ক্ষুদ্রদের দুর্ভাগ্য

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৪১ এএম

অনেকেই বলেন, আমি চাকরি করব না। উদ্যোক্তা হব। কিন্তু যখন স্বল্প পুঁজি নিয়ে পা বাড়ান, তখন মুখোমুখি হন নানা সমস্যার। আসলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারা বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একটি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি শিল্পে প্রতিযোগিতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে এই খাত। অথচ বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বরাবর মূলধারার বাইরে। দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের সময়মতো এসএমই ঋণ দেয় না। দেখায় নানান রকমের অজুহাত, করে হয়রানি। আবার বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার জন্য তারাই ‘হাঁ’ করে থাকেন। এর নেপথ্য কারণ বুঝতে মাথা ঘামাতে হয় না। নীতিমালার দোহাই দিয়ে এ উদ্যোক্তাদের ক্রমাগত নিরাশ করা হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন উদ্যোক্তারা মনোবল হারিয়ে ব্যবসা ছোট করে আনছেন, অন্যদিকে বাড়ছে বেকারত্ব। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এসএমই উদ্যোক্তারাই অর্থনীতিতে রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

আসলে কত টাকা পুঁজি আছে বা কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তা নয়, বরং একজন উদ্যোক্তার বড় পুঁজি নতুন কিছু করার ইচ্ছা।  বেশিরভাগ উদ্যোক্তা প্রধানত পুঁজির সংকটে ভুগছেন। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো এসএমই খাতে গড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদ নিচ্ছে। যদিও কেউ কেউ বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভবিষ্যৎ। এসএমই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল ভূমিকাই হলো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার সমর্থন করা এবং জিডিপি হার বাড়ানো। যদিও ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে। আবার এই ২৫ শতাংশের অর্ধেক দিতে হবে কুটির, মাইক্রো (অতিক্ষুদ্র) ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে। এই নির্দেশনা শুধু কথার কথা। যথাযথ কাগজের অভাবে নতুন ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তারা নানাবিধ সমস্যায় পড়ে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুঁজি সংস্থাপন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, কাঁচামাল প্রাপ্তি, বিপণন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়েন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তারা দেশজ উৎপাদন যেমন বাড়ান তেমনি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে এসএমই  সেক্টরের উন্নয়ন, নারীদের অধিক হারে স্ব-কর্মসংস্থানে উৎসাহী করে তুলতে পারলে কর্মসংস্থানের একটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়।

বড় শিল্প শুধু বড় হবে, ব্যাংকও তাদেরই চিনবে। বিপরীতে ছোটরা আরও ছোট হবে। এটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। বড়দের জন্য সরকারি উদ্যোগ, ব্যাংকঋণ, অবাধ বাজার ব্যবস্থাপনা আর সিন্ডিকেট। আর ছোট উদ্যোক্তাদের না চেনে সরকার, না চেনে ব্যাংকগুলো। তাদের পথ কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘দেশের ৯০ ভাগ প্রতিষ্ঠানই কুটির শিল্প। ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ না দিয়ে বড়দের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি উৎসাহী। ছোটরা না বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে না। তাদের ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নতুন নতুন পদ্ধতি হাতে নিতে হবে।’ দেশের ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ছোট ব্যবসায়ীদের হাতে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘২০১৩ সালের অর্থনৈতিক শুমারিতে মোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৮ লাখ, সেখানে বড় শিল্পের সংখ্যা ৫ থেকে ৬ হাজার। দেশের মোট শিল্পের ৬৫ শতাংশই কুটির বা ক্ষুদ্র শিল্প। অথচ ক্ষুদ্র শিল্পকে তারা ঋণ দিতে চায় না। এসব ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানকে মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশনগুলো কিছু ঋণ দেয়, আবার তাদের অর্থ খুব কম।’ আসলে ক্ষুদ্ররা একদিকে অসহায়, অন্যদিকে দুর্ভাগা। প্রতিবেশী দেশগুলোর মোট জিডিপির ৬০-৭০ শতাংশ এসএমই অবদান রাখছে। আর আমাদের? পৃথক এসএমই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য দিতে হবে বিশেষ সুবিধা। বাংলাদেশে এসএমই খাতের মূল চ্যালেঞ্জ অর্থপ্রাপ্তি। এ বিষয়ে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই সময়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত