন, ‘নির্বাহী সদস্যরা প্রত্যেকে ৫ লাখ টাকা, চার সহসভাপতি ১০ লাখ করে, সিনিয়র সহসভাপতি ১৫ লাখ এবং সভাপতি যদি ২০ লাখ টাকা দেন, তবেই প্রায় দেড় কোটি টাকার মতো উঠে যায়। এখন দেখার এভাবে সবাই ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে আসবেন কি না।’

ভগ্নপ্রায় একটা প্রতিষ্ঠানকে শক্ত ভীতে দাঁড় করাতে সময়ের প্রয়োজন। সেই সময়টা পাওয়ার আগেই মেয়েদের বোনাসের কথা ভাবতে হচ্ছে বাফুফের নতুন কমিটিকে। এ অবস্থায় বিগত সভাপতি প্রতিশ্রুত অর্থের জন্য ছেলেদের অপেক্ষাটা বাড়বেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত