অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব কি বাড়ছে

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৪০ এএম

গত ৮ নভেম্বর নতুন সরকার গঠনের তিন মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে সরকারকে দেখতে চেয়েছিল তা কতটুকু অর্জিত হয়েছে? স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন জনমানসে ঘুরপাক খায়। প্রশ্ন হচ্ছে, গত পনেরো বছরের বেশি সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে জনগণের সীমাহীন যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কতটা দূর করা সম্ভব হয়েছে? নতুন বাস্তবতায় সরকারের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ কতটা ঘনিষ্ঠ হয়েছে বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে? নিঃসন্দেহে এই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ শাসনব্যবস্থা তখনই গণতান্ত্রিক হবে যখন এর সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ স্থাপিত হবে। যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমেই সরকার জনগণের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারে এবং মনোভাব বুঝতে পারে। আর এর মাধ্যমেই সরকার রাষ্ট্র পরিচালনের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেয়ে থাকে। আমরা যে কাক্সিক্ষত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য আবহমানকাল সংগ্রাম করে চলছি সে কাক্সিক্ষত ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা, জনগণের বাস্তব অবস্থার পর্যালোচনা করা ও তার মনোভাব বোঝা ইত্যাদি বিষয় খুব জরুরি।

আওয়ামী সরকার যে ক্রমান্বয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলেছিল তার প্রমাণ এই সদ্য দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টি। এই সময়ে আমরা দেখেছি একের পর এক পেশাজীবী গোষ্ঠী ও অন্যরা নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় বের হয়ে এসেছে এবং দাবিগুলো জনগণ ও রাষ্ট্রের কাছে উত্থাপন করছে। এই দাবি-দাওয়াগুলোর সবগুলোই যে যৌক্তিক তা হয়তো না। তবে প্রত্যেকটা দাবির ন্যায্য সমাধান দরকার। দাবি-দাওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংলাপ খুব জরুরি এবং বাস্তবতার নিরিখে একটি যৌক্তিক সমাধানে আসতে পারাটাই ন্যায্যতা।

এক্ষেত্রে বর্তমান সরকার সম্পর্কে জনগণের পারসেপশন বা ধারণা কী তা বোঝা খুব জরুরি। সরকার যদি নিজেদের গণতান্ত্রিক পরিচিতি বজায় না রাখতে পারে এবং ন্যায্য আচরণ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে দাবি উত্থাপনকারী কোনো গোষ্ঠীই সন্তুষ্ট হবে না সেটাই স্বাভাবিক। এই বিবেচনায় প্রশ্ন করা অযৌক্তিক হবে না যে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের গণতান্ত্রিক পরিচিতি তারা কতটুকু ধরে রাখতে পারছে? তারা কি ন্যায্যতার মাপকাঠিতে নিজেদের পরিমাপ করতে পারছে? নাকি কোনো কোনো গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে? কাউকে কি একটু বেশি সুযোগ দিচ্ছে বা অন্যকে বঞ্চিত করছে? এ সবই ন্যায্যতা ও অন্যের সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। 

এই সরকারের সঙ্গে যারা যুক্ত হচ্ছেন, সাধারণ ধারণা হচ্ছে কাজের সূত্র ধরেই এই সরকারের সঙ্গে জনগণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। এদের মধ্যে অনেকেই মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও এনজিওর সঙ্গে যুক্ত। তবে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের বাস্তব অবস্থা সরকার কতটুকু ধারণ করতে পারছে, জনস্বার্থ কতটুকু সংরক্ষণ করতে পারছে তা আলোচনার বিষয়। বেশ কিছু সিদ্ধান্ত দেখে মনে হয় সরকার জনগণের সার্বিক বিষয়গুলো ধরতে পারছে না। এসব ক্ষেত্রে অর্থনীতি, জীবন-জীবিকা, জনজীবনের নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ইত্যাদি বিষয় যেন ঘুরেফিরে আসছে। সরকারের কাছে কোনটা অগ্রাধিকার সে বিষয়গুলো ঘুরেফিরে আসছে। জনগণের অগ্রাধিকার কি সরকার নিজেদের অগ্রাধিকার ভাবছে, না নিজেদের অগ্রাধিকারকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে? আর এজন্য কি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা নিত্যনতুন বয়ান তৈরি করছেন?

এটা সত্যি সরকারে যোগদানের আগে থেকেই এই সরকারের বেশিরভাগ উপদেষ্টা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে উজ্জ্বল। জনমতও তাই। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব উন্নয়ন এজেন্ডা ও কর্মপদ্ধতি আছে। তবে সরকারে যোগদানের পর তাদের নিজস্ব অগ্রাধিকারগুলো স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কতটুকু প্রাসঙ্গিক তা তাদের পর্যালোচনায় থাকা দরকার। এই অগ্রাধিকারগুলোতে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার আগে পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন কি না বা পরিবেশ তৈরি করেছেন কি না? পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া যে কোনো ধরনের প্রগ্রেসিভ উদ্যোগ বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে। জনগণের অগ্রাধিকার যদি তার জীবন-জীবকা সংশ্লিষ্ট হয় তাহলে অন্যকিছুই এর সঙ্গে পাত্তা পাবে না। বরঞ্চ বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক ইস্যু সম্পর্কে জনগণের মধ্যে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।

ইতিমধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে সরকারের জায়গা থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে পলিথিন বন্ধ করাসহ সেন্ট মার্টিনে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আলোচনায় আছে। গত সপ্তাহে ঢাকার রাস্তা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করাসহ রিকশা জব্দ ও নিলামে বিক্রি করার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য পলিথিন একটি আত্মঘাতী উপকরণ, পলিথিন বন্ধের কোনো বিকল্প নেই এবং পলিথিনের বিকল্প খুঁজে বের করাও কঠিন কোনো বিষয় নয়। সে ক্ষেত্রে পলিথিনের বিকল্প বের করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে এর অর্থনৈতিক প্রভাব কী তাও খুঁজে বের করা দরকার। একই যুক্তি খাটে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। এর ফলে পরিবেশের ওপর প্রভাব যাচাইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটি ও সার্বিক পর্যটন খাতের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে সেই বিশ্লেষণ করা দরকার। শুধু তাই না আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এই উদ্যোগগুলো যে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে তা বোঝার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। সরকারের দায়িত্ব নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সার্বিক উদ্যোগ গ্রহণ এবং এজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা। আর এখানেই একটি উন্নয়ন সংগঠন ও সরকারের কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য। সরকার হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না। সরকারের সিদ্ধান্ত হতে হবে গঠনমূলক ও সুদূরপ্রসারী এবং একই সঙ্গে কার্যকরী। হুট করে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে না পারার মতো বিব্রতকর আর কিছু হতে পারে কি?

একই কথা প্রযোজ্য সরকার গণতান্ত্রিক চর্চা ও রীতিনীতির প্রশ্নে। বৈষম্যবিরোধী নীতির প্রতি অটুট থাকাই এই অন্তর্বর্তী সরকারের গণতান্ত্রিক বৈধতা। সেই নীতি থেকে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতি এই সরকারের গণতান্ত্রিক বৈধতার বিচ্যুতি। আমাদের সরকার ও অ্যাক্টিভিস্টের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। অ্যাক্টিভিজমে অনেক কিছুই বলা যায় এবং করা যায়; যা একটি সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগ থেকে আন্দাজ করতে কষ্ট হয় না যে তারা সবার প্রতি বৈষম্য বিলোপের নীতিতে অটল থাকতে পারছে না। ধীরে ধীরে সরকারের ও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠদের মধ্যে নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা ও এজেন্ডা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। তা যেমন কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে তেমনি আবার অন্য মত ও পথের সঙ্গে যোজন যোজন পার্থক্য তৈরি করছে। ফলে সংস্কারের জন্য যে রাজনৈতিক ঐক্যের দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ দরকার তা বজায় থাকছে। সরকারে যারা আছেন তাদের কারও কারও মধ্যে সরকারি চরিত্র থেকে অ্যাক্টিভিস্ট পরিচয় বড় হয়ে উঠছে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় এই পরিচয় ঝেড়ে ফেলে সত্যিকারের জনমানুষের সরকার হওয়া ছাড়া সমস্যা দিনে দিনে বাড়বে বৈ কমবে না। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না দেশের সব মানুষের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শুধু কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে দেখভাল করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের না। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রে এই নীতি আরও বেশি প্রযোজ্য।

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে বিপুল জনসংখ্যার চাপ প্রায় সবক্ষেত্রেই মোকাবিলা করতে হয়। জনসংখ্যা তখনই সম্পদ যদি তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়। জনগণের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করে বা জনগণের আর্থসামাজিক বিষয়গুলো বিবেচনা না করে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব না। এভাবে কোনো সংস্কার কর্মকাণ্ড দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এখানকার পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন ইস্যুগুলোকে সার্বিকভাবে বিবেচনায় না নিয়ে শুধু মাত্র তত্ত্বের জায়গা থেকে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এই ধরনের যেকোনো উদ্যোগ সরকারকে একটি বিশেষ শ্রেণি চরিত্রের খোলসেই আবদ্ধ করবে। যা সরকারকে শুধু ধীরে ধীরে জনগণের কাছ থেকে দূরেই ঠেলে দেবে না, বৈষম্য বিলোপের কাক্সিক্ষত সংস্কার থেকেও দূরে চলে যেতে হবে আমাদের।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত