পানিতে জলবায়ু তহবিলের কোটি কোটি টাকা

  • প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা
  • খরচ হয়ে গেছে ৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা
  • অনুমতি নেই তাই এক-তৃতীয়াংশ কাজ করেই প্রকল্প সমাপ্ত
  • নদী হারিয়েছে অস্তিত্ব, কাটা পড়ত প্রায় ৫০ হাজার গাছ
আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০২ এএম

বন বিভাগের আপত্তির কারণে আট বছর আগে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিধ্বংসী একটি প্রকল্প এক-তৃতীয়াংশ কাজ করেই শেষ করতে হয়েছে। তবে প্রকল্পের একটি বাঁধ নির্মাণে পৌনে ৭ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। বাঁধটি কোনো কাজেই লাগছে না। ফলে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের টাকা জলে গেল। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সঠিক সমীক্ষা ছাড়া, বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কাজ করার ফল এটি। সরকারি টাকার অপচয়ের দায় সংশ্লিষ্টদেরই।

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের সঙ্গে চরফ্যাশন উপজেলা হয়ে ভোলা জেলা শহরের সরাসরি সড়কসংযোগ স্থাপনের জন্য ১৪ বছর আগে ক্রসড্যাম (আড়াআড়ি বাঁধ) নির্মাণের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে, নদীতে বাঁধ দিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। শুরুতেই দুই হাজার গাছ কাটা পড়েছিল। বন বিভাগ জানিয়েছে, পুরো প্রকল্প হলে কাটা পড়ত প্রায় ৫০ হাজার গাছ। উজাড় হতো সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন, অস্তিত্ব হারাত খরস্রোতা নদী। কর্মহীন হতো শত শত জেলে।

এসব কিছু আড়ালে রেখে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ প্রকল্পটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে পরিবেশ রক্ষার জন্য গঠন করা জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল থেকেই অনুমোদন করা হয়েছিল। সরেজমিন ঘুরে চাঞ্চল্যকর কিছু বিষয় জানা গেছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের যে পথরেখা দেখানো হয়েছিল, সেটি অনুযায়ী রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরবেষ্টিন থেকে চরবনানী হয়ে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চরইসলাম, চরমাইনকা পর্যন্ত প্রকল্পটি প্রসারিত। বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথরেখার ৩ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার রাঙ্গাবালী অংশে আর বাকি ১ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার চরফ্যাশন অংশে। রাঙ্গাবালী প্রান্তের দক্ষিণে ‘বনানী’ নদীতে একটি বাঁধ ও চরফ্যাশন প্রান্তের উত্তরে তেঁতুলিয়া নদীর একটি শাখায় আরেকটি বাঁধ নির্মাণ ও সংযোগ সড়ক করার মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল।

রাঙ্গাবালীর চরবেষ্টিন এলাকার বনানী নদীতে ক্রসড্যাম

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কলাপাড়া নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে জানা গেছে, জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের আওতায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রকল্পটি নেয়, নাম ‘চরমাইনকা-চরইসলাম-চরমোন্তাজ ক্রসড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে ভূমি পুনরুদ্ধার’ প্রকল্প। ২০১০ সালের ৩০ নভেম্বর এটি অনুমোদন পায়। ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। কাজটি পায় বরিশালের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রূপালী কনস্ট্রাকশন।

ভূমি পুনরুদ্ধারের নামে এ প্রকল্পের শুরুতেই কাটা পড়েছিল শত শত গাছ। রাঙ্গাবালী অংশের চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরবেষ্টিন থেকে চরলক্ষ্মী পর্যন্ত ‘বনানী’ নামে নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল শুরুতেই। উজাড় হয়েছিল ম্যানগ্রোভ বনের প্রায় দুই হাজার গাছ। বন বিভাগের ভাষ্যমতে, কেওড়া, ছইলা ও গেওয়া প্রভৃতি গাছ কেটে বাঁধ নির্মাণ হয়েছিল। পরে বন বিভাগের আপত্তিতে চরবনানী থেকে সংযোগ সড়ক ও চরফ্যাশন অংশের বাঁধ নির্মাণ বন্ধ হয়। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বন বিভাগের চিঠি চালাচালিতে কেটে যায় পাঁচ বছর।

বন বিভাগের চরমোন্তাজ রেঞ্জ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চরবেষ্টিনে ১৯৭৮-৭৯ এবং চরবনানীতে ১৯৮৬-৮৭, ১৯৮৮-৮৯ ও ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে ছইলা, কেওড়া ও গেওয়াগাছ লাগানো হয়। প্রকল্পের জন্য এক হাজার হেক্টরের এ বনভূমির সাড়ে তিন কিলোমিটার উজাড় করতে হতো। কাটা পড়ত প্রায় ৫০ হাজার গাছ। এ কারণেই বন বিভাগ আপত্তি জানিয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, সংরক্ষিত বনের ভেতরে ক্রসড্যাম নির্মাণের জন্য ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র প্রসঙ্গে ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল থেকে প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের এক চিঠি থেকে জানা যায়, প্রধান বন সংরক্ষক প্রস্তাবিত ক্রসড্যাম নির্মাণে বন অধিদপ্তরের ছাড়পত্র দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায়ই ২০১৭ সালে প্রকল্পটির সমাপ্তি হয়। তবে পাউবো দাবি করেছে, বাঁধ নির্মাণের ফলে ২০৩ একর জমি উদ্ধার হয়েছে।

বন বিভাগের চরমোন্তাজ রেঞ্জের কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, ‘বন বিভাগের ম্যানগ্রোভ বনের মধ্য দিয়ে ২০১১ সালে বন বিভাগের অনাপত্তিপত্র গ্রহণ ছাড়াই চরবেষ্টিন-চরলক্ষ্মী হয়ে ভোলার অংশ পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়ন হলে বনের ৪০ থেকে ৪৫ হাজার গাছ কাটা পড়ত। একপর্যায়ে বন বিভাগ বন রক্ষার্থে ও পরিবেশের ভারসাম্য রাখতে গাছ না কাটার বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড পটুয়াখালীকে আপত্তিপত্র দেয়। পরে বাঁধ নির্মাণের কাজ বন্ধ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড।’

২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর এ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত মাহবুবুর রহমান তালুকদার। তার সঙ্গে বোঝাপড়া করে ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। ২০১৪ সালে জ্যাকব পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী হয়ে বন্ধ থাকা কাজটি শুরু করার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

জানা গেছে, প্রকল্পের শুরুতে ভোলার সঙ্গে রাঙ্গাবালীর সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল রাঙ্গাবালীবাসীকে। তাই উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছিল সবাই। কিন্তু জ্যাকবের মূল টার্গেট ছিল রাঙ্গাবালী থেকে চরমোন্তাজ ও সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পট ‘সোনারচর’কে ছিন্ন করে চরফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত করা। জ্যাকবের স্বপ্নপূরণের জন্যই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। তার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান। পরে চরমোন্তাজকে চরফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত করার এক মামলায় জ্যাকবের ইচ্ছার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় জ্যাকবের ইচ্ছা অপূর্ণই থাকল।

পাউবোর কলাপাড়া কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরবেষ্টিন থেকে চরবনানী পর্যন্ত ৬৫০ মিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ২ দশমিক ৪ কিলোমিটারের সংযোগ সড়ক হয়নি। চরফ্যাশন উপজেলার চরমাইনকার ৭০০ মিটার বাঁধ করা যায়নি, ২ দশমিক ৮৫ কিলোমিটারের সংযোগ সড়কও হয়নি। তবে চরবেষ্টিন-চরবনানী বাঁধ নির্মাণে ৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে একটি খরস্রোতা নদীতে বাঁধ দেওয়া হলো। নদীটি নাব্যর সংকটে অস্তিত্ব হারিয়েছে। শত শত জেলে জীবিকা হারিয়েছে। কাটা পড়েছে অনেক গাছ। এ দায় কার?

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বনায়ন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. শাহরিয়ার জামান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে অর্থের জোগান দেয় জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড। এ তহবিলের কিছু হতাশাজনক ব্যবহার দেখেছি। নদীতে বাঁধ দিলে দুটি বিষয়ে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হয়। এক. নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ঝুঁকি, দুই. নদীর নাব্য সংকট। দুটি বিষয় একসঙ্গে দেখা দিলে ওই নদীর জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। শুধু তাই নয়, বাঁধের সঙ্গে সংযোগ সড়ক স্থাপনের বিষয়টিও জড়িত থাকে।

তিনি বলেন, চরবেষ্টিনের ওই নদীরে দুপাশে যে বিস্তীর্ণ বনভূমি রয়েছে, তা সংযোগ সড়ক নির্মাণের ফলে অনেকটাই ধ্বংস হতো। সঠিক সমীক্ষা ছাড়া যে বাঁধটি করা হলো সে কারণে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের টাকা জলে গেল- এর দায় কে নেবে? আরেকটি বিষয় হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বনভূমির কথা গোপন করা হয়েছে। জলবায়ু ট্রাস্টের টাকা ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারছি নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছি- এটা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখার সময় এসেছে এখন। ফান্ডের টাকা ব্যবহারে সতর্ক দৃষ্টি থাকা উচিত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত